ল্যাবরেটরি থেকে সুপারকম্পিউটার: যেভাবে ওষুধ আবিষ্কারে বিপ্লব আনছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
প্যাট্রিক শোয়াব কোনো সাধারণ ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষক নন, আর তার কর্মক্ষেত্রও কোনো সাধারণ ল্যাবরেটরি নয়। সেখানে নেই কোনো টেবিল বা টেস্ট টিউবে বুদবুদ তোলা তরল। সাদা অ্যাপ্রনও গায়ে নেই কারও। ড. শোয়াব বরং পুরোপুরি কালো পোশাকে সজ্জিত। লন্ডনের কিংস ক্রসের মতো আধুনিক ও ফ্যাশনেবল এলাকায় তার এই বেশভুষা বেশ মানানসই।
বিশ্ববিখ্যাত ওষুধ কোম্পানি জিএসকে-এর হয়ে কাজ করছেন ড. শোয়াব। তার কাজ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে ওষুধ তৈরির ভবিষ্যৎকে নতুন করে সাজানো। তিনি ল্যাবরেটরির কাচের পাত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কম্পিউটারের মাধ্যমে নতুন ওষুধ ডিজাইনের কাজ করছেন।
এই লক্ষ্যে তিনি 'ফেনফর্মার' নামে একটি সফটওয়্যার তৈরি করছেন, যা জিনোম বা জিনের গঠন পড়তে পারে। এটি জিনোমিক তথ্যের সঙ্গে ফেনোটাইপ বা শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সংযোগ ঘটিয়ে বুঝতে চেষ্টা করে কীভাবে জিনগুলো রোগ সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ এবং সেগুলোর নেপথ্য কারণ সম্পর্কে নতুন নতুন ধারণা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
বোস্টন-ভিত্তিক বায়োটেক প্রতিষ্ঠান 'ইনসিলিকো মেডিসিন' সম্ভবত প্রথম ওষুধ আবিষ্কারে নতুন প্রজন্মের এআই বা ট্রান্সফরমার মডেল ব্যবহার শুরু করে। ২০১৯ সালে তারা ইডিওপ্যাথিক পালমোনারি ফাইব্রোসিস নামক ফুসফুসের রোগের জন্য ওষুধ খোঁজা শুরু করে।
এআই ব্যবহার করে তারা প্রথমে একটি প্রতিশ্রুতিশীল প্রোটিন টার্গেট খুঁজে বের করে। এরপর দ্বিতীয় একটি এআই এমন সব মলিকিউল বা অণু প্রস্তাব করে যা ওই প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এর আচরণ পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। মানুষের চেয়ে অনেক দ্রুত কাজ করে মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে তারা 'রেনটোসার্টিব' নামের একটি ওষুধ তৈরির পর্যায়ে চলে আসে, যেখানে সাধারণত সাড়ে চার বছর সময় লাগত। বর্তমানে ইনসিলিকো মেডিসিনের হাতে ক্যানসার, কিডনি ও অন্ত্রের রোগের জন্য ৪০টিরও বেশি এআই-উদ্ভাবিত ওষুধ পরীক্ষাধীন রয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সালে এই খাতে বিনিয়োগ ৩.৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০৩০ সালে ১৫.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোও এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধছে।
২০২৪ সালেই এমন প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের ডজনখানেক চুক্তি হয়েছে। গত অক্টোবরে আরেক ওষুধ কোম্পানি এলি লিলি চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার সঙ্গে মিলে এই শিল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার তৈরির ঘোষণা দিয়েছে।
ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এবং এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অংশীদারিত্বও বাড়ছে। স্বাস্থ্য-তথ্য সংস্থা আইকিউভিআইএ-এর মতে, ২০২৪ সালে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের ডজনখানেক চুক্তি হয়েছে। গত অক্টোবরে আরেক ওষুধ জায়ান্ট এলি লিলি চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার সঙ্গে মিলে এই শিল্পের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার তৈরির ঘোষণা দিয়েছে, যা ওষুধ আবিষ্কার ও উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।
ঔষধ শিল্পের অদ্ভুত অর্থনীতির কারণে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ঢোকা ৯০ শতাংশ ওষুধই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। একটি সফল ওষুধ তৈরিতে খরচ পড়ে প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার। তবে এআই এই চিত্রে পরিবর্তন আনছে। এআই-ডিজাইন করা ওষুধগুলো এখন প্রাক-ক্লিনিক্যাল ধাপ (মানুষের ওপর পরীক্ষার আগের ধাপ) মাত্র ১২-১৮ মাসে পার করছে, যা আগে লাগত ৩-৫ বছর।
২০২৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিরাপত্তা পরীক্ষায় এআই ওষুধের সাফল্যের হার ৮০-৯০ শতাংশ, যেখানে ঐতিহাসিক গড় ছিল ৪০-৬৫ শতাংশ। এর ফলে পুরো পাইপলাইন পেরিয়ে ওষুধের সফল হওয়ার সামগ্রিক হার ৫-১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯-১৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
সাধারণত নতুন ওষুধ তৈরির শুরুতে ছোট জৈব অণুগুলো স্ক্রিনিং করা হয়। এআই এখন শত শত কোটি অণুর লাইব্রেরি থেকে সফটওয়্যার ইমুলেশনের মাধ্যমে ক্ষমতা, দ্রাব্যতা এবং বিষাক্ততা পরীক্ষা করতে পারে—কোনো টেস্ট টিউব ছাড়াই। অ্যাস্ট্রাজেনেকার এই বিভাগের দায়িত্বে থাকা জিম ওয়েদারাল বলেন, এটি আগের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে ভালো অণু বাছাই করতে পারে এবং তাদের ছোট অণু আবিষ্কারের ৯০ শতাংশ কাজই এখন এআইয়ের সহায়তায় হচ্ছে।
এআই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের নকশা উন্নত করতেও সাহায্য করছে। জিএসকে-র এআই প্রধান কিম ব্র্যানসন 'কগিটো ফর্জ' নামে একটি এজেন্ট-ভিত্তিক সিস্টেমের ডেমো দেখিয়েছেন। জীববিদ্যা সংক্রান্ত কোনো প্রশ্ন করলে এটি নিজের কোড লিখে উত্তর খোঁজে, উপযুক্ত ডেটাসেট সংগ্রহ করে এবং সিদ্ধান্তসহ একটি প্রেজেন্টেশন তৈরি করে দেয়।
সেখান থেকে এটি একটি রোগ সম্পর্কে হাইপোথিসিস তৈরি করতে পারে এবং লিটারেচার সার্চের মাধ্যমে তা যাচাই করতে পারে। এই সার্চে তিনটি এজেন্ট কাজ করে: একজন খুঁজে বের করে কেন হাইপোথিসিসটি ভালো, দ্বিতীয়জন খোঁজে কেন এটি ভালো নয়, এবং তৃতীয়জন বিচার করে কোনটি সঠিক।
এআই ট্রায়ালের জন্য রোগী নির্বাচনেও প্রতিশ্রুতিশীল। এটি প্রার্থীদের স্বাস্থ্য রেকর্ড, বায়োপসি এবং বডি স্ক্যান বিশ্লেষণ করে শনাক্ত করতে পারে কার ওপর নতুন ওষুধটি সবচেয়ে ভালো কাজ করবে। ভালো অংশগ্রহণকারী মানে ছোট, দ্রুত এবং সস্তা ট্রায়াল।
তবে ট্রায়াল উন্নত করতে এআইয়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যবহার হলো 'সিন্থেটিক পেশেন্ট' বা কৃত্রিম রোগী তৈরি করা, যাকে 'ডিজিটাল টুইন'ও বলা হয়। এআই অতীতের ট্রায়ালের ডেটা বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারে, চিকিৎসা না পেলে একজন রোগীর কী হতে পারে। এরপর একজন আসল রোগীকে যখন ট্রায়ালে ওষুধ দেওয়া হয়, তখন এআই একই বৈশিষ্ট্যের (বয়স, ওজন, রোগের পর্যায়) একটি ভার্চুয়াল রোগী তৈরি করে। আসল রোগীর ওপর ওষুধের কার্যকারিতা এই ভার্চুয়াল বিকল্পের সঙ্গে তুলনা করে পরিমাপ করা হয়।
এই পদ্ধতি গৃহীত হলে ট্রায়ালের কন্ট্রোল গ্রুপের আকার কমবে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি বাদও দেওয়া যেতে পারে। এতে অংশগ্রহণকারীরাও খুশি হবেন, কারণ তাদের প্ল্যাসিবো বা নকল ওষুধ পাওয়ার বদলে আসল চিকিৎসা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
সান ফ্রান্সিসকোর 'আনলার্ন.এআই'-এর ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই পদ্ধতিতে পারকিনসন্স রোগের ট্রায়ালে কন্ট্রোল গ্রুপের আকার ৩৮ শতাংশ এবং আলঝেইমার রোগের ট্রায়ালে ২৩ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে।
অবশ্য এআইয়ের কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। অনেক প্রোটিন বা আরএনএ অণুর জটিল গঠন এবং নড়াচড়ার প্রবণতা বোঝা কঠিন। তবে বিজ্ঞানীরা আরএনএ ফোল্ডিং এবং কোষের সিমুলেশন বা প্রতিলিপি তৈরিতে এআইকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
সল্ট লেক সিটির 'রিকারশন' কোম্পানি একটি এআই 'ফ্যাক্টরি' তৈরি করেছে, যেখানে লাখ লাখ মানব কোষের রাসায়নিক ও জিনগত পরিবর্তনের ছবি তোলা হয়। নিউ ইয়র্কের 'ওকিন' হাসপাতালের রোগীদের বিশাল মলিকিউলার ডেটা দিয়ে তাদের মডেলকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ওকিনের প্রধান টম ক্লজেল দাবি করেন, মানুষ যা আবিষ্কার করতে পারে না তা করে এই কাজ জীববিজ্ঞানে সত্যিকারের 'আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স'-এর দিকে এগোচ্ছে।
ওপেনএআই এবং গুগল ডিপমাইন্ডের আইসোমরফিক ল্যাবসের মতো কোম্পানিগুলোও এখন জীবন বিজ্ঞানে যুক্তি প্রয়োগ ও আবিষ্কারের জন্য সিস্টেম তৈরি করছে। আপাতত ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে বিশাল ডেটা এবং তা বোঝার মতো প্রেক্ষাপট থাকায় তারা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, তাই এখন সহযোগিতার যুগ চলছে। যেমন, ওপেনএআই মডার্নার সঙ্গে মিলে ব্যক্তিগত ক্যানসার ভ্যাকসিন তৈরির কাজ করছে।
সব মিলিয়ে, এআই ইতিমধ্যেই ওষুধ শিল্পে অনেক উন্নতি ঘটিয়েছে। যদি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের শেষ পর্যায়গুলোতেও এটি শুরুর ধাপের মতো সাফল্য দেখাতে পারে, তবে আগামী দিনে বাজারে আসা নতুন ওষুধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতির সম্ভাবনা হবে বিশাল।
