অফিসে এআই ব্যবহার করছেন? ঝামেলা এড়াতে যেসব বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি
পছন্দ হোক বা না হোক, আমাদের দৈনন্দিন কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। অনেক কর্মীর মতো আপনিও হয়তো আপনার দাপ্তরিক কাজে কিংবা অ্যাসাইনমেন্টে এআই ব্যবহার শুরু করেছেন।
তা নাহয় ঠিকাছে, তবে বিপত্তিটা বাধে তখনই, যখন আপনি জানেন না আপনার অফিসের কাজে এটি ব্যবহারের সীমা কতটুকু। কোন কাজটি এআই দিয়ে করা যাবে আর কোনটি করা যাবে না, কিংবা আপনার প্রতিষ্ঠান কোন টুলগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে—এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে আপনি বিপদে পড়তে পারেন।
প্রতিষ্ঠান থেকে যদি স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না-ও থাকে, তবুও কর্মক্ষেত্রে নিজেকে নিরাপদ রাখতে এবং কাজের মান বজায় রাখতে কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি।
জেনারেটিভ এআই দারুণ সব কাজ করে আপনাকে মুগ্ধ করতে পারে। যেমন, বিশাল তথ্যভাণ্ডার থেকে প্রয়োজনীয় উপাত্ত খুঁজে বের করা, নকশার ভুল ধরা বা এমন সব বিষয়ের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা যা হয়তো আমাদের সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না।
একই সঙ্গে এআই এখনো পুরোপুরি নিখুঁত নয়।। আইবিএম-এর মতে, এআই মাঝেমধ্যে এমন সব তথ্য বা 'প্যাটার্ন' তৈরি করে যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। একে বলা হয় 'হ্যালুসিনেশন'। এটি আপনাকে পুরোপুরি ভুল বা আজেবাজে তথ্যও সরবরাহ করতে পারে।
এআই ভুল তথ্য দিলে এর নির্মাতারা হয়তো মাফ পেয়ে যেতে পারেন, কিন্তু অফিসের কাজে ভুল করলে দায় আপনার ওপরই বর্তাবে। আইন বিশেষজ্ঞ ডেভ ওয়ালটনের মতে, 'কাজের ক্ষেত্রে কখনোই অন্ধভাবে এআইয়ের ওপর নির্ভর করা যাবে না।' তিনি ফিশার ফিলিপস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের এআই ও ডেটা এনালিটিক্স প্র্যাকটিস গ্রুপের সহ-প্রধান।
এআই-কে কেবল প্রাথমিক সহায়তাকারী হিসেবে দেখুন। লিটলার মেন্ডেলসন ল ফার্মের এআই বিশেষজ্ঞ নিলয় রায় বলেন, 'শূন্য থেকে মোটামুটি মানের একটি অবস্থানে পৌঁছাতে (একটি কাজের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করতে) এআই বর্তমান বিশ্বের সেরা মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু 'মোটামুটি' ভালো কাজ কখনোই পেশাদারত্বের মানদণ্ড হতে পারে না।'
এআই থেকে আপনি যা-ই গ্রহণ করুন না কেন, তা নিজের প্রকল্পে ব্যবহারের আগে অবশ্যই যাচাই করে নিন। আর যখনই কোনো কাজে এআই ব্যবহার করবেন, সে বিষয়ে আপনার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কারভাবে জানান। স্বচ্ছতা বজায় রাখলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা এড়ানো সম্ভব।
বর্তমানে কতটি প্রতিষ্ঠানে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা আছে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে এ ধরনের নীতিমালার চল যে বাড়ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মজার বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানগুলো নীতিমালা তৈরিতে যতটা সময় নিচ্ছে, কর্মীরা তার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুতগতিতে এআই ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। আমেরিকান ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬৫ শতাংশ পেশাদার কর্মী নিজ উদ্যোগে এআই ব্যবহার করছেন, যদিও তাদের প্রতিষ্ঠানে এ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এতে উদ্ভাবনের সুযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে পেশাগত ঝুঁকিও।
লিটলার-এর আরেকটি জরিপ বলছে, মাত্র ৩৮ শতাংশ কোম্পানি এআই ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করেছে। বাকিদের কেউ কেউ শুধু নির্দেশিকা দিয়েছে, আর কেউ পুরোনো নিয়মেই এটি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তাই অন্য কিছু করার আগে আপনার প্রতিষ্ঠানে এআই সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা বা নির্দেশিকা আছে কি না, তা যাচাই করে নিন।
একটি ভালো নীতিমালায় এআই ব্যবহারের মূলনীতিগুলো পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকা উচিত। সেখানে কী করা যাবে আর কী যাবে না, কোন টুলগুলো ব্যবহারের অনুমতি আছে এবং কোন শর্তে তা ব্যবহার করা যাবে—সেটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি এআইয়ের অপব্যবহার করলে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে, সেটিও জানানো উচিত।
নিলয় রায়ের মতে, কিছু প্রতিষ্ঠান (যেমন প্রতিরক্ষা খাতের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান) এআই ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে পারে। আবার ব্যাংক বা আর্থিক খাতের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে চরম সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয় অথবা এআই ব্যবহারে অনাগ্রহ দেখাতে পারে।
ডেভ ওয়ালটন মনে করেন, অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব কাজের জন্য বিশেষায়িত এআই টুল তৈরি করে নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে এমন থার্ড-পার্টি এআই টুল ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ বা নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে।
আপনার প্রতিষ্ঠানে যদি এআই ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না-ও থাকে, তবুও কাজ করার ক্ষেত্রে নিজের কাণ্ডজ্ঞান ব্যবহার করা জরুরি। নিলয় রায়ের মতে, এআই নিয়ে আলাদা নিয়ম না থাকলেও প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য প্রচলিত নিয়মগুলো মেনে চলা উচিত।
বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানের গোপনীয় তথ্য সুরক্ষা, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা, মেধাস্বত্ব এবং সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত যেসব নীতিমালা রয়েছে, সেগুলো এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
ডেভ ওয়ালটন একটি সাধারণ নিয়মের কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, আপনি যদি চ্যাটজিপিটির মতো তৃতীয় পক্ষের এমন কোনো এআই টুল ব্যবহার করেন যা সাধারণ মানুষও ব্যবহার করছে, তবে সেখানে কখনোই দাপ্তরিক গোপন তথ্য বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করবেন না।
তিনি আরও পরামর্শ দিয়েছেন, আপনার দেওয়া তথ্য দিয়ে এআই যাতে নিজেকে আরও প্রশিক্ষিতকরতে না পারে এবং আপনার দেওয়া তথ্য যাতে ওই টুলটি জমা রাখতে না পারে, সেই অপশনগুলো কনফিগার বা বন্ধ করে দিন।
নিলয় রায় জনসমক্ষে থাকা বা ফ্রি এআই টুলগুলোর নিরাপত্তার সঙ্গে পাবলিক পার্কিংয়ের তুলনা করেছেন। নিজের বাড়ির গ্যারেজে গাড়ি রাখার চেয়ে খোলা জায়গায় গাড়ি রাখলে সেটি চুরি হওয়ার ঝুঁকি যেমন বেশি থাকে, পাবলিক এআই টুলের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমনই। তিনি বলেন, 'এ ক্ষেত্রে তথ্য চুরির ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে এবং আপনার তথ্যের নাগাল কে পাচ্ছে, তা জানা যায় না।'
সার্বিকভাবে তিনি মনে করেন, এআই আপনার কাজ সহজ করার জন্য হয়তো নতুন অনেক মাধ্যম তৈরি করছে, কিন্তু একজন কর্মী হিসেবে আপনার দায়বদ্ধতায় কোনো পরিবর্তন আনেনি। দিনশেষে একজন সচেতন ও নৈতিক কর্মী হিসেবে আপনার যা করা উচিত, এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সেটি প্রযোজ্য।
