থেম্বা গোরিম্বো: একসময় ছিলেন হীরা পাচারকারী; দীর্ঘ সংগ্রামের পর যেভাবে হয়ে ওঠেন ইউএফসি তারকা
গত নভেম্বরে হারের তেতো স্বাদ পেয়েছেন। সেই ধাক্কা সামলাতে এখন কঠোর অনুশীলনে মগ্ন পেশাদার মিক্সড মার্শাল আর্টস (এমএমএ) যোদ্ধা থেম্বা গোরিম্বো। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের প্রশিক্ষণের ভিডিও দিচ্ছেন, নিজেকে ঝালিয়ে নিতে লড়ছেন বিশ্বসেরা কুস্তিগিরদের সঙ্গে। তবে জীবনে রিংয়ের লড়াইয়ের চেয়েও কঠিন এক লড়াই লড়ে এসেছেন তিনি।
২০২৩ সালে ৩২ বছর বয়সে ইতিহাস গড়েছিলেন গোরিম্বো। প্রথম জিম্বাবুইয়ান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জিতেছিলেন 'আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ' (ইউএফসি) বাউট। কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে পাওয়া এই সাফল্যও তাঁর ছোটবেলার এক ভয়ংকর স্মৃতি মুছতে পারেনি।
সম্প্রতি লাস ভেগাসে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের সেই বিভীষিকাময় অতীতের কথা তুলে ধরেন গোরিম্বো। তিনি বলেন, 'আমি জিম্বাবুয়ের হীরার খনিতে কাজ করতাম। হীরা পাচার করতাম, বিক্রি করতাম। পুলিশের হাতে প্রচুর মার খেয়েছি। আমার সারা শরীরে কুকুরের কামড়ের দাগ। ওই হীরার খনিতে আমি প্রায় মরতেই বসেছিলাম।'
ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের শৈশব
গোরিম্বোর বয়স তখন মাত্র ১৬। ২০০৮ সালের অক্টোবরের সেই দিনটির কথা আজও ভুলতে পারেন না তিনি। জিম্বাবুয়ের পূর্বাঞ্চলের মারেঞ্জ হীরার খনিতে তখন কাজ করছিলেন স্থানীয় খনিশ্রমিকেরা। হঠাৎ সেখানে হানা দেয় দেশটির সেনাবাহিনী। খনির নিয়ন্ত্রণ নিতে এবং স্থানীয় শ্রমিকদের হটাতে সেনাবাহিনী এক নিষ্ঠুর অভিযান শুরু করে, যার নাম দেওয়া হয়েছিল 'হাকুদজোকউই' বা 'ফেরার পথ নেই'।
সেই লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে গোরিম্বো বলেন, 'আমার মতো সাহসী ছেলেরাও সেদিন ভয়ে পালাচ্ছিল। সেনারা আমাদের ধাওয়া করছিল। একদল সেনা ধাওয়া করতে করতে ক্লান্ত হলে আরেক দল আসছিল। মাথার ওপর চক্কর দিচ্ছিল হেলিকপ্টার...খুবই ভয়ের ছিল পরিস্থিতি।'
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, তিন সপ্তাহ ধরে চলা ওই সামরিক অভিযানে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হন। অবশ্য জিম্বাবুয়ে সরকার তখন দাবি করেছিল, তাদের সেনারা মারেঞ্জ খনিতে কোনো হত্যাকাণ্ড চালায়নি।
গোরিম্বোর সংগ্রামের শুরুটা একদম শৈশব থেকেই। যখন তাঁর বয়স মাত্র ৯ বছর, তখন মা মারা যান। ১৩ বছর বয়সে হারান বাবাকে। অনাথ কিশোর গোরিম্বোর দিন কাটত আত্মীয়স্বজনের আশ্রয়ে। ১৯৯২ সালের পর থেকে জিম্বাবুয়ে যখন একের পর এক অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে, তখন তাঁর আত্মীয়দের অবস্থাও শোচনীয় হয়ে পড়ে। এর মধ্যে ২০০২-০৩ সালের ভয়াবহ খরা তাঁদের অনাহারের মুখে ঠেলে দেয়। সেই ক্ষুধার জ্বালাই শেষ পর্যন্ত গোরিম্বোকে হীরা খনির অন্ধকার জগতে টেনে নিয়ে যায়।
সেই দিনগুলোর কথা মনে করে গোরিম্বো বলেন, 'সে সময় জিম্বাবুয়েতে বড় ধরনের খরা চলছিল। আমার দেখা সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল সেটি। দিনে মাত্র একবেলা খাবার জুটত। তখন বেঁচে থাকার একমাত্র পথ ছিল হীরা। আমাদের গ্রাম থেকে খনিটি ছিল মাত্র ৪০ মিনিটের পথ। সেখান থেকে হীরা পাচার করে যা পাওয়া যেত, তা দিয়ে অন্তত দুবেলা খাবারের টাকা হতো। স্রেফ খাবারের জন্যই আমি খনিতে নেমেছিলাম।'
বেঁচে থাকার তাগিদ এতটাই প্রবল ছিল যে, সেনাবাহিনীর সেই রক্তক্ষয়ী হামলাও তাঁকে দমাতে পারেনি। সিএনএনকে গোরিম্বো জানান, হামলার মাত্র ১০ দিন পর তিনি আবার সেই খনিতে ফিরে গিয়েছিলেন। তখনো তাঁর শরীরের ক্ষতগুলো শুকায়নি।
সেনাবাহিনীর হামলার কয়েক মাস পর গোরিম্বো সিদ্ধান্ত নেন উন্নত জীবনের আশায় জিম্বাবুয়ে ছাড়ার। অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় ঢোকেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই ধরা পড়েন এবং তাঁকে জিম্বাবুয়েতে ফেরত পাঠানো হয়। তবে হাল ছাড়েননি তিনি। একই দিনে তিনি আবারও দক্ষিণ আফ্রিকায় ঢোকার চেষ্টা করেন।
গোরিম্বো বলেন, 'সেবার নদী পার হয়ে ঢোকার সময় আমি প্রায় মরতেই বসেছিলাম। তবুও আমি গিয়েছিলাম, কারণ জিম্বাবুয়েতে ফেরার মতো কোনো জায়গা আমার ছিল না। বাবা-মা কেউ নেই, আমি কার কাছে ফিরতাম?'
তবে দক্ষিণ আফ্রিকার জীবনও খুব একটা সহজ ছিল না। সেখানে দীর্ঘদিন গৃহহীন অবস্থায় ছিলেন। অবৈধভাবে আসা অন্য মানুষদের সঙ্গে গির্জার মেঝেতে রাত কাটাতেন। এরপর ছোটখাটো নানা কাজ শেষে একটি বাগানে মালীর কাজ পান। সেখানে সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর মজুরি মিলত মাত্র ৮০ র্যান্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০০ টাকার মতো)। সেই সামান্য উপার্জনের টাকা থেকেও কিছু অংশ জিম্বাবুয়েতে তাঁর আত্মীয়দের কাছে পাঠাতেন গোরিম্বো।
সিনেমার অনুপ্রেরণায় লড়াইয়ের ময়দানে
তবে একটি সিনেমা গোরিম্বোর জীবনের মোড় বদলে দিয়েছিল। মিক্সড মার্শাল আর্টস (এমএমএ) নিয়ে তৈরি একটি সিনেমা দেখে তিনি এই খেলার প্রেমে পড়েন। ঠিক করেন নিজেও একদিন লড়বেন রিংয়ে। কিন্তু প্রশিক্ষণ নেওয়ার মতো সামর্থ্য তাঁর ছিল না।
নিজের সেই সংগ্রামের কথা জানিয়ে গোরিম্বো বলেন, 'আমি নিরাপত্তারক্ষীর কাজ শুরু করি। সেই উপার্জনের টাকা দিয়ে জিমের ফি মেটাতাম, ব্যক্তিগত কোচের কাছে প্রশিক্ষণ নিতাম।' দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি মুদি দোকানে টানা ১৭ ঘণ্টা কাজ করতেন তিনি। টাকার অভাবে অনেক সময় ব্যক্তিগত কোচ রাখা কঠিন হতো, তবুও লড়াই শেখার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন এই তরুণ।
তাঁর সেই জেদ শেষ পর্যন্ত বৃথা যায়নি। ২০১০ সালে একজন শৌখিন এমএমএ যোদ্ধা হিসেবে রিংয়ে যাত্রা শুরু করেন। এর তিন বছর পর ২০১৩ সালে নাম লেখান পেশাদার যোদ্ধা হিসেবে।
২০২২ সালের শেষ দিকে যখন গোরিম্বো যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান, তখন তাঁর পকেটে প্রায় কোনো টাকাই ছিল না। ফ্লোরিডার মিয়ামিতে 'এমএমএ মাস্টার্স' নামের একটি জিমের সোফায় রাত কাটাতেন তিনি। সেখানেই চলত তাঁর কঠোর সাধনা।
কয়েক মাসের মাথায় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বহুল প্রতীক্ষিত 'ইউএফসি' (আলটিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ) আসরে তাঁর অভিষেক হয়। প্রথম ম্যাচে এ জে ফ্লেচারের কাছে হেরে গেলেও দমে যাননি তিনি। তিন মাস পর মে মাসে নিজের দ্বিতীয় ম্যাচে জাপানের তাকাশি সাতোকে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ান গোরিম্বো। সেই সঙ্গে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তাও জানান দেন জিম্বাবুয়ের এই লড়াকু সন্তান।
সাফল্যের স্বাদ পাওয়ার পর গোরিম্বো সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের একটি স্ক্রিনশট পোস্ট করেন। সেখানে দেখা যায়, তাঁর অ্যাকাউন্টে পড়ে আছে মাত্র ৭ ডলার ৪৯ সেন্ট।
গোরিম্বো বলেন, 'আমি যখন ওটা পোস্ট করি, তখন আসলে আমার হাতে ওই টাকাটাও ছিল না। কারণ সোমবারের আগে আমার পেমেন্ট পাওয়ার কথা ছিল না। আমি শুধু মানুষকে এটিই দেখাতে চেয়েছিলাম যে, একদম শূন্যে নেমে যাওয়ার পরও যদি আপনি ইতিবাচক থাকেন, তবে যে কেউ যেকোনো উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। আমি চেয়েছিলাম মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে।'
এই পোস্ট নজর কাড়ে বিশ্বখ্যাত রেসলার ও হলিউড অভিনেতা ডোয়াইন 'দ্য রক' জনসনের। গোরিম্বোর লড়াইয়ের গল্প ছুয়ে যায় তাঁকে। নব্বইয়ের দশকে রক নিজেও যখন ফুটবল ক্যারিয়ারে ব্যর্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন, তখন তাঁর পকেটেও ছিল মাত্র ৭ ডলার। সেই মিল খুঁজে পেয়ে রক সরাসরি গোরিম্বোর সঙ্গে দেখা করেন এবং মিয়ামিতে তাঁকে একটি বাড়ি উপহার দেন। এরপর থেকে দুজনের মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। গোরিম্বো বলেন, 'রক পর্দার আড়ালে আমাকে এখনো অনেক সাহায্য করেন। আমি সত্যিই ভাগ্যবান।'
নিজের জীবন নিয়ে গোরিম্বোর ভাবনাটাও চমৎকার। তিনি বলেন, 'আমার জীবনটা একটা সিনেমার মতো। আমি বিশ্বাস করি এটি ঈশ্বরের লিখে রাখা একটি চিত্রনাট্য, আর আমি সেই সিনেমার প্রধান অভিনেতা।'
তবে এই 'অভিনেতা'র কাজ এখনো শেষ হয়নি। তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য ইউএফসি চ্যাম্পিয়ন হওয়া। গোরিম্বো বলেন, 'আমি চ্যাম্পিয়ন হতে চাই এবং আমি বিশ্বাস করি আমি সেটা পারব। প্রার্থনা, কঠোর পরিশ্রম, লক্ষ্য ঠিক রাখা আর নতুন নতুন কৌশল শেখার মাধ্যমেই আমি সেখানে পৌঁছাতে চাই।'
