সেই 'কলা শিল্পীর' স্বর্ণের টয়লেট 'আমেরিকা' এবার নিলামে, দাম শুরু ১ কোটি ডলার থেকে
বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বা কুখ্যাত টয়লেটগুলোর একটি হতে পারে এটি। ইতালীয় শিল্পী মাউরিজিও ক্যাটেলানের তৈরি ১৮ ক্যারেট বিশুদ্ধ সোনার ২২০ পাউন্ড ওজনের টয়লেট 'আমেরিকা'। ২০১৬ সালে নিউইয়র্কের গুগেনহাইম জাদুঘরের বাথরুমে প্রদর্শিত হলে এটি দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন প্রায় লাখখানেক দর্শক।
তিন বছর পর, ২০১৯ সালে, চুরি হয়ে যায় এই শিল্পকর্মটি। ব্রিটেনের অক্সফোর্ডশায়ারের ব্লেনহেইম প্যালেস—যেটি স্যার উইনস্টন চার্চিলের জন্মস্থান—সেখান থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের এক দুঃসাহসিক অভিযানে চোরেরা নিয়ে যায় এটি। চলতি বছরের শুরুতে অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করা হলেও এখনো টয়লেটটির হদিস মেলেনি। ধারণা করা হয়, সোনার মূল্যেই এটি কেটে বা গলিয়ে ফেলা হয়েছে।
তবে এখানেই শেষ নয় 'আমেরিকা'র কাহিনি। শিল্পকর্মটি একসময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদে হোয়াইট হাউসে প্রদর্শনের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল—ট্রাম্প প্রশাসন ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের একটি চিত্রকর্ম ধার চেয়েছিল, জবাবে গুগেনহাইম মিউজিয়াম এই সোনার টয়লেট অফার করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই সেই প্রস্তাব উপেক্ষিত হয়।
ক্যাটেলান আগেই জানিয়েছিলেন, তিনি এই শিল্পকর্মের একাধিক সংস্করণ তৈরি করেছিলেন। এবার সেই দ্বিতীয় সংস্করণটি উঠছে নিলামে—নিউইয়র্কের সোথেবি'সের আয়োজনে আগামী ১৮ নভেম্বর।
২০১৭ সাল থেকে এটি এক ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল। এবার নিলামের আগে ১০ দিনের জন্য সোথেবি'সের নতুন সদরদপ্তরের চতুর্থ তলার বাথরুমে প্রদর্শিত হবে এটি। তবে এবার কেউ এটি ব্যবহার করতে পারবে না—নিরাপত্তার স্বার্থে, জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সোথেবি'সের সমসাময়িক শিল্প বিভাগের প্রধান ডেভিড গ্যালপারিন মজা করে বলেন, 'দরজা খোলা থাকবে, কিন্তু ব্যবহার নিষেধ।'
সাধারণত নিলামে কোনো শিল্পকর্মের শুরুমূল্য আগে থেকে নির্ধারিত থাকে। কিন্তু 'আমেরিকা'র দাম শুরু হবে সোনার বাজারদর অনুযায়ী, যা বর্তমানে প্রায় এক কোটি ডলার সমমূল্যের। এর সঙ্গে যুক্ত হবে শিল্পকর্মটির প্রতীকী বা শিল্পমূল্য—যা সংগ্রাহকদের আগ্রহ অনুযায়ী আরও বাড়তে পারে।
গ্যালপারিন বলেন, 'শুরুমূল্য সোনার দামের সঙ্গে যুক্ত রাখা হয়েছে মূলত এই শিল্পকর্মের ভাবধারাকে প্রতিফলিত করতেই—একটি শিল্পকর্মের নান্দনিক মূল্যের সঙ্গে এর বস্তুগত মূল্যের পার্থক্য তুলে ধরার জন্য।'
তিনি যোগ করেন, 'এটি ক্যাটেলানের আরেক বিখ্যাত কাজ—দেয়ালে টেপ দিয়ে আটকানো কলা "কমেডিয়ান"-এর নিখুঁত পরিপূরক বলা যায়।' গত বছর সোথেবি'সেই ওই কাজটি বিক্রি হয়েছিল ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। ১২০ হাজার ডলার মূল্যে আর্ট বাসেল মিয়ামিতে প্রথম প্রদর্শিত সেই কলা একাধিকবার খাওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
'"কমেডিয়ান" যেখানে মূলত শিল্পের অদৃশ্য মূল্যবোধ ও আমরা কিভাবে কোনো শিল্পকর্মে মূল্য আরোপ করি—সেই ধারণাকে ব্যঙ্গ করেছে, সেখানে "আমেরিকা" সেই ভাবনাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। কারণ, এটি এমন এক শিল্পকর্ম যা নিজেই বস্তুগতভাবে মূল্যবান—যে দিক থেকে অধিকাংশ শিল্পকর্ম কখনোই নয়', আরও বলেন তিনি।
সোদেবিসে'র মতে, এটিই হয়তো 'আমেরিকা'-র একমাত্র টিকে থাকা সংস্করণ। যদিও এর তিনটি সংস্করণ তৈরির কথা ছিল, কিন্তু নিলাম প্রতিষ্ঠানটি মনে করে, তৃতীয়টি কখনোই তৈরি করা হয়নি।
গ্যালপারিনের ভাষায়, '"আমেরিকা" শুধু এক টুকরো বিলাসবহুল শিল্প নয়—এটি আধুনিক শিল্প ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করে, যেমন মার্সেল দুশঁর ১৯১৭ সালের বিখ্যাত "ফাউন্টেন"।
গ্যালপারিন বলেন , 'ক্যাটেলান তার পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই শিল্পব্যবস্থাকে সমালোচনার চোখে দেখেছেন—হোক তা জাদুঘরে দর্শকের অভিজ্ঞতা, শিল্পকর্মের বাজারে প্রবাহ, এর মূল্যায়ন বা মালিকানা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া।'
তিনি আরও বলেন, 'এসব প্রশ্ন বা ধারণা অধিকাংশ শিল্পকর্ম খুব কমই সরাসরি স্পর্শ করে। ক্যাটেলান যে স্পষ্টতা ও প্রভাব নিয়ে এসব বিষয়কে সামনে আনতে পেরেছেন, সেটাই এই কাজটির সাফল্যের অন্যতম কারণ।'
