বিনাবিচারে ৫ বছর কারাগারে, ভারতে ছাত্রনেতা উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের জামিন আবারও নামঞ্জুর
বিচার ছাড়াই পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে বন্দী ভারতের দুই ছাত্রনেতা উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের জামিন আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার ঘটনায় করা মামলায় তাদের জামিন নামঞ্জুর করা হয়। তবে একই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অন্য পাঁচ কর্মীকে জামিন দিয়েছে আদালত।
পুলিশের অভিযোগ, রাজধানীতে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ উসকে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে এই ছাত্রনেতারা জড়িত ছিলেন। ২০২০ সালের ওই দাঙ্গায় ৫৩ জন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম। বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে কয়েকমাস ধরে চলা আন্দোলনের মধ্যেই এই দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল। জাতিসংঘ ওই আইনটিকে 'মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক' বলে অভিহিত করেছিল।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন 'ইউএপিএ' প্রয়োগ করা হয়েছে, যার ফলে তাদের জামিন পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও তারা শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এবং গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন আদালতে জামিনের জন্য ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছেন।
সোমবার সকালে দুই বিচারপতির বেঞ্চ তাদের আদেশে বলেন, সাতজন আসামির জামিন আবেদন আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। লিগ্যাল ওয়েবসাইট 'বার অ্যান্ড বেঞ্চ'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বিচারকরা বলেছেন, 'অপরাধের মাত্রার দিক থেকে সবাই সমান অবস্থানে নেই।'
আদালত উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে অন্যদের চেয়ে আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের জামিন নাকচ করেন। তবে আদালত জানিয়েছেন, এই দুই আবেদনকারী এক বছর পর আবারও জামিনের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
উমর খালিদের জামিন আবেদন গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন আদালতে অন্তত পাঁচবার খারিজ হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য তাকে দুবার স্বল্প সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে শারজিল ইমামের জামিন আবেদন এর আগে অন্তত দুবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
আদালত যে পাঁচজনের জামিন মঞ্জুর করেছেন তারা হলেন—গুলফিশা ফাতিমা, মিরান হায়দার, মো. সেলিম খান, শাদাব আহমেদ এবং শিফা-উর-রহমান। ৩২ বছর বয়সী গুলফিশা ফাতিমা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক। অন্যরা মানবাধিকারকর্মী হিসেবে সিএএ-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন।
দিল্লি হাইকোর্ট জামিন না দেওয়ায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উমর খালিদ, শারজিল ইমাম ও অন্যরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। আদালতে তারা যুক্তি দেন যে, দাঙ্গায় জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ ছাড়াই তারা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে জেলে আছেন। তাদের দাবি, এই দীর্ঘ আটকাবস্থা কার্যত 'বিচার ছাড়াই শাস্তি' দেওয়ার শামিল।
৩৭ বছর বয়সী উমর খালিদ ২০১৯ সালে দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। শারজিল ইমামও গ্রেপ্তারের সময় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরাল স্কলার ছিলেন। দুজনেরই বয়স ৩৭ বছর।
কারাবন্দী এই ছাত্রনেতাদের মামলাটি ভারত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একজন সাবেক বিচারপতি, হাইকোর্টের তিনজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবং একজন সাবেক কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব দিল্লি দাঙ্গার ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। সেখানে তারা উল্লেখ করেছিলেন যে, এই কর্মীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনার মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এছাড়া, মাত্র গত সপ্তাহেই মার্কিন কংগ্রেসের একদল সদস্য ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তারা এই কর্মীদের 'বিচারহীন দীর্ঘ আটকাবস্থা' নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
