টানা চতুর্থ বছরের মতো কমল চীনের জনসংখ্যা
জন্মহার বাড়াতে সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও, রেকর্ড পরিমাণ পতনের কারণে ২০২৫ সালে টানা চতুর্থ বছরের মতো চীনের জনসংখ্যা কমেছে। সোমবার প্রকাশিত সরকারি তথ্যে দেখা যায়, আগের বছরের তুলনায় জনসংখ্যা হ্রাসের গতি আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালের শেষে দেশটির মোট জনসংখ্যা ৩৩ লাখ ৯০ হাজার কমে দাঁড়িয়েছে ১৪০ কোটিতে। খবর বিবিসি'র।
১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম চীনে জন্মহার রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। প্রতি ১ হাজার জনে জন্মহার কমে হয়েছে ৫.৬৩। বিপরীতে, মৃত্যুহার বেড়ে প্রতি ১ হাজার জনে দাঁড়িয়েছে ৮.০৪, যা ১৯৬৮ সালের পর সর্বোচ্চ।
বয়স্ক জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়া এবং অর্থনীতির মন্থরগতির প্রেক্ষাপটে তরুণদের বিয়ে ও সন্তান নিতে উৎসাহিত করতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বেইজিং।
২০১৬ সালে চীন দীর্ঘদিনের 'এক সন্তান' নীতি বাতিল করে 'দুই সন্তান' নীতি চালু করে। তাতেও জন্মহারে কাঙ্ক্ষিত বা স্থায়ী বৃদ্ধি না হওয়ায় ২০২১ সালে দম্পতিদের তিন সন্তান নেওয়ার অনুমতি দেয় সরকার।
সম্প্রতি তিন বছরের কম বয়সী প্রতিটি সন্তানের জন্য মা-বাবাকে ৩,৬০০ ইউয়ান (৫০০ ডলার) সহায়তা দেওয়া শুরু করেছে চীন। একই সঙ্গে কয়েকটি প্রদেশ নিজস্ব উদ্যোগে 'বেবি বোনাস' বা শিশু ভাতা চালু করেছে, যার মধ্যে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা ও বর্ধিত মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে এসব প্রণোদনার কিছু কিছু নিয়ে বিতর্কও দেখা দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কনডম, জন্মনিরোধক পিল ও ডিভাইসের মতো গর্ভনিরোধক সামগ্রীর ওপর নতুন করে ১৩ শতাংশ কর আরোপ করায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চীনে প্রজনন হার বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন, যা নারীপ্রতি প্রায় একের কাছাকাছি। অথচ জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় হার হলো ২.১। একই অঞ্চলের দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ানের মতো দেশেও প্রজনন হার একইভাবে কম।
বেইজিংয়ের ইউওয়া পপুলেশন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে চীন বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল দেশ।
এছাড়া কয়েকজন চীনা নাগরিক বিবিসিকে জানিয়েছেন, আরও নানা কারণ তাদের সন্তান নিতে নিরুৎসাহিত করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—সন্তানসংক্রান্ত দুশ্চিন্তা ছাড়াই স্বাধীন ও চাপমুক্ত জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা।
২০২১ সালে বেইজিংয়ের এক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেছিলেন, 'আমার খুব কম সমবয়সীরই সন্তান আছে। আর যাদের আছে, তারা সেরা আয়া রাখা বা সেরা স্কুলে ভর্তি করানো নিয়ে সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় থাকে। এসব কথা শুনলেই ক্লান্ত লাগে।'
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের ধারণা, চীনের জনসংখ্যা হ্রাসের এই ধারা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২১০০ সাল নাগাদ দেশটির জনসংখ্যা বর্তমানের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি কমে যেতে পারে।
জনসংখ্যা সংকুচিত হওয়ার এই প্রবণতা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির ওপর গুরুতর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলছে। এতে একদিকে কর্মক্ষম জনশক্তি কমছে, অন্যদিকে দুর্বল হয়ে পড়ছে ভোক্তা চাহিদা।
একই সঙ্গে অনেক তরুণ তাদের মা-বাবার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। ফলে এমন বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যাদের নিজেদের দেখভাল নিজেরাই করতে হচ্ছে অথবা সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান 'চাইনিজ একাডেমি অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস'-এর মতে, পেনশন তহবিল দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যার প্রয়োজন মেটাতে যে তহবিল গঠন জরুরি, সেই সুযোগও দ্রুত দেশটির হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
