অস্ট্রেলিয়ার মাত্র ৫ বাসিন্দার শহর ‘লিকোলা’, বিক্রি হচ্ছে পুরোটাই; তবে ভিটেমাটি ছাড়তে নারাজ স্থানীয়রা
অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ান বনাঞ্চলের এক দুর্গম এলাকায় ছোট্ট একটি জনপদ, নাম 'লিকোলা'। পুরো গ্রামে জনসংখ্যা মাত্র পাঁচজন। কাঠের তৈরি কয়েকটি বাড়ি, একটি মুদিদোকান, ক্যারাভ্যান পার্ক আর একটি পেট্রল পাম্প—এই নিয়েই এটি অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম ছোট একটি গ্রাম। মেলবোর্ন শহর থেকে গাড়িতে সেখানে যেতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা।
তবে এবার পুরো গ্রামটিই বিক্রি হতে যাচ্ছে। পকেটে যদি কয়েক মিলিয়ন ডলার থাকে, তবে যে কেউ গ্রামটি কিনে নিতে পারেন। তবে গ্রাম বিক্রির এই খবরে স্থানীয় বাসিন্দারা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ।
গ্রামটির মালিকানা মূলত লায়ন্স ক্লাব নামের স্থানীয় একটি কমিউনিটি ক্লাবের হাতে। আলপাইন ন্যাশনাল পার্কে যাওয়ার পথে পর্যটকেরা জ্বালানি নেওয়া, খাওয়া-দাওয়া বা বিশ্রামের জন্য গ্রামটিতে বিরতি দেন। এ ছাড়া গত ৫০ বছর ধরে এখানে তরুণদের জন্য নানা সেবামূলক কার্যক্রম চলে আসছে।
লায়ন্স ক্লাবের স্থানীয় শাখা বলছে, গ্রামটি পরিচালনার খরচ জোগানো তাদের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই গত বছরের শেষের দিকে অনেকটা গোপনে এটি বিক্রির জন্য অনলাইনে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়।
হঠাৎ গ্রাম বিক্রির এই সিদ্ধান্তে শঙ্কায় আছেন লিকোলার হাতে গোনা বাসিন্দা ও আশপাশের মানুষেরা। এমনকি লায়ন্স ক্লাবের অন্য সদস্যদের মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, কারও সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন গভীর দুশ্চিন্তায় তাঁরা।
'যেন এক আপন ঠিকানা'
ভিক্টোরিয়ার পাহাড়ি এলাকা দিয়ে বয়ে গেছে খরস্রোতা ম্যাকালিস্টার নদী। এই নদীর তীরেই অবস্থিত লিকোলা। ১৯৫০-এর দশকে মূলত একটি কাঠ চেরাই কারখানাকে কেন্দ্র করে এই জনপদ গড়ে উঠেছিল। তখন কারখানার শ্রমিকদের থাকার জন্য কয়েকটি ঘরবাড়ি বানানো হয়।
১৯৬৮ সালে কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেলে লায়ন্স ক্লাব পুরো জায়গাটি কিনে নেয়। সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোর ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য তারা এটিকে একটি ক্যাম্প বা অবকাশকেন্দ্রে রূপান্তর করে। স্কুল ছুটির সময় শিশুরা এখানে এসে থাকত। ক্যাম্পের পাশেই বাড়তি কিছু জমিও কেনা হয়, যেখানে বর্তমানে রয়েছে জেনারেল স্টোর ও ক্যারাভ্যান পার্ক।
বর্তমানে গ্রামটির একমাত্র স্থায়ী বাসিন্দা লিয়ান ও'ডনেল ও তার পরিবার। লিয়ানই সেখানকার একমাত্র মুদিদোকানটি চালান। গ্রামে তিনি থাকেন তার এক সন্তান, ঘনিষ্ঠ বান্ধবী এবং বান্ধবীর দুই সন্তানকে নিয়ে।
লিয়ান বলেন, 'জায়গাটা চমৎকার। আমি যখন প্রথম এখানে আসি, দোকানে এসে লোকজন বলত, লিকোলায় এসে তুমি কোটিপতি হতে পারবে না। আমি তখন বলতাম, কে বলেছে আমি এখানে কোটিপতি হতে এসেছি?'
২০২২ সালে লিয়ান দোকানের ব্যবসাটি কিনে নেন, তবে তিনি ভবনগুলোর মালিক নন। ইজারা নিয়ে তিনি ব্যবসা চালাচ্ছেন। লিয়ান জানান, তাকে বলা হয়েছিল যে এই ইজারার মেয়াদ ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হবে।
'অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই'
শুরু থেকেই লিয়ান ও'ডনেল চেয়েছিলেন, লিকোলা যেন আগন্তুকদের কাছে 'আপন ঠিকানার' মতো হয়। লিকোলার পাশ দিয়ে যাওয়া ট্রাকচালক থেকে শুরু করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মী—সবার কাছেই লিয়ানের ফোন নম্বর আছে। লিয়ান বলেন, 'বিকেল তিনটা হোক বা রাত দুটা, যেকোনো প্রয়োজনে আমিই তাদের একমাত্র ভরসা।'
গ্রামটির প্রতি লিয়ানের ভালোবাসা গভীর। অথচ তাকেই এখন উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, 'আমি এই গ্রামটাকে ভালোবাসি... যদি কোনো ডেভেলপারের হাতে পড়ে এর রূপ বদলে যায়, তা আমি মেনে নিতে পারব না।'
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে লিয়ান প্রথম জানতে পারেন, গ্রামটি বিক্রি হতে যাচ্ছে। লায়ন্স ভিলেজ লিকোলা বোর্ড তাকে জানায়, চ্যারিটির মাধ্যমে পরিচালিত এই গ্রাম গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে লোকসানে চলছে।
লিয়ান তখন তাদের সহায়তা করতে চেয়েছিলেন। তহবিল সংগ্রহের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আশপাশের মানুষ নিশ্চয়ই এগিয়ে আসবে। কিন্তু বোর্ডের সাফ কথা, 'কয়েক মিলিয়ন ডলার দিতে না পারলে তোমার আসলে কিছুই করার নেই।'
লিয়ান তখন প্রশ্ন করেছিলেন, বোর্ড তার ব্যবসা কিনে নেবে কি না। জবাবে তারা জানায়, 'না। জমি ও ভবনের মালিক যেহেতু আমরা, তাই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও আমরা নিয়ে নেব। তোমাকে কেবল তল্পিতল্পা গুছিয়ে বিদায় হতে হবে।'
শুরুতে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেননি লিয়ান। পরে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারেন, ইজারা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বোর্ড চাইলেই এমনটা করতে পারে।
লিয়ান আক্ষেপ করে বলেন, 'বাস্তব দুনিয়ায় হলে আমি হয়তো দোকানটি অন্য কোনো ভবনে সরিয়ে নিতে পারতাম। অন্য যেকোনো জায়গায় সেটা সমস্যা হতো না। কিন্তু লিকোলায় তো আর কোনো ভবনই নেই, আমি যাব কোথায়?'
এরই মধ্যে গত ডিসেম্বরে অনলাইনে গ্রামটি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখেছেন লিয়ান। সেখানে পুরো গ্রামের দাম চাওয়া হয়েছে ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার।
ক্ষোভ ও প্রতিবাদ
গ্রাম বিক্রির খবরে অনলাইনে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন আশপাশের এলাকার মানুষ। লিয়ান ও'ডনেলের সঙ্গে এমন আচরণের সমালোচনা করছেন অনেকে। তাদের আশঙ্কা, ভালোবাসার এই গ্রাম হয়তো বিলীন হয়ে যাবে, অথবা পুরোপুরি ব্যবসায়িক কেন্দ্রে পরিণত হবে।
ভিক্টোরিয়া লায়ন্স ক্লাবের সদস্যরাও লিকোলা বোর্ডের কাছে চিঠি লিখে অভিযোগ করেছেন। তারা বলছেন, সাধারণ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা না করেই এবং নিয়ম না মেনেই বোর্ড এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে লিয়ানকে দোকানে থাকতে দেওয়া এবং তার ইজারার মেয়াদ বাড়ানোর দাবিতে অনলাইনে একটি পিটিশন বা গণস্বাক্ষর কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। সেখানে এখন পর্যন্ত ৮ হাজারের বেশি মানুষ সই করেছেন।
গ্রাম বিক্রির সিদ্ধান্তে ক্ষোভ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লায়ন্স ভিলেজ লিকোলা বোর্ড অভিযোগ করেছে, তাদের কর্মীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে যে বোর্ড তাদের কর্মীদের গ্রাম থেকে সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছে।
এক বিবৃতিতে বোর্ডের এক মুখপাত্র জানান, ভিক্টোরিয়ার সব লায়ন্স সদস্যদের কাছে পাঠানো একটি রিভিউ ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বোর্ডের দাবি, লায়ন্স ক্লাবের পক্ষে এখন আর গ্রামটির মালিকানা ধরে রাখা সম্ভব নয়। কারণ হিসেবে তারা খরচ ও বিমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি, পুরোনো আবাসন ব্যবস্থা এবং স্কুল ও ক্যাম্পে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, 'বিক্রির সিদ্ধান্তটি হুট করে নেওয়া হয়নি।'
বোর্ডের চেয়ারম্যান ডেনিস ক্যারুথার্স বলেন, 'শুধু ভৌত অবকাঠামো রক্ষা করা নয়, লায়ন্স ভিলেজের মূল উদ্দেশ্য সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের সহায়তা করা, বজায় রাখাই বোর্ডের প্রধান দায়িত্ব। লায়ন্স ডিস্ট্রিক্ট গভর্নরদের বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং তারা এতে সমর্থন দিয়েছেন।'
লিয়ানের ইজারা নবায়ন না করার বিষয়ে বোর্ড জানায়, আর্থিক সংকটের এই সময়ে আয় বাড়াতে তারা নিজেরাই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়। লিয়ানকে আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে দোকান ও এলাকা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বোর্ড আরও জানায়, লিকোলার সব সম্পত্তি বিক্রি ও ভবিষ্যতের ব্যবসার লভ্যংশ একটি নতুন ফাউন্ডেশনে জমা হবে। সেই অর্থ দিয়ে ভিক্টোরিয়া জুড়ে পেশাদারভাবে পরিচালিত বিভিন্ন ক্যাম্পে শিশুদের অংশগ্রহণের খরচ বহন করা হবে।
ভবিষ্যতে লিকোলায় আর কোনো ক্যাম্প হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয় বলে জানান ক্যারুথার্স। অংশগ্রহণকারীর অভাবে জানুয়ারিতে একটি ক্যাম্প বাতিলও করা হয়েছে।
গ্রামের নতুন মালিক কে হবেন বা তিনি গ্রামটি নিয়ে কী করবেন—তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ক্যারুথার্স জানান, এই সম্পত্তি কিনতে অনেকেই বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
