যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এড়াতে উপসাগরীয় দেশগুলোর জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা
প্রতিবেশী দেশ ইরানে দেশব্যাপী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে আরব উপসাগরীয় দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার যে হুমকি দিয়েছেন, তাতে পুরো অঞ্চলটি বড় ধরনের বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ওই অঞ্চলের দেশগুলো।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে পর্দার আড়ালে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে সৌদি আরব, কাতার ও ওমান। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, সৌদি আরব মার্কিন প্রশাসনকে ইরানের ওপর হামলা না চালানোর জন্য লবিং করছে। অন্যদিকে, কাতার ও ওমান ইরান ও মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্ব দিচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, গত বুধবার ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে যোগাযোগ ভেঙে পড়ার এবং হামলা আসন্ন—এমন খবরের পর উত্তেজনা প্রশমনে এই তিন দেশ সর্বোচ্চ স্তরের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করে।
আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যানা জ্যাকবস খালাফ বলেন, 'সবাই অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিল কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রথাগত যোগাযোগের পথগুলো অন্তত মার্কিন পক্ষ থেকে ব্যবহার করা হচ্ছিল না।" দোহার দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক মুহানাদ সেলুম বলেন, "জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) কর্মকর্তারা জানতেন না যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য আসলে কী।'
আঞ্চলিক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
ইরানে চলমান রক্তপাতের প্রেক্ষিতে ট্রাম্প বারবার সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেওয়ায় উত্তেজনা তুঙ্গে পৌঁছায়। ইরান কর্তৃপক্ষের দাবি, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর ১০০ জনেরও বেশি সদস্য নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, বিরোধী কর্মীরা বলছেন, গত ডিসেম্বরের শেষ থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ১ হাজারেরও বেশি। আল জাজিরা স্বাধীনভাবে এই পরিসংখ্যান যাচাই করতে পারেনি।
ট্রাম্প ইরানিদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, 'সহায়তা আসছে'। তিনি ঠিক কী ধরনের হামলার কথা ভাবছেন তা স্পষ্ট না হলেও, তাঁর মন্তব্য পুরো অঞ্চলকে যুদ্ধের আশঙ্কায় ফেলে দিয়েছে।
আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর আশঙ্কা, ইরানের ওপর সামরিক হামলা হলে তেলের দাম অস্থির হয়ে পড়বে, ব্যবসার নিরাপদ কেন্দ্র হিসেবে তাদের খ্যাতি নষ্ট হবে এবং তাদের নিজ মাটিতে ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি তৈরি হবে। এর আগেও এমন নজির দেখা গেছে। ২০১৯ সালে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল, যা সাময়িকভাবে সৌদি তেলের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর তেহরান কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়, যেখানে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছিল।
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের অবসানের আগে ইরান সেই হামলার ব্যাপারে আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছিল। যদিও সেই সংঘাত ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে কিছুটা দুর্বল করেছিল, তবুও মার্কিন স্বার্থে আঘাত করার মতো যথেষ্ট অস্ত্র ভাণ্ডার এখনও ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির রয়েছে। এ বিষয়ে মুহানাদ সেলুম বলেন, 'ইরানের কাছে ব্যালিস্টিক মিসাইল, সুপারসনিক মিসাইল এবং মিলিশিয়া গ্রুপ রয়েছে; তাই আঘাত করার কোনো কারণ পেলে তারা তা করবে।'
গত বুধবার ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তেহরান সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে শুরু করে তুরস্ক পর্যন্ত আঞ্চলিক দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে লক্ষ্যবস্তু করে তবে ওইসব দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানো হবে। এর পরপরই আল উদেইদ বিমানঘাঁটি থেকে কিছু কর্মীকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে বুধবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি তথ্য পেয়েছেন যে 'ইরানে হত্যা থামছে, থেমেছে... এবং সেখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা নেই'। কেউ কেউ একে উত্তেজনা প্রশমনের পথ হিসেবে দেখলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি।
অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের প্রতিটি সদস্যের ইরানের সাথে ভিন্ন ইতিহাস রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবাই এই আশঙ্কায় রয়েছে যে—যদি সুপ্রিম লিডার আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত কেউ আসেন বা বর্তমান ব্যবস্থার আকস্মিক পতন ঘটে, তবে পরবর্তী শূন্যতা কে পূরণ করবে।
২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইরাক আক্রমণ এবং পরবর্তী বিশৃঙ্খলা—যার মধ্যে ছিল গৃহযুদ্ধ, আল-কায়েদার শক্তিশালী হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত আইএসআইএল (আইএস)-এর উত্থান—আরব দেশগুলো সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি চায় না। বিশেষ করে ৯ কোটি মানুষের একটি দেশ, যার হাতে বিপুল অস্ত্র ভাণ্ডার রয়েছে, সেখানে বিশৃঙ্খলা হলে পুরো অঞ্চলের জন্য তা ভয়াবহ হবে।
খালাফ বলেন, 'তারা হয়তো ইরানি নেতৃত্বকে দুর্বল দেখতে পছন্দ করবে, কিন্তু তারা সবাই সেখানে বিশৃঙ্খলা, অনিশ্চয়তা এবং আরও কট্টরপন্থীদের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা নিয়ে বেশি চিন্তিত।'
কাতার, কুয়েত এবং ওমান তাদের এই উত্তরের প্রতিবেশীর সাথে সহাবস্থানের পথ খুঁজে নিয়েছে। দোহা এমনকি তেহরানের সাথে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র শেয়ার করে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইও ইরানের সাথে বাণিজ্যের প্রধান বন্দর এবং দেশ দুটির মধ্যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব রয়েছে। ফলে ইরানে অস্থিরতা বা আমিরাতের মাটিতে হামলা হলে তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে গত এক সপ্তাহে আমিরাতি কর্মকর্তারা নীরব ছিলেন।
সৌদি আরব এবং ইরান দীর্ঘদিনের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই বৈরিতা একটি বাস্তবমুখী সম্পর্কে রূপ নিয়েছে, যার লক্ষ্য হচ্ছে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা এবং একে অপরকে উত্তেজনা থেকে বিরত রাখা। রিয়াদ বিশেষ করে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে শঙ্কিত। কারণ দেশটি তেল নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন ও অর্থনীতি বহুমুখীকরণের জন্য 'ভিশন ২০৩০' নামে বড় ধরনের সংস্কার কাজ চালাচ্ছে, যার জন্য অঞ্চলটিতে স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।
খালাফ আরও যোগ করেন, 'সৌদি আরব কোথাও শাসক পরিবর্তনের বিষয়ে মোটেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না—এটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর ফলাফল অনিশ্চিত।' গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আদেল আল-জুবেইর বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে স্থিতিশীলতা এবং শান্তি অর্জন করা, যাতে আমরা আমাদের সম্পদ জনগণের জন্য উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে ব্যয় করতে পারি।'
তা সত্ত্বেও সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালেদ বাতারফি বলেন, রিয়াদ ইরানে পরিবর্তনকে স্বাগত জানাবে যদি তা ধীরে ধীরে হয় এবং এমন নেতৃত্ব আসে যারা পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করতে ইচ্ছুক এবং যুক্তরাষ্ট্রের কম বিরোধী। তিনি বলেন, 'তবে হঠাৎ করে শাসক পরিবর্তন এবং দেশ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি কারও জন্য ভালো হবে না। পুরো অঞ্চলটি এখন অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে এবং আমরা আমাদের ঘরের দরজায় নতুন কোনো আগুন দেখতে চাই না।'
