ওজন কমানোর ইনজেকশন অগ্ন্যাশয়ের মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়: নিয়ন্ত্রক সংস্থা
ওজন কমানোর ইনজেকশন ব্যবহারে প্রাণঘাতী অগ্ন্যাশয়ের রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, ওয়েগোভি বা মুনজারো ব্যবহার করলে অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ রোগে অগ্ন্যাশয়ে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি হয়।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াটি আগে থেকেই জানা থাকলেও যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা মেডিসিনস অ্যান্ড হেলথকেয়ার প্রোডাক্টস রেগুলেটরি এজেন্সি (এমএইচআরএ) এখন মনে করছে, ঝুঁকির মাত্রা আগের ধারণার চেয়েও বেশি গুরুতর।
বৃহস্পতিবার জারি করা এক সতর্কবার্তায় সংস্থাটি ওজন কমানোর ইনজেকশন ব্যবহারকারীদের পেট ও পিঠে তীব্র এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার মতো উপসর্গের দিকে নজর রাখতে বলেছে।
এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে, বমি বমি ভাব ও বমির সঙ্গে ব্যাথা বা শুধু ব্যাথা হতে পারে বলে জানিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ কারণে চিকিৎসক ও রোগীদের জন্য ওষুধের পণ্যের তথ্য আপডেট করা হয়েছে।
শরীরে প্রদাহের একাধিক রিপোর্ট
এমএইচআরএ জানিয়েছে, এসব ওষুধ গ্রহণের সময় এক হাজারের বেশি রোগীর অগ্ন্যাশয়ে প্রদাহের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। গুরুতর ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও এসব প্রতিবেদনে ১৯ জনের মৃত্যুর তথ্য এবং ২৪টি নেক্রোটাইজিং প্যানক্রিয়াটাইটিসের ঘটনা রয়েছে, যাদের অগ্ন্যাশয়ের টিস্যু নষ্ট হয়ে যায়।
অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসে পাকস্থলীর পেছনে থাকা ছোট অঙ্গ অগ্ন্যাশয় অল্প সময়ের মধ্যে ফুলে ওঠে। হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তার পাশাপাশি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও ইনসুলিন ভাঙার ক্ষেত্রে অগ্ন্যাশয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, যা ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহারে প্রভাবিত হতে পারে।
প্যানক্রিয়াটাইটিসে সাধারণত হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। সেখানে রোগীকে তরল, অক্সিজেন এবং সংক্রমণ থাকলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা সাধারণত রোগের মূল কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করেন, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পিত্তপাথর বা অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত। ওজন কমানোর ওষুধের ক্ষেত্রে রোগীদের এসব ওষুধ বন্ধ করতে হতে পারে। এ ছাড়া স্থূলতাও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার একটি ঝুঁকিপূর্ণ কারণ।
গত এক বছরে ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডে ১৬ লাখের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক ওয়েগোভি ও মুনজারো–এর মতো ওষুধ ব্যবহার করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওজন কমানোর এসব ওষুধ প্রযুক্তিগতভাবে জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট নামে পরিচিত। এগুলো জিএলপি-১ হরমোনের অনুকরণ করে রক্তে শর্করা ও ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। প্রথমে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসার জন্য এসব ওষুধ তৈরি করা হয়েছিল। তবে ক্ষুধা দমন করে ওজন কমাতে কার্যকর হওয়ায় এগুলোর ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। ইলন মাস্ক থেকে শুরু করে বরিস জনসনের মতো পরিচিত ব্যক্তিরাও এসব ওষুধের উপকারিতা তুলে ধরেছেন।
বর্তমানে এনএইচএসের মাধ্যমে ওজন কমাতে সহায়তার জন্য এসব ওষুধের কয়েকটি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ওয়েগোভি নামে পরিচিত সেমাগ্লুটাইড এবং মুনজারো নামে পরিচিত টিরজেপাটাইড।
এমএইচআরএর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা ড. অ্যালিসন কেভ বলেন, 'যেসব রোগীর জন্য জিএলপি-১ ওষুধ নির্ধারণ করা হয়, তাদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই এগুলো নিরাপদ ও কার্যকর এবং উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যগত উপকার দেয়। গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি খুবই কম, তবে রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এ বিষয়ে সচেতন থাকা এবং সংশ্লিষ্ট উপসর্গগুলোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি।'
ওজেম্পিক ফিট
এদিকে 'ওজেম্পিক ফিট' নামে পরিচিত একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়েও আলোচনা চলছে। হেস্টন ব্লুমেনথাল, ওপরা উইনফ্রে ও জেরেমি ক্লার্কসনের মতো বেশ কয়েকজন তারকা ওজন কমানোর এসব ওষুধ ব্যবহার করেছেন।
সাবেক টপ গিয়ার উপস্থাপক জেরেমি ক্লার্কসন চলতি মাসের শুরুতে জানান, মুনজারো ব্যবহার করে প্রায় তিন স্টোন ওজন কমানোর পর তার পায়ের আকার ছোট হয়ে গেছে।
ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে পায়ের আকার ছোট হয়ে যাওয়া দেখা যেতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাদের জুতার মাপ এক বা দুই সাইজ কমে গেছে। এটি পায়ের চর্বি কমে যাওয়ার ফল হতে পারে, আবার শরীরে ফোলা ভাব ও পানি জমা কমার কারণেও এমনটা হতে পারে। এই অবস্থাকে কথ্যভাবে 'ওজেম্পিক ফিট' বলা হয়।
এতে পায়ের ত্বক ঝুলে যাওয়া বা কুঁচকে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে, কারণ চর্বি ও পেশি কমে যাওয়ায় পায়ের স্বাভাবিক প্যাডিং হ্রাস পায়।
চলতি মাসের শুরুতে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, ওজন কমানোর ইনজেকশন ব্যবহারকারী লাখো ব্রিটিশ নাগরিককে আজীবন এসব ওষুধ চালিয়ে যেতে হতে পারে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসা বন্ধ করার দুই বছরের মধ্যেই বেশিরভাগ ব্যবহারকারী আবার আগের ওজনে ফিরে যান, যা প্রচলিত ডায়েট পদ্ধতিতে ওজন কমানো ব্যক্তিদের তুলনায় চার গুণ দ্রুত।
