অস্ট্রেলিয়ান ভিসার দুঃস্বপ্ন: আটকে পড়া ভারতীয় নারীদের অন্তহীন অপেক্ষা!
কিরণের স্বামী থাকতেন ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরে, অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে। আর কিরণ থাকতেন ভারতের উত্তরাঞ্চলের এক গ্রামে, শ্বশুরবাড়িতে। কিন্তু এই বিশাল দূরত্ব সত্ত্বেও স্বামীর নজর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও রেহাই পেতেন না তিনি। ব্রিসবেনে নিজের ঘরে বসেই স্ক্রিনে তিনি প্রতিনিয়ত স্ত্রীর ওপর নজর রাখতেন।
কিরণ সেই দিনগুলোর কথা মনে করে বলেন, 'ও বলত, তুমি কী করছো না করছো, আমি সব সময় দেখতে পাই।'
ঘটনাটি ২০১৭ সালের। কিরণের স্বামী তখন ভারত সফরে এসেছিলেন। তাদের প্রথম সন্তান জন্মের পরপরই বাড়ির রান্নাঘর, বসার ঘর ও বাইরের এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়।
এর দুই বছর আগে, পাঞ্জাবের ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের কাছের এক এলাকায় শিখ রীতি মেনে তাদের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের পরের আট বছরে স্বামী মাত্র চারবার ভারতে এসেছিলেন এবং সব মিলিয়ে মাসখানেকের মতো স্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।
বিয়ের পর বিদেশে গিয়ে নতুন জীবন শুরুর স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল কিরণকে। কিন্তু সেই স্বপ্ন যে এতটা দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি।
কুইন্সল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা 'দ্য ব্যাঙ্গেল ফাউন্ডেশন'-এর প্রধান ইয়াসমিন খান জানান, কিরণের মতো হাজারো ভারতীয় নারী এমন প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। দক্ষিণ এশীয় নারীদের পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে কাজ করা এই সংস্থার মতে, বিয়ের নামে এসব নারীকে এক প্রকার ফাঁদে ফেলা হচ্ছে।
নারী অধিকারকর্মীরা এই পরিস্থিতির শিকার নারীদের নাম দিয়েছেন 'পরিত্যক্তা কনে' বা 'অ্যাবান্ডনড ব্রাইডস'। মূলত যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দেশে বসবাসরত ভারতীয় বংশোদ্ভূত পুরুষেরা দেশে এসে বিয়ে করার পরই নববধূর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অনেক ক্ষেত্রে এই প্রতারণার মূল উদ্দেশ্য থাকে অর্থ বা যৌতুক হাতিয়ে নেওয়া। ভারতে ১৯৬১ সালে যৌতুক নিষিদ্ধ হলেও এখনো এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। যৌতুকের টাকা পকেটস্থ করে অনেক স্বামীই উধাও হয়ে যান।
আবার এমন ঘটনাও ঘটে, যেখানে স্ত্রীকে দেশে রেখে যাওয়া হয় শুধু শ্বশুরবাড়ির দেখাশোনা বা গৃহস্থালি কাজের জন্য। অধিকারকর্মীরা একে আধুনিক দাসত্বের সঙ্গে তুলনা করছেন।
অবশ্য সব সময় যে ইচ্ছাকৃতভাবেই এমনটা ঘটে, তা নয়। অনেক স্বামী হয়তো স্ত্রীকে বিদেশে নিয়ে যেতে চান, কিন্তু হঠাৎ ভিসা জটিলতার কারণে তা আর হয়ে ওঠে না।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত এমন অনেক 'অ্যাবান্ডনড ব্রাইডস'র খোঁজ পাওয়া গেছে। তবে আইনি জটিলতার কারণে তাদের জন্য বিচার পাওয়া বা এর সুরাহা করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
বিয়ের আগে কিরণের স্বামীকে কথা দিয়েছিলেন, তারা ভারত ও অস্ট্রেলিয়া—উভয় দেশেই থাকবেন। পরে সন্তান বড় করার জন্য স্থায়ীভাবে অস্ট্রেলিয়ায় থিতু হবেন। কিন্তু কিরণ অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পরই সুর পাল্টে ফেলেন তার স্বামী। সাফ জানিয়ে দেন, স্ত্রীকে তিনি কখনোই অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাবেন না।
কিরণ বলেন, 'আমি বুঝতে পারছিলাম, এই জীবন আমার জন্য নয়। আমার প্রতি ওর কোনো আগ্রহ ছিল না। আমাকে শুধু অন্যদের সেবা করার জন্য এই বাড়িতে আনা হয়েছিল।'
বিয়ের আগে ওই ব্যক্তি সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতেন না ২২ বছর বয়সী কিরণ। শুধু জানতেন, ছেলে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে থাকেন (পিআর হোল্ডার), ভালো চাকরি করেন এবং মদ্যপান করেন না। পরিবারের চোখে যা ছিল আদর্শ পাত্রের গুণ।
বিয়ের মাত্র এক মাস পরই কিরণের স্বামী অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে যান। এরপর হাতে গোনা কয়েকবার তিনি ভারতে এসেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই ঝগড়া হতো এবং তা গড়াত মারধরে।
ব্রিসবেন থেকে ফোনে কিরণকে নির্দেশ দিতেন স্বামী। বলতেন, মায়ের (শাশুড়ি) সব কথা যেন অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়। শ্বশুরবাড়ির সবার জন্য রান্না ও ধোয়ামোছার কাজ ছিল কিরণের নিত্যদিনের রুটিন।
কিরণ বলেন, 'সে আমাকে বলত, ক্যামেরায় আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি। আমার বাবা-মায়ের জন্য ঠিকঠাক মতো রান্না করো।'
২০২২ সালের শুরুর দিকে মানসিক অবসাদে ভেঙে পড়েন কিরণ। তখন পাঞ্জাবের স্থানীয় মুরুব্বিরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। উল্লেখ্য, পাঞ্জাবকে এখন 'পরিত্যক্তা কনেদের' কেন্দ্রস্থল বলা হয়। শেষমেশ চাপে পড়ে পরের বছর কিরণ ও সন্তানদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসেন তার স্বামী।
'তখন ভেবেছিলাম, ঈশ্বর হয়তো আমার প্রার্থনা শুনেছেন। আমি স্বামীর সঙ্গে থাকতে পারব, আমার সন্তানরা তাদের বাবাকে কাছে পাবে,' বলেন কিরণ।
কিন্তু ব্রিসবেনে পৌঁছানোর পর কিরণ জানতে পারেন আরেক রূঢ় সত্য। তার স্বামী তাকে পার্টনার ভিসার (যা দিয়ে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ থাকে) বদলে টুরিস্ট ভিসায় নিয়ে এসেছেন। কিছুদিন পরই ওই ব্যক্তি বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করেন।
এর মানে দাঁড়ায়, সন্তানরা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক হলেও কিরণের সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার কোনো আইনি অধিকার নেই।
কিরণ ও তার স্বামীর বিচ্ছেদের পর সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন ইয়াসমিন খান। তিনি বলেন, ভিসার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কিরণের ওপর যে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ চালানো হয়েছে, তা একধরনের জবরদস্তিমূলক আচরণ । তাদের সংস্থার কাছে আসা অনেক নারীই এমন পরিস্থিতির শিকার।
ইয়াসমিন খানের সংস্থা 'দ্য ব্যাঙ্গেল ফাউন্ডেশন' বছরে প্রায় এক হাজার ফোনকল পায়, যার সবই পারিবারিক নির্যাতন, ভিসা জটিলতা বা পাচারসংক্রান্ত। এর ৬০ শতাংশই আসে অন্য রাজ্য বা দেশের বাইরে থেকে।
তিনি আরও বলেন, ভিন্ন সংস্কৃতি বা প্রথা (যেমন—পারিবারিক বিয়ে বা অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ) বোঝাতে গিয়ে সংকোচবোধ করেন অনেক নারী। এই লজ্জা, সম্মানহানির ভয় বা বিব্রতকর পরিস্থিতির কারণে তারা মূলধারার সেবা সংস্থাগুলোর কাছে সাহায্য চাইতে যান না।
বর্তমানে দুই সন্তানকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থাকার আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কিরণ। এখনো তিনি আশায় বুক বাঁধেন—স্বামীর কাছ থেকে যে সুখ তিনি পাননি, সন্তানরা হয়তো তাকে সেই সুখ এনে দেবে।
*ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।
