গ্রিনল্যান্ড কেনার সম্ভাব্য প্রস্তাব নিয়ে সক্রিয় আলোচনা চালাচ্ছেন ট্রাম্প: হোয়াইট হাউস
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ডেনমার্কের মালিকানাধীন গ্রিনল্যান্ড কেনার একটি সম্ভাব্য প্রস্তাব নিয়ে 'সক্রিয়ভাবে' আলোচনা করছেন বলে নিশ্চিত করেছে হোয়াইট হাউস। খবর বিবিসি'র।
বুধবার হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের বলেন, এটি এমন একটি বিষয়, যা 'বর্তমানে প্রেসিডেন্ট এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা দল সক্রিয়ভাবে আলোচনা করছে'।
তবে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক—উভয় পক্ষই বারবার জোর দিয়ে জানিয়ে এসেছে, দ্বীপটি বিক্রির জন্য নয়।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ড দখলের ক্ষেত্রে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি—এমন প্রশ্নের জবাবে লেভিট বলেন, সব বিকল্পই সব সময় টেবিলে ছিল, তবে ট্রাম্পের 'প্রথম পছন্দ সব সময়ই ছিল কূটনীতি'।
গত শনিবার ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে ট্রাম্পের একতরফা সামরিক শক্তি প্রয়োগের পর এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ন্যাটো জোটের মিত্র দেশ ডেনমার্ক বলেছে, তাদের ভূখণ্ডে যেকোনো আক্রমণ এই সামরিক জোটের সমাপ্তি ঘটাবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের সবচেয়ে কম জনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও উত্তর আমেরিকা ও আর্কটিকের মাঝখানে এর ভৌগোলিক অবস্থান গ্রিনল্যান্ডকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ওপর নজরদারির জন্য দ্বীপটি একটি উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পিটুফিক স্পেস বেস, যা আগে থুল এয়ার বেস নামে পরিচিত ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনা করে আসছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি আন্তর্জাতিক আগ্রহ বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিরল খনিজ উপাদান, ইউরেনিয়াম ও লোহা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে যাওয়ায় এসব সম্পদ উত্তোলন তুলনামূলক সহজ হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ও গ্যাসের মজুদও থাকতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার জানিয়েছেন, তিনি আগামী সপ্তাহে ডেনমার্কের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনায় বসবেন।
এর আগে ২০১৯ সালে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে সে সময় তাকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল, দ্বীপটি বিক্রির জন্য নয়।
লেভিট বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়টি কোনো নতুন ধারণা নয়।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রেসিডেন্ট আপনাদের সবার কাছে এবং বিশ্বের কাছেও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের আগ্রাসন ঠেকাতে গ্রিনল্যান্ডকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বার্থ হিসেবে দেখেন। এ কারণেই তার দল বর্তমানে একটি সম্ভাব্য ক্রয় প্রক্রিয়া কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করছে।'
চলতি সপ্তাহের শুরুতে হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, গ্রিনল্যান্ড দখলের ক্ষেত্রে সামরিক শক্তি প্রয়োগসহ বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ট্রাম্প আলোচনা করছেন।
লেভিট বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বার্থ কী হতে পারে—তা বিবেচনা করার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য সব বিকল্পই সব সময় টেবিলে থাকে।'
এর আগে একই দিন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল ব্যারট জানান, রুবিও তার সঙ্গে এক ফোনালাপে গ্রিনল্যান্ডে 'আক্রমণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন'। বুধবার জার্মানি ও পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে এই আর্কটিক দ্বীপটি নিয়ে আলোচনা করার কথা রয়েছে তার।
মঙ্গলবার ইউরোপীয় নেতারা ডেনমার্কের প্রতি সমর্থন জানিয়ে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন ও ডেনমার্কের নেতারা বিবৃতিতে বলেন, 'গ্রিনল্যান্ড তার জনগণের। গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেবল এই দুই পক্ষেরই রয়েছে।'
আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের মতোই নিজেদের আগ্রহের কথা জোর দিয়ে উল্লেখ করে ইউরোপীয় নেতারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো মিত্রদের 'সম্মিলিতভাবে' এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে তারা সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তাসহ জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিগুলো সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান।
ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের একদিন পর ট্রাম্পের একজন সিনিয়র সহযোগীর স্ত্রী কেটি মিলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন পতাকার রঙে রাঙানো গ্রিনল্যান্ডের একটি মানচিত্র পোস্ট করেন। মানচিত্রটির পাশে লেখা ছিল, 'শিগগিরই।'
এর আগের দিন সোমবার তার স্বামী স্টিফেন মিলার বলেন, 'গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়া উচিত—এটাই মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান।'
ডেনিশ পার্লামেন্টে গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিত্বকারী দুই এমপির একজন আয়া কেমনিটজ বিবিসিকে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই মন্তব্যগুলো একটি 'সুস্পষ্ট হুমকি'।
তিনি বলেন, 'আমাদের দেশ দখল করার সম্ভাবনা উড়িয়ে না দেওয়া এবং আরেকটি ন্যাটো মিত্র দেশের ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা করা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চরম অসম্মানজনক।'
তবে কেমনিটজের মতে, সরাসরি সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম। তার ভাষায়, 'আমরা বরং দেখতে পাব, তারা আমাদের ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করবে, যাতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।'
গ্রিনল্যান্ডের প্রত্যন্ত উত্তরের শহর কানাক-এর ৪২ বছর বয়সী ইনুইট শিকারি আলেকৎসিয়াক পিয়ারিক সম্ভাব্য মার্কিন মালিকানা নিয়ে উদাসীন মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
তিনি বিবিসিকে বলেন, 'এটা এক মালিকের কাছ থেকে আরেক মালিকের কাছে যাওয়া কিংবা এক দখলদার থেকে অন্য দখলদারের হাতে চলে যাওয়ার মতোই হবে। আমরা ডেনমার্কের অধীনে একটি উপনিবেশ হিসেবেই আছি। ডেনিশ সরকারের অধীনে থাকায় আমরা ইতোমধ্যেই অনেক কিছু হারিয়েছি।'
ট্রাম্পের জন্য তার 'সময় নেই' জানিয়ে তিনি আরও বলেন, মানুষ এখন 'চরম অভাবের মধ্যে' দিন কাটাচ্ছে। তার মতো শিকারিরা সমুদ্রের বরফের ওপর কুকুরের স্লেজ ব্যবহার করে এবং মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনি বলেন, 'কিন্তু সমুদ্রের বরফ গলে যাচ্ছে, ফলে শিকারিরা আর আগের মতো জীবনধারণ করতে পারছে না।'
