‘খাবারের গন্ধ নিয়ে হেনস্তার’ অভিযোগ; যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ পেলেন ভারতীয় দম্পতি
মাইক্রোওয়েভে দুপুরের খাবার গরম করা নিয়ে শুরু হয়েছিল সামান্য এক বিবাদ। কিন্তু সেই বিবাদের শেষ হলো বড় অংকের এক সমঝোতার মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে খাবারের গন্ধ নিয়ে হেনস্তার শিকার হয়ে ২ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন দুই ভারতীয় শিক্ষার্থী।
আদিত্য প্রকাশ ও তার বাগদত্তা উর্মি ভট্টাচার্য ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো বোল্ডারের বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের মামলা করেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, মাইক্রোওয়েভ কাণ্ডের পর তাদের ওপর দফায় দফায় 'অবজ্ঞা ও প্রতিহিংসামূলক' আচরণ করা হয়েছে।
ঘটনার শুরু ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের পিএইচডি শিক্ষার্থী আদিত্য প্রকাশ মাইক্রোওয়েভে দুপুরের খাবারের জন্য ভারতের জনপ্রিয় খাবার 'পালক পনির' গরম করছিলেন। অভিযোগ ওঠে, সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ব্রিটিশ কর্মী ওই খাবারের 'তীব্র গন্ধ' নিয়ে আপত্তি জানান। ওই কর্মী দাবি করেন, তীব্র গন্ধযুক্ত খাবার এই মাইক্রোওয়েভে গরম করার নিয়ম নেই।
আদিত্য জানান, এমন কোনো নিয়মের কথা কোথাও লেখা ছিল না। পরে তিনি যখন জানতে চান ঠিক কোন ধরণের খাবার গরম করা নিষেধ, তখন তাকে বলা হয় স্যান্ডউইচ গরম করা যাবে, কিন্তু কারি বা ঝোলযুক্ত খাবার যাবে না।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, গোপনীয়তার আইনের কারণে তারা বিস্তারিত কিছু বলবে না। তবে তারা সব ধরণের বৈষম্য ও হেনস্তা দূর করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গত সেপ্টেম্বরে ওই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছালেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দায় স্বীকার করেনি।
আদিত্য প্রকাশ বলেন, 'আমাদের কাছে মামলার মূল বিষয় টাকা ছিল না। আমরা প্রমাণ করতে চেয়েছি যে, ভারতীয় হওয়ার কারণে বা ভারতীয় অভ্যাসের কারণে কাউকে বৈষম্য করলে তার ফল ভোগ করতে হয়।'
এই খবরটি প্রকাশের পর ভারতে 'ফুড রেসিজম' বা খাবার নিয়ে বর্ণবাদ নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ভারতীয় বিদেশে খাবার নিয়ে নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করছেন।
তবে অনেকে বলছেন, খাবার নিয়ে বৈষম্য খোদ ভারতেই প্রকট। সেখানে নিরামিষাশী অনেকে আমিষ খাবারকে 'অশুচি' মনে করেন এবং অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমিষ নিষিদ্ধ। এমনকি নির্দিষ্ট কিছু জাতি বা অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও মসলার গন্ধ নিয়েও ভারতে নিয়মিত হাসি-ঠাট্টা করা হয়।
কেবল ভারত বা দক্ষিণ এশিয়া নয়; আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের মানুষও পশ্চিমা দেশগুলোতে তাঁদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে লজ্জার মুখে পড়েছেন বলে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করা নিয়ে ঝামেলার পর আদিত্য প্রকাশ ও তার বাগদত্তা উর্মির বিরুদ্ধে একের পর এক কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আদিত্যের অভিযোগ, তুচ্ছ ওই ঘটনার জেরে তাদের গবেষণার অনুদান ও শিক্ষকতার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়। এমনকি দীর্ঘ মাস ধরে যাঁর অধীনে তারা পিএইচডি করছিলেন, সেই উপদেষ্টাও তাদের সঙ্গ ত্যাগ করেন।
এই পরিস্থিতির মুখে ২০২৫ সালের মে মাসে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ ও 'ধারাবাহিক প্রতিশোধমূলক' পদক্ষেপের অভিযোগে মামলা করেন। গত সেপ্টেম্বরে দীর্ঘ আইনি লড়াই এড়াতে উভয় পক্ষ একটি সমঝোতায় পৌঁছায়।
সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের ডিগ্রি প্রদান করতে রাজি হয়। তবে একই সঙ্গে তারা কোনো দায় স্বীকার করেনি এবং ভবিষ্যতে তাঁদের ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা বা চাকরির ওপর আজীবনের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের নৃবিজ্ঞান বিভাগ এখন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ করছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে। যারা বৈষম্যমূলক নীতি লঙ্ঘন করবে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে বলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
তবে আদিত্য প্রকাশ জানান, খাবার নিয়ে এমন বৈষম্যের শিকার তিনি এই প্রথম হননি। ইতালিতে বেড়ে ওঠার সময় স্কুলের শিক্ষকরাও তাকে দুপুরের খাবারের সময় আলাদা টেবিলে বসতে বলতেন। কারণ হিসেবে বলা হতো, তাঁর সহপাঠীরা ভারতীয় খাবারের গন্ধ সহ্য করতে পারে না।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'ভারতীয় খাবার ভয়াবহ' শীর্ষক একটি টুইটকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে খাদ্যাভ্যাস ও বর্ণবাদ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আদিত্যদের এই জয় সেই বিতর্ককেই আরও উসকে দিয়েছে।
আদিত্য প্রকাশের মতে, ইউরোপীয় সহপাঠীদের থেকে তাঁকে আলাদা বসিয়ে রাখা কিংবা খাবারের গন্ধের অজুহাতে মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করতে না দেওয়া আসলে এক ধরণের বর্ণবাদী আধিপত্য। তিনি বলেন, 'খাবারের গন্ধের অজুহাতে শ্বেতাঙ্গরা মূলত ভারতীয়দের নিজস্বতাকে সংকুচিত করতে চায়। অনেক দিন ধরেই 'কারি' শব্দটিকে ভারতীয়দের নিচু দেখানোর একটি শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।'
উর্মি ভট্টাচার্য জানান, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকেও খাবার নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের শিকার হতে হয়েছে। ২০২৪ সালে একজন উগ্র ডানপন্থী আন্দোলনকারী মন্তব্য করেছিলেন যে, কমলা হ্যারিস প্রেসিডেন্ট হলে হোয়াইট হাউস থেকে 'কারির গন্ধ' আসবে।
মামলায় উর্মি আরও অভিযোগ করেন, আদিত্যকে তার নৃবিজ্ঞান ক্লাসে 'সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা' বিষয়ে অতিথি বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর পর বিশ্ববিদ্যালয় তার ওপর আরও ক্ষুব্ধ হয়। ওই ক্লাসে আদিত্য নাম উল্লেখ না করে তাঁর সঙ্গে ঘটা বর্ণবাদী আচরণের উদাহরণ দিয়েছিলেন।
২০২৪ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) নিজেদের ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ জানিয়ে পোস্ট দিলে এই দম্পতিকে চরম বর্ণবাদী গালিগালাজ করা হয়। অনেকে তাদের 'ভারতে ফিরে যাও' বলে মন্তব্য করেন, এমনকি তাঁদের ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়েও কুরুচিপূর্ণ কথা বলা হয়।
আদিত্য ও উর্মি জানান, তারা কেবল চেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেন তাদের মানসিক যন্ত্রণা ও হেনস্তার বিষয়টি বুঝতে পেরে ক্ষমা চায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁরা সম্মানজনক কোনো ক্ষমা পাননি।
দীর্ঘ তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এই দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী এখন ভারতে ফিরে এসেছেন। আদিত্য বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রে হয়তো আর কখনোই ফেরা হবে না। আপনি আপনার কাজে যতই দক্ষ হন না কেন, মার্কিন ব্যবস্থা আপনাকে বারবার মনে করিয়ে দেবে যে আপনার গায়ের রঙ বা জাতীয়তার কারণে আপনাকে যেকোনো সময় বের করে দেওয়া হতে পারে। এই অনিশ্চয়তা খুবই ভয়াবহ।'
