ইরানের বিরুদ্ধে ‘অত্যন্ত কঠোর’ পদক্ষেপের কথা ভাবছে মার্কিন সামরিক বাহিনী: ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে চলমান বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে সম্ভাব্য সামরিক হস্তক্ষেপসহ কিছু 'কঠোর পদক্ষেপ' নেওয়ার কথা ভাবছে ওয়াশিংটন।
রোববার গভীর রাতে প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ান-এ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, 'আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সামরিক বাহিনী ব্যাপারটা পর্যালোচনা করছে। আমরা অত্যন্ত কঠোর কিছু বিকল্প নিয়ে ভাবছি। শিগগিরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।'
ট্রাম্প দাবি করেন, তার সামরিক হামলার হুমকির পর ইরানের নেতারা 'আলোচনা' করার প্রস্তাব দিয়ে ফোন করেছে এবং এ লক্ষ্যে একটি 'বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে'।
তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে আরও বলেন, 'আলোচনা বা বৈঠকের আগেই আমাদের হয়তো ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।'
এদিকে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প দেশটির বিরুদ্ধে বেশ কিছু সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের কথা ভাবছেন। সিএনএনকে দুজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ করলে তেহরানে হামলার যে হুমকি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, সেটি তিনি কার্যকর করতে পারেন।
ওই কর্মকর্তারা সিএনএনকে বলেন, ট্রাম্পকে গত কয়েক দিনে ইরানে বিভিন্ন ধরনের হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়েছে। তাকে দেওয়া অন্যতম প্রস্তাব হলো তেহরানের বিক্ষোভ দমনে কাজ করা নিরাপত্তা সংস্থাকে টার্গেট করা।
রোববার ট্রাম্প বলেন, আলোচনার জন্য ইরান থেকে শনিবার তাকে ফোন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, 'ইরানের নেতারা আলোচনা করতে চান। আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মার খেতে খেতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। ইরান আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়।'
তবে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে উদ্বেগ রয়েছে, ইরানে সামরিক হামলা উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে, পাশাপাশি বিক্ষোভের মূল উদ্দেশ্যকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কর্মকর্তাদের মতে, হামলার ফলে ইরান সরকারের প্রতি উল্টো জনগণের সমর্থন বাড়তে পারে অথবা তেহরান নিজেও সামরিক শক্তি দিয়ে পাল্টা হামলা চালাতে পারে।
নিউইয়র্ক টাইমস প্রথম খবর প্রকাশ করে যে ট্রাম্পকে এসব বিকল্প সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা আরও বলেন, বিক্ষোভকারীদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ট্রাম্প সরাসরি সামরিক হামলার পাশাপাশি আরও কিছু বিকল্প নিয়ে ভাবছেন। এসব বিকল্পের মধ্যে রয়েছে ইরানি সামরিক বাহিনী বা সরকারি লক্ষ্যবস্তুগুলোতে সাইবার অভিযান চালানো, যা বিক্ষোভ দমনে সরকারের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে।
এছাড়া সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা ইরানের অর্থনীতি, বিশেষ করে জ্বালানি ও ব্যাংকিং খাতের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিও এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে স্টারলিঙ্কের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে।
ট্রাম্প বলেছেন, ফ্লোরিডা থেকে ওয়াশিংটন ফেরার পর তিনি স্টারলিঙ্কের মালিক ইলন মাস্কের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারেন। এর আগে ২০২২ সালে ইরানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও একইভাবে ইন্টারনেট সংযোগ সচল রাখতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
কর্মকর্তারা বলেন, ট্রাম্পের জন্য এই সম্ভাব্য বিকল্পগুলো প্রস্তুত করতে বেশ কয়েকটি সংস্থা কাজ করছে। আগামী সপ্তাহে এ নিয়ে আরও আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং হওয়ার কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মঙ্গলবার ট্রাম্প জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে আলোচনা করবেন।
এদিকে তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ওয়াশিংটন যদি বিক্ষোভ-কবলিত ইরানে কোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ করে, তবে তারা মার্কিন সামরিক ও বাণিজ্যিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরান বা আমাদের সীমানার ভেতরে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে মার্কিন সামরিক কেন্দ্র ও জাহাজগুলোকে আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ধরা হবে।'
ইরান যদি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী হবে— সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, 'আমরা তাদের ওপর এমন ভয়াবহ মাত্রায় আঘাত হানব যা তারা আগে কখনো দেখেনি।'
সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে ইরানে নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করছেন। হোয়াইট হাউসের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ট্রাম্প যেসব বিকল্প নিয়ে ভাবছেন, তার কোনোটিতেই ইরানে সরাসরি সৈন্য মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই।
হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরান-এর (এইচআরএ) ডেপুটি ডিরেক্টর স্কাইলার থম্পসন সিএনএনের কাছে দাবি করেন, গত ১৫ দিনে ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ১৬৯ শিশুসহ অন্তত ১০ হাজার ৬৭৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এইচআরএর সংবাদ সংস্থা এইচআরএএনএর দাবিমতে, এ সময়ে অন্তত ৪৯০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।
