সোশ্যাল মিডিয়ায় নিষিদ্ধ অস্ট্রেলিয়ার কিশোররা; সপ্তাহ না ঘুরতেই ফাঁকি দিয়ে ফিরল অনেকে
অস্ট্রেলিয়ায় গত বুধবার থেকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইনটি কার্যকর হওয়ার পর ১৪ বছর বয়সী চিয়ারলিডার লুসি ব্রুকস স্ন্যাপচ্যাটে তার কিছু বন্ধুকে হারিয়ে ফেলেছিল।কিন্তু মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তারা আবার ফিরে এসেছে।
অনেকে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলেছে। কেউ কেউ আবার বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তিকে ফাঁকি দিতে বাবা-মা বা বড় বন্ধুদের মুখের ছবি ব্যবহার করেছে। মজার ব্যাপার হলো, বড়রাও তাদের সাহায্য করতে রাজি ছিল।
অস্ট্রেলিয়া যখন এই কঠোর নিয়ম চালু করে, তখন সমালোচকরা ভেবেছিলেন কিশোর-কিশোরীরা হয়তো অন্য কোনো অ্যাপে চলে যাবে। নিষিদ্ধ ১০টি সাইটের মধ্যে ছিল তাদের প্রিয় স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম।
কিন্তু তারা যে এত সহজে একই প্ল্যাটফর্মে ফিরে আসবে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি। যুক্তরাজ্যের সরকার যখন গত জুলাইয়ে অনলাইন সেফটি অ্যাক্ট বা নিরাপত্তা আইন করেছিল, সেখানকার কিশোররা ঠিক এই একই কায়দা ব্যবহার করেছিল।
লুসি ইনস্টাগ্রামে ঢুকতে পারছে না, কিন্তু স্ন্যাপচ্যাট ও টিকটকে সে এখনো আছে। সে বলে, 'বেশিরভাগ সময় বাবা-মায়েরাও জানে যে তাদের বাচ্চারা কী করছে। আবার অনেকে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ৪০ বছরের মানুষের ছবি বানিয়ে বয়স যাচাই পার করে ফেলছে।'
'ফোন নম্বর নেওয়া খুব বিরক্তিকর'
আইনটি চালু হওয়া উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ তার সিডনির বাড়িতে বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করেন। সেখানে এমন সব বাবা-মা উপস্থিত ছিলেন, যাদের সন্তানেরা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে।
বিশ্বের এই প্রথম এমন আইনের সম্মানে সিডনি হারবার ব্রিজে জ্বলে ওঠে সবুজ ও সোনালি আলো। সেখানে ভেসে ওঠে স্লোগান— 'লেট দেম বি কিডস' বা 'ওদের শিশু হতে দাও।'
অথচ সেই ব্রিজের নিচেই এক পার্কে ১৫ বছর বয়সী চার কিশোর সিএনএন-এর সঙ্গে কথা বলে। তাদের কারও অ্যাকাউন্টই বন্ধ হয়নি।
একজন বলল, 'অ্যাকাউন্ট খোলার সময় আমি জন্মসাল ২০০০ দিয়েছিলাম। তাই আমার কোনো সমস্যা হয়নি।'
আরেকজন বলল, 'টিকটক গেলে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু আমি স্ন্যাপচ্যাট হারাতে চাই না।' তার মতে, বন্ধুদের মেসেজ দেওয়ার জন্য স্ন্যাপচ্যাটই সেরা।
তাকে যখন হোয়াটসঅ্যাপ বা আইমেসেজের কথা বলা হলো, সে বিরক্ত হয়ে বলল, 'কারও ফোন নম্বর নেওয়া খুব বিরক্তিকর কাজ।'
আরেক কিশোর জানাল, সে সব খবর পায় ইনস্টাগ্রাম থেকে। খবরের কাগজ পড়ার কথা উঠতেই তারা হাসাহাসি শুরু করে দিল।
অনলাইন নিউজ চ্যানেল 'সিক্স নিউজ'-এর প্রতিষ্ঠাতা ১৮ বছর বয়সী লিও পাগলিসি এই নিষেধাজ্ঞার বিরোধী।
লিও সিএনএন-কে বলেন, 'আমি জানি এই আইন তরুণদের সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢোকা থামাতে পারছে না। আমার ভাইয়ের বয়স ১৬-এর নিচে। সে দিব্যি সোশ্যাল মিডিয়ায় আছে। সে তো কোনো কারচুপিও করেনি। বোঝাই যাচ্ছে আইনটি কাজ করছে না।'
লিও ১১ বছর বয়সে তার নিউজ চ্যানেল শুরু করেছিলেন। এখন তার দলে ৯ জন স্কুলপড়ুয়া সাংবাদিক কাজ করে। তিনি বলেন, তার শুরুতে যদি এই নিষেধাজ্ঞা থাকত, তবে '৬ নিউজ' আজকের অবস্থানে আসত না।
তার মতে, 'আমাদের মনে রাখতে হবে, এখানে ৫ বছরের শিশুদের কথা হচ্ছে না। আমরা ১৫ বছরের কিশোরদের কথা বলছি, যারা পার্ট-টাইম চাকরি করতে পারে। তাদের ইউটিউব চালাতে দেওয়া উচিত।'
উদ্যোক্তা লুকাস লেনের বয়স ১৬। তাই সে নিজের অ্যাকাউন্ট নিয়ে চিন্তিত নয়। কিন্তু তার চেয়ে ছোটদের জন্য তার খারাপ লাগছে। ১৩ বছর বয়সে সে 'গ্লসি বয়েজ' নামে নিজের ব্যবসা শুরু করে। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক আর টিকটকের মাধ্যমেই তার ব্যবসা বড় হয়েছে।
লুকাস বলে, 'এই নিষেধাজ্ঞা আমার ব্যবসায় প্রভাব ফেলবে। আমি চাই মানুষ নিজের মতো করে গড়ে উঠুক। কিন্তু সরকার সেটা হতে দিচ্ছে না।' তার মতে, নিষিদ্ধ না করে শিক্ষা ও সুরক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল।
রেডিটসহ বেশ কিছু প্ল্যাটফর্ম অস্ট্রেলিয়ার হাইকোর্টে এই আইনের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।
'ভয় আর উদ্বেগ'
টিকটকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নিষিদ্ধ হলে কিশোররা কী করবে? কেউ কেউ মজা করে বলেছিল তারা অপরাধ করবে! অন্যরা বলেছিল তারা 'কভারস্টার' বা 'ইওপ'-এর মতো কম পরিচিত অ্যাপে চলে যাবে।
শার নামের ১৫ বছর বয়সী এক উঠতি গায়িকা লেমন-৮ নামের অ্যাপে অ্যাকাউন্ট খুলেছিল। সে ভেবেছিল তার ৪০০০ টিকটক ফলোয়ার একরাতে উধাও হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি।
শার বলে, 'আমার কোনো অ্যাকাউন্টই বন্ধ হয়নি। এমনকি যেগুলোতে আমি আসল বয়স দিয়েছি, সেগুলোও চলছে। আমার বয়সী কারও অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়েছে বলে শুনিনি। সরকার এত হুলুস্থুল করল, অথচ কাজের কাজ কিছুই হলো না!'
তবে লুসি আর তার বন্ধুদের মনে ভয় কাজ করছে। তারা জানে না কতদিন তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকতে পারবে। তাদের অনেক ছবি আর স্মৃতি সেখানে জমে আছে। স্টোরেজ না থাকায় সেগুলো ডাউনলোডও করতে পারছে না। তাদের ভয়, ব্যক্তিগত ছবিগুলো হয়তো ডিজিটাল কোনো সিন্দুকে বছরের পর বছর আটকে থাকবে।
লুসি চিয়ারলিডিংয়ের জন্য ইনস্টাগ্রাম রাখতে চায়। সে সেখান থেকে নতুন নতুন কৌশল শেখে।
লুসির মতো অনেক শিশুই মনে করে সোশ্যাল মিডিয়ার বাজে দিকগুলো ঠিক করা দরকার। কিন্তু পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা সমাধান নয়।
লুসি বলে, 'আমি আসলে চাই আইনটা কাজ করুক। কারণ বাচ্চাদের এত বেশি সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকা উচিত না।'
পরক্ষণেই সে যোগ করে, 'কিন্তু আমার মনে হয় না এটা কাজ করবে।' তার মতে, এক বা দুই ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেওয়াটা অনেক বেশি কার্যকর হতো।
