নারীদের চুল প্রতিস্থাপন: বাড়ছে জনপ্রিয়তা, সঙ্গে বাড়ছে সাফল্যের হার নিয়ে বিতর্কও
শুরুটা হয়েছিল ধীরে ধীরে। গোসলখানায় পানির সঙ্গে ভেসে যাওয়া একমুঠো চুল দিয়ে। তারপর একদিন ব্রিটিশ বডি বিল্ডার ট্রেসি কিস আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলেন, ভেজা চুলের ফাঁক দিয়ে তার মাথার ত্বক দেখা যাচ্ছে। উত্তর লন্ডনের বাড়িতে বসে তিনি বলছিলেন, 'আমার চুল সবসময় বেশ ঘন ছিল। এতটাই ঘন ছিল যে মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগত।' কিন্তু ২৫ বছর বয়সে দুই সন্তানের মা হওয়ার পর তার সেই 'বিশাল চুলের সম্ভার' প্রায় হারিয়ে যেতে বসল। এখন ৩৮ বছর বয়সেও সেই স্মৃতি তাকে কষ্ট দেয়।
সকালে চুলের স্টাইল করা তার কাছে সাজগোজের চেয়ে বরং টাক ঢাকার উপায় হয়ে দাঁড়াল। কপালের দুই পাশের ফাঁকা জায়গা ঢাকতে ট্রেসি চুল শক্ত করে বেঁধে রাখতেন। কখনো এক্সটেনশন, কখনো পরচুলা বা হ্যাট ব্যবহার করতেন। তিনি বলেন, 'ছবিতে নিজের দিকে তাকিয়ে ভাবতাম, 'হায় খোদা! দিন দিন অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে।'' রক্ত পরীক্ষায় দেখা গেল তার শরীরে আয়রনের অভাব। এরপর তিনি একটার পর একটা সাপ্লিমেন্ট খেলেন, বিশেষ শ্যাম্পু ব্যবহার করলেন। এমনকি মাথার ত্বকে পিআরপি ইনজেকশনও নিলেন। কিন্তু কিছুতেই কাজ হলো না। ট্রেসি বলেন, 'একজন নারী হিসেবে চুল আপনার সৌন্দর্যের মুকুট। সেটা হারালে মনে হয় নিজের পরিচয়টাই হারিয়ে গেল।'
হার্ভার্ডের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি তিনজন নারীর অন্তত একজন জীবনে কোনো না কোনো সময় চুল পড়ার সমস্যায় ভোগেন। এর পেছনে অনেক কারণ থাকলেও হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও বংশগত কারণই প্রধান। একে বলা হয় 'অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া' বা মেয়েদের টাক পড়া সমস্যা। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০ বছর বয়সের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ শতাংশ নারী এই সমস্যায় আক্রান্ত হন।
সিএনএন এমন তিনজন নারীর সঙ্গে কথা বলেছে যারা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এর সমাধান চেয়েছিলেন। হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট বা চুল প্রতিস্থাপন মূলত পুরুষরাই বেশি করেন। তবে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অফ হেয়ার রেস্টোরেশন সার্জারি (আইএসএইচআরএস) বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নারীদের মধ্যে এই হার ১৬ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
২০১১ সালে ট্রেসি প্রথম চুল প্রতিস্থাপনের কথা জানতে পারেন। তখন তার প্রেমিকের চুল পড়ার সমস্যার জন্য তিনি সমাধান খুঁজছিলেন। নিজের জন্যও তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় শুধু নারী হওয়ার কারণে। তিনি বলেন, 'সার্জনরা আমাকে বলেছিলেন, হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট শুধু পুরুষদের জন্য।'
দীর্ঘ ১১ বছর গবেষণা, প্রায় ৩,৪০০ ডলার খরচ এবং অনেক অনুরোধের পর অবশেষে একজন ডাক্তার রাজি হন। ২০২২ সালে তিনি তুরস্কে যান এবং 'ফলিকুলার ইউনিট এক্সট্রাকশন' (এফইউই) পদ্ধতিতে তার কপালে ও মাথার সামনের দিকে ২,৫০০ চুলের গোড়া বা ফলিকল বসান। এই পদ্ধতিতে সাধারণত মাথার অন্য কোনো অংশ থেকে চুলের গুচ্ছ নিয়ে ফাঁকা জায়গায় বসানো হয়। ট্রেসি জানান, অস্ত্রোপচারের পরপরই তিনি সুস্থ বোধ করছিলেন এবং মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন।
প্লাস্টিক সার্জন ও চুল প্রতিস্থাপন বিশেষজ্ঞ ডা. গ্রেগ উইলিয়ামস জানান, বিভিন্ন কারণে নারীরা এই চিকিৎসা নিতে আসেন। কেউ শক্ত করে চুল বাঁধার কারণে চুল হারিয়েছেন, আবার কেউ বা ট্রান্স নারী যারা নিজেদের হেয়ারলাইন বা চুলের সীমানা নিচে নামাতে চান।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে সাধারণত নারীদের চুল পড়ার প্রধান কারণ হলো জিনগত সমস্যা বা জেনেটিক্স। তবে ডা. উইলিয়ামস বলেন, এদের জন্য চুল প্রতিস্থাপন সবসময় সেরা সমাধান নয়। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, 'যাদের জিনগত কারণে চুল পড়ে, তাদের ক্ষেত্রে ট্রান্সপ্লান্ট আসলে সাময়িক সমাধান মাত্র। এটি স্থায়ী কোনো সমাধান নয়।' হরমোন, গর্ভাবস্থা, সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর পরের জটিলতা, স্ট্রেস বা পুষ্টি—পুরুষদের চেয়ে নারীদের চুলে এসব বিষয় অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। তিনি আরও বলেন, 'আমরা আসলে মেয়েদের চুল পড়ার সমস্যাটা পুরোপুরি বুঝতেই পারি না।'
তবুও নারীরা দলে দলে এই চিকিৎসার দিকে ঝুঁকছেন। জার্মানির ৩২ বছর বয়সী আইচা বোজোক তার মায়ের জন্মভূমি তুরস্কে গিয়ে এফইউই পদ্ধতিতে চুল প্রতিস্থাপন করান। ১৫ বছর বয়সে স্কুলেই তার চুল পাতলা হতে শুরু করে। তিনি বলেন, 'সকালে চুল আঁচড়াতে গিয়ে দিনটাই খারাপ হয়ে যেত। আমি ব্যান্ডানা দিয়ে মাথা ঢেকে রাখতাম।' বয়ঃসন্ধিকালে চুল হারানো তার জন্য ছিল এক দুঃস্বপ্ন।
কৈশোরেই তার অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া ধরা পড়ে। কিন্তু ২০ বছর বয়সের দিকে জীবনের এক কঠিন অভিজ্ঞতার পর তার চুল পড়া আরও বেড়ে যায়। তিনি বলেন, 'মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে আমি প্রায় সব চুল হারিয়ে ফেলি।' উপায় না দেখে তিনি স্টুডেন্ট লোন নিয়ে পিআরপি ইনজেকশন ও পুষ্টি পরিকল্পনা শুরু করেন। এতে কিছুটা কাজ হয় এবং তিনি ৬০ শতাংশ চুল ফিরে পান। কিন্তু প্রতিদিন চুলে ফাইবার পাউডার ব্যবহারের ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে ২০২৪ সালে তিনি ট্রান্সপ্লান্টের সিদ্ধান্ত নেন।
বোজোকের সিদ্ধান্তটি ছিল হুট করে নেওয়া। তিনি খুব একটা খোঁজখবর নেননি। হোয়াটসঅ্যাপে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেই রাজি হয়ে যান। তিনি তার বংশগত চুল পড়ার কথা ডাক্তারকে জানিয়েছিলেন। প্রায় ২,৯০০ ডলারে ৩,৫০০ ফলিকল বসানোর কথা হলেও, তার চুল পাতলা হওয়ায় ডাক্তাররা ২,৮০০টির বেশি নিতে পারেননি। অস্ত্রোপচারের পর আট দিন তার ব্যথা ছিল। এক বছর পর তিনি ফলাফলে খুশি। ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে তিনি তার অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন। তবে তিনি জানেন, এই নতুন চুল হয়তো চিরকাল থাকবে না। তিনি বলেন, 'অনেকে আমাকে বলেছেন, ২ থেকে ১০ বছরের মধ্যে তাদের প্রতিস্থাপন করা চুল পড়ে গেছে। আমি ভাবছি, যতদিন আছে ততদিন উপভোগ করি।'
জিনগত কারণে চুল হারাতে থাকা নারীদের জন্য সমাধান খোঁজা অনেকটা চলমান লক্ষ্যের পেছনে ছোটার মতো। গত দশকে চুল প্রতিস্থাপন সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে। ইউরোপে ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এই হার ২৪০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু ডা. উইলিয়ামস চিন্তিত। তিনি মনে করেন, অনেক নতুন ক্লিনিক এই সুযোগে নারীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে। তিনি বলেন, 'চুল হারানো রোগীরা মানসিকভাবে খুব দুর্বল থাকেন। তাদের ঠকানো খুব সহজ। এটা সত্যিই হৃদয়বিদারক।'
ইংল্যান্ডের নর্দাম্পটনের ৪০ বছর বয়সী স্যাম ইভান্স মনে করেন, ২০২৪ সালে তার ভুল চিকিৎসা হয়েছে। এক দশক আগে তার চুল পাতলা হতে শুরু করে, কিন্তু লজ্জায় তিনি তা লুকিয়ে রাখতেন। তিনি বলেন, 'তৈরি হতে গিয়ে আমি প্রায় প্রতিদিন কাঁদতাম।'
২০১৯ সালে এক বিশেষজ্ঞ তাকে জানান, তিনি হয়তো ফিমেল প্যাটার্ন হেয়ার লসে ভুগছেন। ২০২২ সালে পিআরপি ইনজেকশন কাজ না করায় তিনি লন্ডনের এক ক্লিনিকে যান। তিনি বলেন, 'এখন মনে হচ্ছে, আমার আরও খোঁজখবর নেওয়া উচিত ছিল।' তার সার্জনের জানা ছিল যে ইভান্সের অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া এবং পিসিওএস (PCOS) আছে—যা চুল পড়ার অন্যতম কারণ।
তিনি প্রায় ৮,৫০০ ডলার খরচ করেন এবং ১০ ঘণ্টার এক যন্ত্রণাদায়ক অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যান। অ্যানেস্থেশিয়া ঠিকমতো কাজ না করায় তার খুব কষ্ট হয়েছিল। তিনি বলেন, 'আমি পুরো সময় কেঁদেছি।'
অস্ত্রোপচারের পর দুই সপ্তাহ তিনি ঘর থেকে বের হননি। তিনি বলেন, 'আয়নায় তাকালেই কষ্ট লাগত।' অনেক নিয়ম মানতে হতো বলে তিনি ঠিকমতো ঘুমাতেও পারতেন না।
ডাক্তার তাকে বলেছিলেন, তার চুল খুব পাতলা হওয়ায় হয়তো আরও দুই-তিনবার ট্রান্সপ্লান্ট করতে হবে। কিন্তু এখন ইভান্স বুঝতে পারছেন, তার মাথায় আসলে স্বাস্থ্যকর চুল ছিলই না যা তুলে অন্য জায়গায় বসানো যেত।
অস্ত্রোপচারের ধকল সামলাতে গিয়ে তার চুল আরও বেশি পড়তে শুরু করে। তিনি বলেন, 'আমার অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে।' ডাক্তার তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিনি পনিটেইল বা ঝুঁটি করতে পারবেন। কিন্তু এখন তিনি প্রতিদিনই পরচুলা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, 'শুনতে নাটকীয় মনে হতে পারে, কিন্তু পরচুলাই আমার জীবন বদলে দিয়েছে।'
ডা. উইলিয়ামস মনে করেন, সঠিক রোগ নির্ণয় না করেই অনেক নারীকে অস্ত্রোপচারের জন্য পাঠানো হচ্ছে। তিনি বলেন, 'কিছু অসাধু সার্জন টাকার লোভে রোগীদের ফেরাতে চান না। অথচ ওষুধের মাধ্যমে আগে চুল পড়া কমানো উচিত ছিল।'
তিনি মনে করেন, এই খাতে আরও কড়াকড়ি থাকা দরকার। কারণ এটি চিকিৎসা এবং ব্যবসার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। তিনি বলেন, 'বেশিরভাগ কাজ হয় প্রাইভেট ক্লিনিকে, বন্ধ দরজার পেছনে। কেউ জানে না সেখানে কী হচ্ছে।'
ট্রেসি কিস অবশ্য তার নতুন চুল পেয়ে খুব খুশি। তিনি বলেন, 'হারানোর আগে আমরা বুঝতেই পারি না আমাদের কী ছিল। সেটা ফিরে পাওয়ার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।' কিন্তু সবার ভাগ্য ট্রেসির মতো হয় না। বোজোক জানতে পারেন, তার ভিডিও অনুমতি ছাড়াই ভুয়া সব পণের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, 'আমি শকড ছিলাম। মানুষ হতাশ হয়ে এই পণ্যগুলো কেনে, কারণ তারা আসলে আশা কিনছে।'
ডা. উইলিয়ামস পরামর্শ দেন, ট্রান্সপ্লান্টের আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং যে ডাক্তার অস্ত্রোপচার করবেন তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা উচিত। তিনি বলেন, 'জিজ্ঞেস করুন, কে আমার ত্বকে ছুরি চালাবে?'
বোজোক, কিস আর ইভান্স—তিনজনেই তাদের অভিজ্ঞতা অনলাইনে শেয়ার করেছেন। সফল হোক বা না হোক, তারা একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন। হাজার হাজার মানুষ কিসের ইউটিউব ভিডিও দেখেন। বোজোকের ইনস্টাগ্রামে নারীরা পরামর্শের জন্য ভিড় করেন। এমনকি পুরুষরাও তার কাছে জানতে চান কীভাবে তারা তাদের সঙ্গীর পাশে দাঁড়াতে পারেন। ইভান্সের কাছে এই অনলাইন কমিউনিটি এক বড় শক্তির উৎস। তিনি বলেন, 'এখানেই আমি বুঝতে পেরেছি যে নারীদের অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়া আসলে খুব সাধারণ একটা সমস্যা। আমরা একে অপরের গল্প শুনি, একে অপরের পাশে থাকি।'
