এক ডলারেই সেরে নিচ্ছেন দুই বেলার খাবার: চীনের তরুণেরা কেন খরচ করছেন না?
চীনের অর্থনীতি এখন এক নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। দেশটির সরকার অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে মরিয়া হলেও সাড়া মিলছে না তরুণ প্রজন্মের কাছ থেকে। আকাশচুম্বী বেকারত্ব, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং আবাসন সংকট তাদের বাধ্য করছে মিতব্যয়ী হতে।
খরচ কমিয়ে সঞ্চয়ের দিকে ঝোঁকার এই প্রবণতা চীনের দীর্ঘদিনের রপ্তানি ও বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেলের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
চাকরির এই অনিশ্চয়তা অনেক তরুণকে মিতব্যয়ী জীবনে আগ্রহী করছে। দেশটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এখন কম খরচে জীবনযাপনের পরামর্শে ভরা।
'ঝাং স্মল গ্রেইন অব রাইস' নামে পরিচিত এক ইনফ্লুয়েন্সার তার ভিডিওতে দেখান, কীভাবে তিনি ব্যয়বহুল স্কিন-ক্লিনজিং পণ্যের বদলে একটি সাধারণ সাবান দিয়েই সব ধরনের ব্যক্তিগত পরিচর্যা সারেন। 'আমার কাজ মূলত মিনিমালিস্ট জীবনধারাকে ঘিরে,' বলেন তিনি।
'লিটল গ্রাস ফ্লোটিং ইন বেইজিং' নামে পরিচিত ২৯ বছর বয়সী এক তরুণ মূলত সহজ রান্নার ভিডিও বানান। তার দাবি, তিনি এক ডলারের একটু বেশি খরচে দুই বেলা খাবার সারতে পারেন।
অনুসারীদের তিনি বলেন, 'আমি গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ। আমার কোনও উচ্চশিক্ষা নেই, প্রভাবশালী কোনও যোগাযোগও নেই। তাই তুলনামুূলক সচ্ছল জীবনের জন্য আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়।' তিনি জানান, মিতব্যয়ী জীবনযাপনের সুবাদে ছয় বছরে তিনি ১ লাখ ৮০ হাজার ডলারের বেশি সঞ্চয় করেছেন।
চীনে কোভিড-পরবর্তী 'প্রতিশোধমূলক কেনাকাটার' (Revenge Spending) রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় উল্টো ধারা—'প্রতিশোধমূলক সঞ্চয়' (Revenge Savings)। চাকরির বাজারের অনিশ্চয়তা ও বেকারত্ব দেশটির তরুণদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ায় তারা এখন একজোট হচ্ছেন খরচ কমানোর জন্য, নিজেদের আর্থিক অবস্থার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার লক্ষ্যে।
এই নতুন প্রবণতার ছাপ পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। তরুণ-তরুণীরা নিজেদের মধ্যে কম খরচে জীবনযাপনের নানা কৌশল বিনিময় করছেন। এর মধ্যে রয়েছে অল্প মুল্যেই বাড়িতে রান্না করা থেকে শুরু করে বয়স্কদের জন্য তৈরি কমিউনিটি ক্যান্টিনে খাওয়ার মতো বিষয়ও।
চীনে এখন 'সেভিংস পার্টনার' খোঁজারও এক নতুন চল শুরু হয়েছে। এই সঙ্গীরা একে অপরকে খরচের লাগাম টেনে ধরতে সাহায্য করেন। হঠাৎ কেনাকাটার ইচ্ছা দমন করতে বা বাজেট ঠিক রাখতে তারা একে অপরকে উৎসাহ জোগান। ফুজিয়ান প্রদেশের ক্যাথি ঝু নামের এক তরুণী তার 'সঞ্চয় সঙ্গীর' সহায়তায় এক মাসেই নিজের খরচ প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনতে পেরেছেন।
যদিও সমস্যার মূল অনেক গভীরে। চীনে তরুণদের বেকারত্বের হার দীর্ঘদিন ধরেই প্রায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি। যাদের চাকরি আছে, তারাও বেতন কমানো বা চাকরি হারানোর ভয়ে শঙ্কিত।
বর্তমান চীনের তরুণ প্রজন্ম ১৯৯০ ও ২০০০ দশকের তুলনায় অনেক বেশি হতাশাবাদী।
ফলে মার্কিন তরুণদের মতো ক্রেডিট কার্ডের ঋণে জর্জরিত হওয়ার বদলে চীনের তরুণেরা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়েই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। দেশটির সরকার বছরের পর বছর ধরে অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় বাড়ানোর কথা বললেও তা এখনো মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ৩৯ শতাংশ, যেখানে উন্নত দেশগুলোতে এই হার প্রায় ৬০ শতাংশ।
বেইজিংয়ের এক তরুণী বলেন, 'এখন আমার কাছে আয় করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আয় বাড়াতে হবে, খরচও কমাতে হবে।' সম্প্রতি চাকরি বদলালেও বেতন কমেছে তার। একরাশ হতাশা নিয়ে তিনি বলেন, 'এই চাকরি কত দিন থাকবে, তা-ও জানি না। নতুন চাকরি পাওয়াও এখন কঠিন।'
চীনের এই উচ্চ বেকারত্বের সুযোগ নিচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান। কর্মীদের বেতন কমিয়ে দেওয়া সহজ, কারণ চাকরিপ্রার্থীদের সামনে কম বেতনে কাজ মেনে নেওয়া ছাড়া বিকল্প কম।
বিশের কোঠার আরেক তরুণ জানান, নিম্নস্তরের কাজ পাওয়া গেলেও নিজের দক্ষতার সঙ্গে মানানসই চাকরি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তার কথায়, 'আমার অনেক বন্ধু এখনো বেকার। তারা বাড়িতেই থাকে এবং চাকরি খুজঁছে।'
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়না সেন্টারের অর্থনীতিবিদ জর্জ ম্যাগনাস এই পরিস্থিতিকে উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারের মধ্যে এক ধরনের 'অসামঞ্জস্য' বলে মনে করছেন। তিনি জানান, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক, এমনকি স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরাও এখন ডেলিভারি চালকের মতো কাজে যোগ দিচ্ছেন।
চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিকসের মতো উচ্চ প্রযুক্তির খাতে মনোযোগ দেওয়ার নীতিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। কারণ এসব খাতে শ্রমনির্ভর কর্মসংস্থান তৈরি হয় তুলনামূলকভাবে কম।
সুইডিশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষক হেলেনা লোফগ্রেন মনে করেন, চীনের অর্থনীতি এখনো রপ্তানি ও বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে এমন মডেল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তার মতে, অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় না বাড়ালে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে। কোনো কারণে রপ্তানি আয় কমে গেলে বিশাল এই জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার ওপর ভর করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
এটি মূলত অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্যের বিষয়। যেমন, যদি চীন হঠাৎ উল্লেখযোগ্য রপ্তানি আয়ে ধাক্কা খায়, তাহলে কি দেশটির হাতে পর্যাপ্ত উপায় আছে বিশাল অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যার ক্রয়সক্ষমতা বাড়ানোর?
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যহ্রাসের ঝুঁকি, যেখানে সম্ভাব্য ক্রেতারা অনেকেই পণ্যের দাম আরও কমার অপেক্ষায় থাকেন, সেই আশায় কেনাকাটা পিছিয়ে দেন, যা অর্থনীতিকে আরও স্থবির করে তোলে।
