অ্যান্টার্কটিকায় উষ্ণতা বাড়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রজনন মৌসুম শুরু করছে পেঙ্গুইনরা
প্রতিবছরই পেঙ্গুইনরা তাদের প্রজননক্ষেত্রে আগের চেয়ে দ্রুত ফিরে আসছে। ডিম পাড়া এবং ছানা লালন-পালনের জন্য তাদের এই বাড়ি ফেরা এখন আর আগের সময়সূচি মেনে চলছে না। অদ্ভুত এই পরিবর্তন কেবল একটি নির্দিষ্ট দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কয়েক ডজন কলোনি এবং অন্তত তিনটি ভিন্ন প্রজাতির পেঙ্গুইনের মধ্যে এই একই আচরণ দেখা গেছে।
গবেষণা বলছে, পেঙ্গুইনরা গড়ে আগের চেয়ে দুই সপ্তাহ আগে ফিরছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই সময়টা প্রায় এক মাস আগে। ১৯ জানুয়ারি 'জার্নাল অব অ্যানিমেল ইকোলজি'তে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইগনাসিও হুয়ারেজ ও তার দল ২০১১ সাল থেকে অ্যান্টার্কটিকায় পেঙ্গুইনদের ওপর নজর রাখছেন। তারা ৩৭টি কলোনিতে ৭৭টি বিশেষ 'ক্যামেরা ট্র্যাপ' বসিয়েছেন। এই ক্যামেরাগুলো নির্দিষ্ট সময় পরপর ছবি তোলার পাশাপাশি সে সময়ের তাপমাত্রাও রেকর্ড করে। গত ১৫ বছরের মধ্যে এটিই এই ধরনের সবচেয়ে বড় গবেষণা।
মূলত অ্যাডেলিন, চিনস্ট্র্যাপ এবং জেন্টু—এই তিন প্রজাতির পেঙ্গুইনের ওপর ভিত্তি করে গবেষণাটি চালানো হয়েছে।
কেন এই পরিবর্তন?
গবেষকদের মতে, তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ও দ্রুত বৃদ্ধিই এই পরিবর্তনের মূল কারণ। তবে পেঙ্গুইনরা কি এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে, নাকি জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ছে—তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এম্পেরর পেঙ্গুইন ছাড়া বাকি সব প্রজাতির পেঙ্গুইন ডিম পাড়ার জন্য বরফমুক্ত শুকনো জায়গার খোঁজে ডাঙায় ফিরে আসে। প্রজননক্ষেত্র প্রস্তুত করতে তারা বরফ গলাতেও সাহায্য করে। গবেষকরা জানান, পেঙ্গুইনের মলে প্রচুর লবণ থাকে এবং এর রং খুব গাঢ় হয়। এই মল সূর্যের তাপ ধরে রেখে বরফ দ্রুত গলাতে সাহায্য করে।
পেঙ্গুইনদের বলা হয় অ্যান্টার্কটিকা বাস্তুতন্ত্রের 'সেন্টিনেল' বা অতন্দ্র প্রহরী। ইগনাসিও হুয়ারেজ বলেন, 'সমুদ্রের তলদেশে কী ঘটছে তা জানা অত্যন্ত কঠিন কাজ। বিশেষ করে অ্যান্টার্কটিকার বরফে ঢাকা সাগরে তথ্য সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব। তাই আমরা পেঙ্গুইনদের ওপর নির্ভর করি। এরা জীবন কাটায় সমুদ্রে, কিন্তু বংশবৃদ্ধির জন্য ডাঙায় ফিরে আসে। তাদের আচরণ দেখে সমুদ্রের স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।'
প্রজননক্ষেত্রে সবার আগে ফিরছে 'অ্যাডেলিন' প্রজাতির পেঙ্গুইন। বর্তমানে তারা গড়ে ১৫ অক্টোবরের মধ্যেই জড়ো হচ্ছে। দেখা গেছে, প্রতিবছর তারা আগের বছরের চেয়ে এক দিন করে সময় এগিয়ে আনছে। এরপর ২০ অক্টোবর নাগাদ আসছে 'চিনস্ট্র্যাপ' পেঙ্গুইন। এই প্রজাতিটি তাদের নির্ধারিত সময়ের প্রায় দুই সপ্তাহ আগেই ফেরা শুরু করেছে।
সবার শেষে ফেরে 'জেন্টু' পেঙ্গুইন। সাধারণত ১ নভেম্বর নাগাদ তাদের দেখা মেলে। তবে ক্যামেরা ট্র্যাপের তথ্য অনুযায়ী, তারা এখন আগের চেয়ে গড়ে ১৬ দিন আগে ফিরছে। এমনকি কোনো কোনো কলোনিতে ২৪ দিন আগেই তাদের উপস্থিত হতে দেখা গেছে।
হুয়ারেজ বলেন, 'পেঙ্গুইনরা তাদের গত বছরের পুরনো বাসাগুলোই সামান্য অদলবদল করে ব্যবহার করে। যখন দেখা যায় তারা বাসায় স্থির হয়ে বসেছে এবং আর নড়াচড়া করছে না, তখন থেকেই আমরা প্রজনন ঋতুর শুরু বলে ধরে নিই। তারা যত তাড়াতাড়ি বাসায় থিতু হয়, তাদের জীবনের পরবর্তী ধাপগুলোও তত দ্রুত শুরু হয়—যেমন ডিম পাড়া, ছানা ফোটা এবং ছানা বড় করা।'
পেঙ্গুইনরা সাধারণত কয়েক ডজন থেকে শুরু করে হাজার হাজার সদস্যের বড় দল বা কলোনিতে বাস করে। এতে যেমন হাড়কাঁপানো শীত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, তেমনি শিকারি পাখি যেমন 'পেট্রেল' বা 'স্কুয়া'র আক্রমণ থেকেও ডিম ও ছানাগুলো সুরক্ষিত থাকে।
ক্যামেরায় ধরা পড়া ছবিগুলোর সঙ্গে তখনকার তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, দক্ষিণ গোলার্ধে যখন শীতকাল (আগস্ট মাস), তখন থেকেই তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে পেঙ্গুইনদের ফেরার মাসগুলোতে (অক্টোবর ও নভেম্বর) প্রতিবছর গড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে ০.৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মেরু অঞ্চলে উষ্ণায়নের প্রভাব পৃথিবীর অন্য প্রান্তের চেয়ে বেশি। তবে পেঙ্গুইন কলোনিগুলোতে এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার অ্যান্টার্কটিকার বাকি অংশের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি। আর এই ক্রমবর্ধমান উত্তাপই পেঙ্গুইনদের জীবনচক্রকে সময়ের আগেই বদলে দিচ্ছে।
তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পেঙ্গুইনরা তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়—অর্থাৎ প্রজননকাল এগিয়ে এনেছে ঠিকই, কিন্তু গবেষকেরা এখনো নিশ্চিত নন এটি কি জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, না কি কোনো বড় বিপদের পূর্বাভাস।
অ্যান্টার্কটিকার বরফ আগের চেয়ে দ্রুত এবং মহাদেশের কয়েক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত গলে যাচ্ছে। এতে পেঙ্গুইনদের জন্য ডাঙায় তাদের প্রজননক্ষেত্রে পৌঁছানো সহজ হয়েছে। কিন্তু এই অকাল বরফ গলা অ্যান্টার্কটিকার পুরো খাদ্যশৃঙ্খলকে এলোমেলো করে দিচ্ছে।
অ্যান্টার্কটিকায় প্রতিবছর বরফের নিচে থাকা ক্ষুদ্র শৈবাল থেকে প্রাণের স্পন্দন শুরু হয়। এই শৈবাল খেয়ে বেঁচে থাকে 'ক্রিল' নামের এক ধরনের ছোট চিংড়ি সদৃশ প্রাণী। আর এই ক্রিলই হলো পেঙ্গুইনদের প্রধান খাবার। আবার পেঙ্গুইন খেয়ে বেঁচে থাকে অরকা বা লিওপার্ড সিলের মতো প্রাণীরা।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং এই গবেষণার সহ-লেখক ফিওনা জোনস বলেন, 'পেঙ্গুইন হলো জলবায়ু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। তাদের জীবনে এই পরিবর্তনের প্রভাব আসলে পুরো বিশ্বের সব প্রজাতির জন্যই গভীর বার্তা বয়ে আনছে।'
তিনি বলেন, 'পেঙ্গুইনদের প্রজননকাল এভাবে এগিয়ে আসা তাদের বংশবৃদ্ধিতে শেষ পর্যন্ত কেমন প্রভাব ফেলবে, তা বুঝতে আমাদের আরও দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন।'
গবেষকদের মতে, পাখির প্রজননকাল এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে এটিই এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। শুধু পাখি নয়, জীবজগতের যেকোনো প্রাণী বা উদ্ভিদের ক্ষেত্রে জীবনচক্রের এমন পরিবর্তন আগে কখনো দেখা যায়নি।
