পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা ধূমকেতু নিয়ে গুজব সত্য নয়: নাসা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, একটি বিশাল ধূমকেতু পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষের পথে রয়েছে, যা মানবজাতির জন্য ভয়াবহ হুমকি তৈরি করতে পারে। কেউ কেউ আবার বলছেন, এটি হয়তো ধূমকেতু নয়—বরং ভিনগ্রহী প্রযুক্তি বা মহাকাশযান।
তবে নাসা এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ) স্পষ্ট জানিয়েছে, এসব গুজবের কোনো ভিত্তি নেই।
থ্রিআই/অ্যাটলাস নামের এই ধূমকেতু গত ১ জুলাই নাসার অ্যাটলাস টেলিস্কোপ শনাক্ত করে।
তবে এটিকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়াতে শুরু করে গত ২৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন গণমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পর। প্রতিবেদনের শিরোনামের বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায়– "পৃথিবীর দিকে ধাবমান ধূমকেতু, আগে যতোটা ধারণা করা হয়েছিল তার চেয়েও বড়, হতে পারে এলিয়েন প্রযুক্তি, বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটা সবকিছুকে উলটে পালটে দিতে পারে।
এই প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স' (পূর্বের টুইটার)-এ কয়েকটি পোস্ট ভাইরাল হয়। কারও পোস্টে দাবি করা হয়, "বিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি ভিনগ্রহী মহাকাশযান পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে।" আবার কেউ লিখেছেন, "এ কারণেই সেনা জেনারেলদের বৈঠক ডাকা হয়েছে।" গত ৩০ সেপ্টেম্বর পেন্টাগনে শীর্ষ জেনারেলদের নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যে বৈঠক করেন, এই পোস্টে সেটিরই এমন কারণ দাবি করা হয়। ওই পোস্টটি দেখেছেন পাঁচ লাখেরও বেশি ব্যবহারকারী।
অন্যদিকে, আরেকটি অ্যাকাউন্টে এমনও বলা হয়, "১৩০,০০০ মাইল প্রতি ঘণ্টা বেগে একটি ধূমকেতু পৃথিবীর দিকে আসছে! তবে ভয় নেই, ইতিমধ্যে দুটি বিশেষ মিশন প্রস্তুত আছে—একটির নাম মেসায়াহ ক্রু, অন্যটির ফ্রিডম টিম ও ইন্ডিপেনডেন্স টিম।"
'ভিনগ্রহী মহাকাশযান' দাবি
কিছু অ্যাকাউন্ট এমনও প্রচার করেছে যে এটি আসলে ধূমকেতু নয়, বরং ভিনগ্রহীদের পাঠানো রেকি মিশন বা শত্রুভাবাপন্ন মহাকাশযান। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় মার্কিন পদার্থবিদ মিচিও কাকুর নাম ও একটি পুরনো সাক্ষাৎকারের বিকৃত ছবি। তবে যাচাই করে দেখা গেছে, ছবিটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির একটি পুরনো টিভি সাক্ষাৎকার থেকে নেওয়া, যা থ্রিআই/ অ্যাটলাস আবিষ্কারের মাস কয়েক আগেই প্রচারিত হয়েছিল।
আসল তথ্য কী?
নাসা জানিয়েছে, থ্রিআই/অ্যাটলাস নামের এই ধূমকেতুটি তাদের অ্যাটলাস টেলিস্কোপে শনাক্ত হয় ২০২৫ সালের ১ জুলাই। এটির একটি "বরফঘেরা নিউক্লিয়াস এবং লেজের মতো ধুলোমেঘ" রয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, ধূমকেতুটি পৃথিবীর জন্য কোনো হুমকি নয়। ২১ জুলাই এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২৭০ মিলিয়ন কিলোমিটার দূর দিয়ে অতিক্রম করেছে—যা পৃথিবী ও সূর্যের দূরত্বের আড়াই গুণেরও বেশি।
ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি-ও একই তথ্য নিশ্চিত করেছে এবং বলেছে, ধূমকেতুটি পৃথিবী বা অন্য কোনো গ্রহের কাছে আসবে না।
সূর্যের কাছাকাছি যাত্রা
নাসা জানিয়েছে, ধূমকেতুটি আগামী ৩০ অক্টোবর সূর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছাবে। তখন এটি সূর্য থেকে প্রায় ২১০ মিলিয়ন কিলোমিটার দূর দিয়ে যাবে, যা মঙ্গলগ্রহের কক্ষপথের ভেতরে।
এটি এখন পর্যন্ত সৌরজগতে প্রবেশ করা সবচেয়ে দ্রুতগামী ধূমকেতু, ঘণ্টায় প্রায় ২,১০,০০০ কিলোমিটার বেগে ছুটছে। হাবল টেলিস্কোপ জানিয়েছে, এটির নিউক্লিয়াসের ব্যাস সর্বোচ্চ ৫.৬ কিলোমিটার হতে পারে, তবে এটি ৪৪০ মিটার ছোটও হতে পারে।
নাসা বলেছে, এই ধূমকেতুটি বিজ্ঞানীদের জন্য বিরল এক সুযোগ এনে দিয়েছে—সৌরজগতে প্রবেশ করা এক "অতিথি" ধূমকেতুকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার।
