যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন এজেন্টের গুলিতে নিহত কে এই রেনি নিকোল গুড?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিস শহরে গত সপ্তাহে ফেডারেল ইমিগ্রেশন বা অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে নিহত নারীর পরিচয় পাওয়া গেছে। ৩৭ বছর বয়সী ওই নারীর নাম রেনি নিকোল গুড। তিনি তিন সন্তানের মা, একজন পুরস্কারজয়ী কবি এবং শৌখিন গিটারিস্ট ছিলেন। সম্প্রতি তিনি এই শহরে বসবাস শুরু করেছিলেন।
স্থানীয় নেতাদের দাবি, তিনি সেখানে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী একজন আইনি পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তাকে 'অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী' হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
রেনির মৃত্যু দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে। বিক্ষোভকারীরা প্ল্যাকার্ড হাতে 'জাস্টিস ফর রেনি' বা 'রেনির জন্য ন্যায়বিচার চাই' স্লোগানে রাস্তায় নেমেছেন।
রেনির মা ডোনা গঙ্গার স্থানীয় পত্রিকা 'মিনেসোটা স্টার ট্রিবিউন'-কে বলেন, ঘটনার সময় তার মেয়ে সম্ভবত ভীষণ আতঙ্কিত ছিল। তিনি বলেন, 'রেনি ছিল আমার চেনা সবচেয়ে দয়ালু মানুষদের একজন। সে সারা জীবন মানুষের সেবা করেছে। সে ছিল স্নেহময়ী, ক্ষমাশীল এবং একজন অসাধারণ মানুষ।'
রেনির বাবা টিম গঙ্গার ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, 'তার জীবনটা সুন্দর ছিল, কিন্তু কঠিনও ছিল।' রেনির পরিবারের জন্য ৫০ হাজার ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে খোলা একটি তহবিল বা ফান্ডরাইজার মাত্র ১৫ ঘণ্টায় ৫ লাখ ডলারেরও বেশি সংগ্রহ করেছে।
রেনি নিকোল গুড মূলত কলোরাডো স্প্রিংসের বাসিন্দা ছিলেন এবং গত বছর কানসাস সিটি থেকে মিনিয়াপোলিসে চলে আসেন। ইনস্টাগ্রাম বায়োতে তিনি নিজেকে 'কবি, লেখক, স্ত্রী এবং মা' হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি একজন মার্কিন নাগরিক ছিলেন।
মিনেসোটা স্টার ট্রিবিউন জানায়, রেনি তার দ্বিতীয় স্বামী টিম ম্যাকলিনের সঙ্গে পডকাস্ট করতেন। ২০২৩ সালে ম্যাকলিন মারা যান। তাদের ছয় বছরের একটি ছেলে রয়েছে। প্রথম স্বামীর সংসারে রেনির আরও দুটি সন্তান আছে। প্রথম স্বামী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রেনি কোনো অ্যাক্টিভিস্ট বা আন্দোলনকর্মী ছিলেন না। তিনি একজন ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান ছিলেন এবং যৌবনে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে মিশনারি কাজে গিয়েছিলেন।
রেনি অতীতে ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং একটি ক্রেডিট ইউনিয়নে কাজ করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূলত সন্তানদের দেখাশোনা করেই সময় কাটাতেন। ২০২০ সালে ওল্ড ডমিনিয়ন ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে স্নাতক করার সময় তিনি একাডেমি অব আমেরিকান পোয়েটস থেকে একটি পুরস্কার জিতেছিলেন।
মিনিয়াপোলিসের দক্ষিণ অংশে আইসিই-এর একটি অভিযানের সময় রেনি সেখানে আইনি পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেছেন রাজ্যের কয়েকজন নেতা। আইনি পর্যবেক্ষকরা মূলত স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বিক্ষোভ বা অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করেন।
রেনির মা বলেন, তার মেয়ে আইসিই কর্মকর্তাদের চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
তবে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা বলছেন ভিন্ন কথা। মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম সাংবাদিকদের বলেন, রেনি সারাদিন ধরে কর্মকর্তাদের পিছু নিচ্ছিলেন এবং নিজের গাড়ি দিয়ে তাদের পথ আটকে চিৎকার করছিলেন।
নোয়েম অভিযোগ করেন, রেনি তার গাড়িটিকে 'অস্ত্র' হিসেবে ব্যবহার করে একজন কর্মকর্তাকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেন, 'এটি ছিল কর্মকর্তাদের হত্যা বা আহত করার চেষ্টা, যা অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদের শামিল।' তিনি দাবি করেন, আইসিই এজেন্ট প্রাণভয়ে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালান।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ লিখেছেন, 'গাড়ি চালানো ওই নারী খুবই বিশৃঙ্খল আচরণ করছিলেন, বাধা দিচ্ছিলেন এবং প্রতিরোধ করছিলেন।' ট্রাম্প তাকে 'পেশাদার উস্কানিদাতা' আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে একজন আইসিই কর্মকর্তাকে চাপা দিয়েছেন।
তবে মিনিয়াপোলিসের মেয়র জ্যাকব ফ্রে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'ভিডিওটি আমি নিজে দেখেছি এবং সবাইকে সরাসরি বলতে চাই: ওটা ছিল সম্পূর্ণ বাজে কথা। এটি ছিল একজন এজেন্টের ক্ষমতার বেপরোয়া ব্যবহার, যার ফলে একজন মানুষ মারা গেলেন, নিহত হলেন।'
উল্লেখ্য, রেনি যে স্থানে নিহত হন, সেখান থেকে মাত্র এক মাইল দূরেই ২০২০ সালে পুলিশ কর্মকর্তার হাতে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড নিহত হয়েছিলেন, যা বিশ্বজুড়ে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল।
