‘হেট স্পিচ’ রুখতে আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে ভারতের কর্ণাটক; কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু?
একটি আইন কি ভারতে ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য বা হেট স্পিচ রুখতে পারবে? ভারতের দক্ষিণী রাজ্য কর্ণাটক অন্তত সেই আশাই করছে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ায় বা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু করে—এমন ঘৃণামূলক বক্তব্য ও অপরাধ বন্ধে গত মাসে একটি বিল পাস করেছে রাজ্যটির আইনসভা।
ভারতে 'হেট স্পিচ' নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার এবং টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর উসকানিমূলক বিতর্কের কারণে এর প্রকোপ কয়েক গুণ বেড়েছে।
গত বছরের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে সংখ্যালঘুদের—বিশেষ করে মুসলিমদের—বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্য ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। জাতীয় নির্বাচনের সময় এই হার ছিল সবচেয়ে বেশি।
কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন কর্ণাটক সরকার বলছে, ঘৃণা ভাষণ অনেক সময় সরাসরি সহিংসতায় রূপ নেয়, তাই এটি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তবে সমালোচকরা সতর্ক করে বলছেন, এই আইনের অপপ্রয়োগ হতে পারে এবং এতে মানুষের নাগরিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতা খর্ব হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিলে যা আছে
'কর্ণাটক হেট স্পিচ অ্যান্ড হেট ক্রাইম (প্রিভেনশন) বিল, ২০২৫' নামের এই প্রস্তাবিত আইনটি এখন রাজ্যপালের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে। এতে ঘৃণামূলক ভাষণের তদন্ত ও বিচারের প্রক্রিয়ার বিস্তারিত রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
বিলে বলা হয়েছে—মৌখিক, লিখিত, টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনসমক্ষে প্রচারিত যেকোনো বিদ্বেষমূলক অভিব্যক্তিই 'হেট স্পিচ' হিসেবে গণ্য হবে। তবে 'হেট ক্রাইম' বা ঘৃণাজনিত অপরাধের সংজ্ঞায় এটি স্পষ্ট করা হয়নি যে, সহিংসতার ঘটনা ঘটলেই কেবল তা অপরাধ হবে কি না।
বিলটির একটি বিতর্কিত দিক হলো, এটি রাজ্য সরকারকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে কোনো কন্টেন্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেয়। বর্তমানে এই ক্ষমতা কেবল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রয়েছে।
ভারতে ঘৃণা ভাষণের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো কেন্দ্রীয় আইন নেই। তবে বিভিন্ন আইনের অধীনে নির্দিষ্ট কিছু বিধান রয়েছে, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ব্যবহার করা হয়।
এর মধ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা তৈরি করা কিংবা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। কর্ণাটকের এই নতুন উদ্যোগ কেন্দ্রীয় আইনের বাইরের এই শূন্যস্থান পূরণ করতে চায় কি না, তা নিয়ে এখন চলছে বিতর্ক।
ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় থাকা বিজেপি বর্তমানে কর্ণাটকে বিরোধী দলে রয়েছে। দলটির দাবি, ঘৃণামূলক ভাষণ রুখতে আলাদা কোনো আইনের প্রয়োজন নেই।
তবে কর্ণাটকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জি পরমেশ্বর বিধানসভায় বলেন, বর্তমান আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করতেই এই বিল আনা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে ঘৃণা ভাষণ ও এ সংক্রান্ত অপরাধকে 'অজামিনযোগ্য' করা হয়েছে এবং রাজ্য সরকারকে দেওয়া হয়েছে ব্যাপক ক্ষমতা।
এই বিল আইন হিসেবে পাস হলে ঘৃণা ভাষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে এক থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার রুপি জরিমানা গুনতে হতে পারে। একই অপরাধ বারবার করলে শাস্তির মাত্রা আরও বাড়বে।
কর্ণাটকের দেখাদেখি প্রতিবেশী রাজ্য তেলেঙ্গানাও একই ধরনের আইন আনার পরিকল্পনা করছে। তেলেঙ্গানাতেও বর্তমানে কংগ্রেস ক্ষমতায় রয়েছে।
বাকস্বাধীনতা হরণের অভিযোগ
অবশ্য বিজেপি এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করছে। তাদের অভিযোগ, এই আইন পাসের মাধ্যমে মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হতে পারে।
কর্ণাটক বিধানসভার বিরোধী দলীয় নেতা আর অশোক বলেন, 'এই আইনের মাধ্যমে রাজ্য সরকার সংবিধান প্রদত্ত মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিরোধীদলীয় নেতা ও সংবাদমাধ্যমকে জেলহাজতে পাঠানো।'
সমালোচকদের মতে, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতেও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর প্রায়ই চড়াও হওয়ার অভিযোগ ওঠে। তবে কর্ণাটকের এই নতুন বিলটি বাকস্বাধীনতার সুরক্ষাকবচ হবে নাকি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হবে, তা নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে।
কর্ণাটকের এই নতুন বিলটি নিয়ে শুধু রাজনীতিকরা নন, আইনি বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকারকর্মীরাও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক দলই এই আইনের অপব্যবহার করতে পারে। তার মতে, 'একজনের কাছে যা হেট স্পিচ, অন্যজনের কাছে তা রাজনৈতিক প্রচারণা হতে পারে। আপনি কোনো বক্তব্য অপছন্দ করলেই তা ঘৃণাত্মক বক্তব্য হয়ে যায় না।'
আইনি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান 'বিধি সেন্টার ফর লিগ্যাল পলিসি'র সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও আইনজীবী অলক প্রসন্ন কুমার বলেন, এই বিলটির পেছনে উদ্দেশ্য ভালো হতে পারে, কিন্তু এর অপব্যবহার হওয়ার ব্যাপক সুযোগ রয়ে গেছে।
প্রস্তাবিত বিলে ঘৃণা ভাষণ ও অপরাধের সংজ্ঞা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
'ন্যাশনাল ল স্কুল অব ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি'র সহকারী অধ্যাপক সিদ্ধার্থ নারায়ণ মনে করেন, এর মাধ্যমে ঘৃণা ভাষণের সংজ্ঞাকে অনেক বেশি বিস্তৃত করা হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় আইনে কেবল ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্টের কথা থাকলেও এই বিলে জাতি ও অন্যান্য পরিচয়কেও যুক্ত করা হয়েছে।
সিদ্ধার্থ নারায়ণের মতে, বিলটি 'হেট স্পিচ' ও 'হেট ক্রাইম' এর মধ্যকার পার্থক্যকে অস্পষ্ট করে ফেলেছে। তিনি বলেন, কোনো বক্তব্য যখন সহিংসতার দিকে নিয়ে যায়, তখন তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু এই বিলে কেবল কোনো কথা প্রচার করাকেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা ২০১৫ সালের ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি যুগান্তকারী রায়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন।
ওই রায়ে বলা হয়েছিল, বাকস্বাধীনতা সীমিত করে এমন যেকোনো আইন হতে হবে সুনির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট। আইন যদি অস্পষ্ট বা অতিরিক্ত বিস্তৃত হয়, তবে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। এতে মানুষ শাস্তির ভয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেবে এবং স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করা বন্ধ করে দেবে।
পুলিশের হাতে কি অতিরিক্ত ক্ষমতা যাচ্ছে?
কর্ণাটকের বিজেপি নেতা ও বেশ কয়েকজন অধিকারকর্মী এই বিলে সই না করতে রাজ্যপালের কাছে জোর আবেদন জানিয়েছেন। তারা চান, বিলটি পর্যালোচনার জন্য ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হোক।
অধিকারকর্মী ও আইনজীবী গিরিশ ভরদ্বাজ রাজ্যপালকে চিঠিতে লিখেছেন, এই বিল আদতে ঘৃণা ভাষণ ঠেকানোর চেয়ে সাধারণ নাগরিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
তার মতে, কোনো বক্তব্য এই আইনের আওতায় পড়বে কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে পুলিশ ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকারের সমালোচনা দমনের ক্ষেত্রে এই আইনের অপব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে কর্ণাটক সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে বলেন, এই আইনটি মূলত পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে সহায়তা করবে।
বর্তমানে হেট স্পিচ মামলায় অভিযোগপত্র জমা দিতে সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হয়, নতুন আইনে সেই বাধ্যবাধকতা থাকবে না। ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, এর ফলে অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, বিচার করা সম্ভব হবে। এমনকি সরকারি দলের কোনো কর্মীও যদি ঘৃণামূলক ভাষণ দেন, সরকার সেখানে হস্তক্ষেপ করে তাকে বাঁচাতে পারবে না।
সরকার স্বচ্ছতার দাবি করলেও সমালোচকরা বলছেন ভিন্ন কথা। আইনজীবী অলক প্রসন্ন কুমারের মতে, যেকোনো আইনি প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হলো পুলিশ। আদালত অনেক পরের বিষয়।
যেহেতু পুলিশ সরাসরি সরকারের অধীনে কাজ করে, তাই তারা নিরপেক্ষ বিচারবুদ্ধি ব্যবহারের চেয়ে অনেক সময় রাজনৈতিক ইশারায় কাজ করতে বাধ্য হয়। আইনের কঠোরতা এবং অস্পষ্টতার কারণে পুলিশ হয়তো স্বাধীনভাবে কাজ না করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে এটি ব্যবহার করবে।
এ কারণেই অলক প্রসন্ন মনে করেন, দিনশেষে এই বিলটি তার প্রকৃত উদ্দেশ্য হাসিলে সফল না-ও হতে পারে।
