ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথম তিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বিপুল জয়
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদকালে অনুষ্ঠিত প্রথম বড় নির্বাচনী পরীক্ষায় বিপুল সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। ভার্জিনিয়া, নিউ জার্সি, নিউইয়র্ক সিটিতে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি জয় দলটিকে আসন্ন ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বড় মনোবল দিয়েছে।
নিউ ইয়র্ক সিটিতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানি মেয়র নির্বাচনে জয়ী হয়ে শহরটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম ও প্রথম দক্ষিণ এশীয় হিসেবে এই পদে নির্বাচিত হচ্ছেন। ভার্জিনিয়ায় অ্যাবিগেইল স্প্যানবার্গার রিপাবলিকান গভর্নর গ্লেন ইয়াংকিনের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়ে রাজ্যের প্রথম নারী গভর্নর হতে যাচ্ছেন। আর নিউ জার্সিতে সাবেক কংগ্রেস সদস্য মিকি শেরিল ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকান জ্যাক সিয়াতারেলিকে পরাজিত করে রাজ্যের প্রথম নারী ডেমোক্র্যাট গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন।
একই সঙ্গে ভার্জিনিয়ার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে জয়ী হয়েছেন গাজালা হাশমি, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে রাজ্য পর্যায়ে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়লেন।
ক্যালিফোর্নিয়াতেও গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের প্রস্তাবিত কংগ্রেসনাল আসন পুনঃবিন্যাস পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন ভোটাররা, যা আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে ডেমোক্র্যাটদের প্রচেষ্টায় বড় সহায়তা দেবে বলে সিএনএনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ফলাফল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের প্রথম বড় নির্বাচনী পরীক্ষায় রিপাবলিকানদের জন্য স্পষ্ট সতর্কসংকেত। ট্রাম্প নিজেও সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দলের পরাজয়ের জন্য 'সরকারি অচলাবস্থা' ও 'নিজের অনুপস্থিতি'কে দায়ী করেছেন।
ভার্জিনিয়ার প্রথম নারী গভর্নর
ভার্জিনিয়ার গভর্নর নির্বাচনকে অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল, কারণ এই রাজ্যের ফলাফলকে প্রায়ই জাতীয় রাজনীতির আগাম পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হয়। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাবিগেইল স্প্যানবার্গার এই নির্বাচনে রিপাবলিকান লেফটেন্যান্ট গভর্নর উইনসাম আর্ল-সিয়ার্সকে পরাজিত করেছেন।
ব্যালটে নাম না থাকলেও এই নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির ওপর এক ধরনের গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনসহ বহু ফেডারেল কর্মীর বাসস্থান এই রাজ্যে, যারা ট্রাম্পের ব্যয় সংকোচন নীতির কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। স্প্যানবার্গার তার প্রচারণায় এই অর্থনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর সমর্থকদের উদ্দেশে স্প্যানবার্গার বলেন, 'আজ রাতে আমরা পুরো বিশ্বকে একটি বার্তা পাঠিয়েছি।' তিনি ঘোষণা করেন, তার রাজ্য 'দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তবতাকে' এবং 'বিশৃঙ্খলার চেয়ে কমনওয়েলথকে' বেছে নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, তার এই জয় 'বাকি দেশের জন্য একটি উদাহরণ তৈরি করতে পারে।'
ভার্জিনিয়ার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদেও জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী গাজালা হাশমি, যা তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম রাজ্যব্যাপী নির্বাচিত মুসলিম নারী হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।
নিউজার্সিতে ডেমোক্র্যাট মিকি শেরিল
অন্যদিকে, নিউ জার্সির গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মিকি শেরিল। তিনি রিপাবলিকান দলের সাবেক স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ জ্যাক সিয়াটারেলিকে পরাজিত করেন। ৫৩ বছর বয়সী শেরিল কংগ্রেস সদস্যের দায়িত্ব পালনের আগে একজন প্রসিকিউটর ও নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার পাইলট ছিলেন।
এই নির্বাচনকে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য পূর্বাভাস এবং ট্রাম্পের প্রতি ভোটারদের মনোভাব পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। রিপাবলিকান প্রার্থী সিয়াটারেলি ট্রাম্পের সমর্থন নিয়েছিলেন এবং তার প্রচারণায় সাশ্রয়ী জীবনযাত্রার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি লিঙ্গ পরিচয় ও অভিবাসনের মতো বিভেদ সৃষ্টিকারী বিষয়গুলোকে সামনে এনেছিলেন।
বিজয় সমাবেশে মিকি শেরিল বলেন, 'জার্সি, আমি তোমাদের কথা শুনতে পাচ্ছি। ভালো সরকার শুধু সমস্যার ব্যবস্থাপনা করে না, তার সমাধানও করে।'
নিউ জার্সি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির চেয়ারম্যান লেরয় জোনস শেরিলের নির্বাচনী প্রতীক উল্লেখ করে বলেন, 'অনেকেই হেলিকপ্টার নিয়ে মজা করেছিল। কিন্তু অনুমান করুন তো কী হয়েছে? এটি আজ এখানে অবতরণ করেছে!'
নিউইয়র্কে ইতিহাস গড়লেন মামদানি
৩৩ বছর বয়সী দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম জোহরান মামদানি মঙ্গলবার নিউইয়র্কের রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো ও রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়াকে পরাজিত করে শহরটির মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে অনেকগুলো 'প্রথমের' জন্ম দিয়ে ইতিহাসে নাম লেখাতে যাচ্ছেন এ ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট নেতা। তিনি হতে যাচ্ছেন নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং আফ্রিকায় জন্মগ্রহণকারী প্রথম মেয়র।
শুধু তা-ই নয়, আগামী ১ জানুয়ারি যখন দায়িত্ব গ্রহণ, তখন মামদানি হবেন এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে শহরটির সর্বকনিষ্ঠ মেয়র।
