ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার অগ্নিপরীক্ষা: আরও কঠিন প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তায় হাজারো অভিবাসী
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। কঠোর নিয়মকানুন আর বহু অভিবাসীর আবেদন স্থগিত করে দেওয়ার কারণে হাজার হাজার মানুষ এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
তেমনই এক ভুক্তভোগী টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ২৮ বছর বয়সী কিউবান অভিবাসী মেইলান পাসিওস। গত ৮ জানুয়ারি তার নাগরিকত্ব পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৩ জানুয়ারি তাকে জানানো হয়, তার নির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করা হয়েছে।
দুই সন্তানের মা এবং একটি সফল ব্যবসার মালিক পাসিওস বলেন, 'এটি ছিল মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার মতো। সামনে এগিয়ে যাওয়ার আশা নিয়ে আপনি আসেন, আর হঠাৎ এমন কিছু ঘটে—তখন তা ভীষণ বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে।' তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি জটিলতা নেই এবং তিনি কখনোই সরকারের ওপর বোঝা হয়ে থাকেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হলে সাধারণত অন্তত পাঁচ বছর স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি থাকতে হয়। এরপর মার্কিন শাসনব্যবস্থা, ইতিহাস ও ইংরেজি ভাষা বিষয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
এই পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পাসিওস ৩০০ ডলার খরচ করে একটি কোর্স করেছেন এবং স্থানীয় একটি কলেজে এক বছর ধরে ইংরেজি ভাষা শিখেছেন। তার বিশ্বাস, তিনি মার্কিন সমাজের সঙ্গে পুরোপুরি মিশে গেছেন এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্যতা তার রয়েছে।
অভিবাসন ব্যবস্থায় নাগরিকত্বকে সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। সরকারের দৃষ্টিতে এটি একজন অভিবাসীর সফল অন্তর্ভুক্তির প্রতীক, আর অভিবাসীদের কাছে নাগরিকত্ব মানে স্থায়িত্ব ও আপন হওয়ার অনুভূতি। নাগরিকত্ব লাভের পর তারা সংবিধান রক্ষার শপথ নেন এবং ভোট দেওয়া কিংবা জুরিতে অংশগ্রহণের মতো অধিকার ও দায়িত্ব অর্জন করেন। পাসিওসও আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে চেয়েছিলেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাগরিক হওয়া ব্যক্তিরা সাধারণ ভোটারদের তুলনায় রাজনৈতিকভাবে বেশি সক্রিয়। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, নতুন নাগরিকদের ৯৭ শতাংশ ভোট দিতে আগ্রহী ছিলেন, যেখানে সাধারণ ভোটারদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৬৬ শতাংশ।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ভোটারের অন্তত ১৩ শতাংশই এই নতুন নাগরিক। করোনা মহামারীর পর থেকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব পাচ্ছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতিমালার কারণে এই ধারায় এখন বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি নাগরিকত্ব পরীক্ষার নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। প্রশ্নের সংখ্যা ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১২৮ করা হয়েছে। আগে সাক্ষাৎকারে ১০টি প্রশ্নের মধ্যে ৬টির সঠিক উত্তর দিলেই পাস করা যেত, এখন ২০টির মধ্যে অন্তত ১২টির সঠিক উত্তর দিতে হয়। পাশাপাশি আবেদনকারীর যোগ্যতা ও চরিত্র যাচাইয়ের জন্য কর্তৃপক্ষ এখন প্রতিবেশী কিংবা নিয়োগকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলছে।
এর মধ্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক একটি সরকারি আদেশের কারণে। নভেম্বরে ওয়াশিংটনে দুই ন্যাশনাল গার্ড সদস্যের মৃত্যুর ঘটনায় এক আফগান অভিবাসীকে অভিযুক্ত করার পর সরকার সব ধরনের অভিবাসন প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে। একই সঙ্গে 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ' দেশের তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের যেসব আবেদন আগে অনুমোদিত হয়েছিল, সেগুলোও পুনরায় যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে খোদ ট্রাম্পের নিজ দলেও সমালোচনা শুরু হয়েছে। আর যারা নাগরিকত্বের শপথ নেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, তারা এখন চরম বিভ্রান্তি ও উৎকণ্ঠার মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন।
মিয়ামির অভিবাসন আইনজীবী উইলফ্রেডো অ্যালেন জানিয়েছেন, তার বহু মক্কেলের নাগরিকত্বসংক্রান্ত সাক্ষাৎকার ও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, 'তারা হতাশ, কারণ এখন তাদের কী করা উচিত বা সামনে কী ঘটতে পারে—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই।'
অ্যালেন জানান, তার কয়েকজন মক্কেল ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছানোর অপেক্ষায় ছিলেন, যাতে তারা স্প্যানিশ ভাষায় নাগরিকত্ব পরীক্ষা দিতে পারেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের সেই স্বপ্ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বিল ক্লিনটন প্রশাসনের সাবেক অভিবাসন কমিশনার ডরিস মেজনার বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এসব পদক্ষেপ নাগরিকত্ব অর্জনের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করা এবং অভিবাসীদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টির একটি কৌশল। তার মতে, এটি ইউএসসিআইএস-এর মূল উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী, কারণ এই সংস্থাটি গঠনই করা হয়েছিল বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াকে সহজ ও গতিশীল করার জন্য।
মেজনার আরও বলেন, ট্রাম্প ও তার প্রশাসন বরাবরই দাবি করে এসেছে যে তারা কেবল অবৈধ অভিবাসনের বিরোধী এবং বৈধ অভিবাসনকে সমর্থন করে। কিন্তু বাস্তবে বর্তমানে যা ঘটছে, তা সেই বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি মূলত নাগরিকত্বের সুযোগ সীমিত করা এবং নতুন নাগরিকদের প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরির একটি প্রচেষ্টা।
নাগরিকত্ব সাক্ষাৎকার ও শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বাতিলের পাশাপাশি সরকার ইতোমধ্যে নাগরিকত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার উদ্যোগও জোরদার করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন—এমন ব্যক্তিদের সন্তানদের জন্মগত নাগরিকত্বের অধিকার বাতিলের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। যদিও একাধিক কেন্দ্রীয় বিচারক এ সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক বলে স্থগিত করেছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। গত বছরের শুরুতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি ক্রিস্টি নোম 'নাগরিকত্ব ও সংহতি অনুদান কর্মসূচি' বন্ধ করে দেন। ২০০৯ সাল থেকে চালু থাকা এই কর্মসূচির মাধ্যমে অভিবাসীদের নাগরিকত্ব পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ২২ মিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দেওয়া হতো। এই অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক এনজিওকে কর্মী ছাঁটাই করতে হয়েছে এবং ইংরেজি ভাষা ও নাগরিকত্ব শিক্ষার ক্লাস বন্ধ করতে বাধ্য হতে হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের মতে, এসব কাটছাঁট ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর অভিবাসনবিরোধী পরিকল্পনারই অংশ। এই পরিকল্পনার আওতায় মানবিক সুরক্ষা কর্মসূচি বন্ধ করা হয়েছে এবং গণহারে ধরপাকড় ও বিতাড়ন অভিযান শুরু হয়েছে। এর ফলে হাজারো পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। এসবের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভও কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে।
নাগরিক অধিকার রক্ষাকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সরকারের এসব পদক্ষেপ বেআইনি, এবং তারা এর বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
আইনজীবী উইলফ্রেডো অ্যালেন বলেন, মার্চ মাসের মধ্যে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না হলে তারাও সরকারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেবেন। তবে তিনি যোগ্য ব্যক্তিদের আবেদন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি।
