দীর্ঘ একাকীত্বের পর বিরল ভাইরাসে দিল্লি চিড়িয়াখানার একমাত্র আফ্রিকান হাতির মৃত্যু
ইঁদুরবাহী এক বিরল ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দিল্লির চিড়িয়াখানায় থাকা একমাত্র আফ্রিকান হাতি শংকর ২৯ বছর বয়সে মারা গেছে।
দিল্লি চিড়িয়াখানার পরিচালক সঞ্জীত কুমার জানান, ময়নাতদন্তের ফলাফলেই শংকরের এনসেফালো-মায়োকার্ডাইটিস ভাইরাসে (ইএমসিভি)-তে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এই ভাইরাস মূলত স্তন্যপায়ী প্রাণীর হৃদ্যন্ত্র এবং ক্ষেত্রবিশেষে মস্তিষ্কে আক্রমণ করতে পারে। ইঁদুরের মলমূত্রের মাধ্যমে এর সংক্রমণ ছড়ায়। এখন পর্যন্ত এর কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই।
এমএসডি ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল অনুযায়ী, খামারের শুকর, প্রাইমেট গবেষণা কেন্দ্র ও চিড়িয়াখানায় থাকা প্রাণীদের মধ্যে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়।
২০১২ সালে ভিরুলেন্স জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শুকর, ইঁদুর, বিড়াল এবং আফ্রিকান হাতিসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। নেচার-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় একটি গিবনের দেহ থেকে প্রথমবারের মতো ইএমসিভি শনাক্ত করা হয়েছিল।
১৯৭০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে স্থানীয়ভাবে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাদুর্ভাবগুলো বিশেষভাবে আফ্রিকান হাতিদের প্রভাবিত করেছে।
ভারতে ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে এই ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয়েছিল। তবে শংকরের মৃত্যুই দেশটিতে ইএমসিভি-তে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়, এর আগেও এই ভাইরাসে প্রাণীর মৃত্যু ঘটলেও তা নথিভুক্ত করা হয়নি।
শংকরের মৃত্যু প্রাণীপ্রেমী ও চিড়িয়াখানার কর্মীদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই তারা এই একাকী প্রাণীটির পুনর্বাসনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
১৯৯৮ সালে জিম্বাবুয়ে থেকে তৎকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রপতি শংকর দয়াল শর্মার কাছে কূটনৈতিক উপহার হিসেবে দুটি আফ্রিকান হাতি আনা হয়েছিল। কিন্তু ২০০১ সালে শংকরের সঙ্গী মারা যায়। পরবর্তীতে তাকে এশীয় হাতিদের সঙ্গে রাখার চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি।
২০০৯ সালে এককভাবে হাতি রাখার ওপর ছয় মাসের বেশি সময়ের নিষেধাজ্ঞা জারি থাকা সত্ত্বেও, ২০১২ সালে শংকরকে একটি নতুন খাঁচায় স্থানান্তরিত করা হয়, যেখানে সে প্রায় সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় জীবন কাটায়।
২০২১ সালে দিল্লি হাইকোর্টে শংকরকে অন্য আফ্রিকান হাতিদের সঙ্গে কোনো বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে পাঠানোর জন্য একটি আবেদন করা হয়েছিল। তবে দুই বছর পর আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেয় এবং আবেদনকারীকে চিড়িয়াখানার প্রাণী স্থানান্তর কমিটির কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।
শংকরের মৃত্যুর পর এখন ভারতে একমাত্র জীবিত আফ্রিকান হাতি রয়েছে কর্ণাটকের মাইসোর চিড়িয়াখানায়, যেটিও বহু বছর ধরে একাকী বসবাস করছে।
