যুগের অবসান: ভারতের কিংবদন্তী ও বিতর্কিত যুদ্ধবিমান মিগ-২১ এর বিদায়
প্রথমবার মিগ-২১ এর ইঞ্জিনকে সর্বোচ্চ গতিতে উড়িয়ে, এক তরুণ পাইলট শব্দের দ্বিগুণ বেগে পৃথিবী থেকে ২০ কিলোমিটার উঁচুতে পৌঁছালেন। তার নিজেকে মনে হচ্ছিল পালকের মতো হালকা, ঠিক যেন মহাশূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছেন।
অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল পৃথ্বী সিং ব্রার সেই স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'ম্যাক-২ গতিতে উড়লে পেটের ভেতরটা কেমন যেন হালকা হয়ে যায়। ওই গতিতে মিগ-২১ যখন বাঁক নিত, তখন মনে হতো যেন দিগন্তজুড়ে ঘুরছে। তীব্র গতিতে একবার বাঁক নিতে শুরু করলে, পুরো চক্কর শেষ করার আগেই বিমানটা কয়েক কিলোমিটার দূরে চলে যেত।'
তিনি ১৯৬০ সালে বিমানবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৬৬ সাল থেকে এই সোভিয়েত বিমানটি ওড়ানো শুরু করেন। টানা ২৬ বছর ধরে তিনি এই বিমানের পাইলট ছিলেন।
তিনি আমাকে বলেন, 'একটা পাখি যেমন আকাশকে ভালোবাসে, আমিও ঠিক সেভাবেই মিগ-২১ ওড়াতে ভালোবাসতাম। যুদ্ধের সময় এই বিমানটাই ছিল আমার রক্ষাকবচ। যখন কোনো বাজপাখি শিকার করতে আসে, তখন চালাক পাখি যেমন নিজেকে বাঁচিয়ে পালিয়ে যায়, আমার জন্য মিগ-২১ ছিল ঠিক তেমনই।'
ছয় দশক ধরে কখনো প্রশংসা, আবার কখনো তীব্র সমালোচনার পর ভারতের এই কিংবদন্তী যুদ্ধবিমানটি অবশেষে আকাশে তার শেষ উড়ানটি দিতে চলেছে। একটা সময় ছিল যখন মিগ-২১ ভারতীয় বিমানবাহিনীর মেরুদণ্ড ছিল। বাহিনীর দুই-তৃতীয়াংশ যুদ্ধবিমানই ছিল এটি। পাইলটরা এই বিমানটিকে পাগলের মতো ভালোবাসতেন, কিন্তু শেষের দিকে একের পর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কারণে এটি 'উড়ন্ত কফিন' বা 'চলন্ত কফিন' নামে কুখ্যাতি পায়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৬ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে ভারত বিভিন্ন মডেলের মোট ৮৭২টি মিগ বিমান কিনেছিল।
১৯৭১ থেকে ২০১২ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৪৮২টি মিগ বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এই দুর্ঘটনাগুলোতে ১৭১ জন পাইলট, ৩৯ জন সাধারণ মানুষ এবং আরও কয়েকজন সেনা সদস্য প্রাণ হারান। এর কারণ হিসেবে যান্ত্রিক ত্রুটি এবং মানবিক ভুল—দুটোকেই দায়ী করা হয়। এরপর থেকে দুর্ঘটনার নতুন কোনো সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক রাহুল ভাটিয়া বলেন, 'মিগ-২১ এর ইতিহাসটা গৌরব আর বিতর্কে মেশানো। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রধান শক্তি ছিল এবং ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান যুদ্ধের পর থেকে ভারতের প্রায় সব লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে।' তিনি আরও বলেন, 'কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকে বিমানটি তার দুর্ঘটনার রেকর্ডের জন্য বেশি পরিচিত হতে থাকে। পাইলটরা মিগ-২১ কে ভালোবাসলেও, বিমানটিকে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি দিন ব্যবহার করা হয়েছে।'
সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি এই ছুঁচলো নাকের বিমানটি প্রথম বাহিনীতে আসে ১৯৬৩ সালে। এটি ছিল ক্ষিপ্র, প্রচণ্ড গতিতে আকাশে উঠতে পারত এবং নিমেষে শত্রুর কাছাকাছি পৌঁছে যেত। একটা সময় বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ—সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, ভারত থেকে শুরু করে মিশর, ইরাক ও ভিয়েতনাম—এই বিমান ব্যবহার করত। এটি ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় সুপারসনিক জেট।
ভারতে, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড ১৯৬০-এর দশকে লাইসেন্সের অধীনে এটি তৈরি করা শুরু করলে, মিগ-২১ ভারতীয় বিমানবাহিনীর মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। যুদ্ধের ময়দানে এর বহুমুখী ক্ষমতার জন্য এটি ছিল অমূল্য।
পাইলটরা বলেন, মিগ-২১ এর ককপিটে আরামের কোনো বালাই ছিল না। শুধু একটি সিট, আর চারপাশে খোলা আকাশ।
এর এয়ার-কন্ডিশনিং সিস্টেমটি রাশিয়ার কনকনে ঠান্ডার জন্য তৈরি হয়েছিল, তাই ভারতের ভয়ংকর গরমে তা প্রায় কোনো কাজেই আসত না। অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল বিনোদ কে ভাটিয়া বলেন, নিচ দিয়ে ওড়ার সময় ককপিট চুল্লির মতো গরম হয়ে যেত এবং মাত্র একটি মিশনেই পাইলটদের শরীর থেকে এক কেজি বা তার বেশি ওজন ঝরে যেত।
তিনি বলেন, 'আমি বেশিরভাগ সময় ৩০ মিনিটের জন্যই উড়তাম, তাই অস্বস্তিটা কোনোমতে সহ্য করে নিতাম। তবে দিন শেষে, এই কষ্টটাও খেলারই একটা অংশ ছিল এবং সবকিছু মিলিয়ে বেশ উপভোগ্য ছিল।'
মিগ-২১ আসলে তৈরি হয়েছিল অনেক উঁচুতে থাকা শত্রু বিমানকে দ্রুতগতিতে আক্রমণ করার বা বাধা দেওয়ার জন্য। কিন্তু ভারতীয় বিমানবাহিনী এটিকে দ্রুতই নিজেদের মতো করে নেয় এবং সামনাসামনি যুদ্ধ ও স্থল হামলায় ব্যবহার করতে শুরু করে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় এটি একটি বিধ্বংসী রূপ নেয়। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে এটি নতুন থাকলেও, '৭১-এর যুদ্ধে এটি ছিল একাই একশ। মিগ-২১ ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সম্পর্ককেও মজবুত করেছে এবং ভারতের নিজস্ব বিমান শিল্প গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
এয়ার মার্শাল ব্রার বলেন, 'আমরা বিমানটিকে ভারতীয় পরিস্থিতির সঙ্গে অসাধারণভাবে মানিয়ে নিয়েছিলাম। যদিও এর ডিজাইনে কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, আমরা রাশিয়ান পাইলটদের শেখানো কৌশলের বাইরে গিয়ে বিমানটিকে ব্যবহার করেছি অবিশ্বাস্য দক্ষতা অর্জন করেছি।'
এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৭১ সালের যুদ্ধে। মিগ-২১ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানের অনেক গভীরে ঢুকে নিচু দিয়ে হামলা চালাত। একবার তো একদল মিগ-২১ ঢাকার গভর্নর হাউসের ছাদে রকেট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল।
এয়ার মার্শাল ব্রার বলেন, 'প্রতিটি বিমানে ৫০০ কেজির দুটি বোমা থাকত। আমি এমন তিন-চারটি মিশনে গিয়েছি। অমৃতসর থেকে উড়াল দিয়ে মাত্র ৩৫ মিনিটের মধ্যে আমরা পাকিস্তানে ঢুকে পড়তাম, ২৫০ কিলোমিটার ভেতরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে রাজস্থানের ওপর দিয়ে চোখের পলকে ফিরে আসতাম।'
প্রত্যেক যুদ্ধবিমানেরই কিছু ভালো-মন্দ দিক থাকে। মিগ-২১ এরও ছিল। এয়ার মার্শাল ভাটিয়া বলেন, 'এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল এর ইঞ্জিন আর অবতরণের সময় এর প্রচণ্ড গতি, যার কারণে ছোট রানওয়েতে নামাটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আর অনেক দুর্ঘটনার কারণও ছিল এটাই।' তিনি যোগ করেন, 'কিন্তু যদি আপনি একে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, একে সম্মান করেন, তবে এটি ওড়ানোর জন্য অসাধারণ একটি বিমান।'
যে পাইলটরা এটি উড়িয়েছেন, তাদের মতে, শেষের দিকে বিমানটির যে দুর্নাম হয়েছে, তা অন্যায্য। একজন তো বলেই ফেললেন, 'সংবাদমাধ্যম বিমানটির প্রতি খুবই নির্দয় ছিল।'
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক রাহুল বেদীর মতে, 'মিগ-২১ নিয়ে এত আবেগ দেখানোর কিছু নেই, কারণ এর জন্য বহু পাইলটের মৃত্যু হয়েছে।'
মিগ-২১ কে বারবার অবসরে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে তা আটকে যায়। এর জায়গা নেওয়ার জন্য যে নতুন হালকা যুদ্ধবিমান তৈরির পরিকল্পনা হয়েছিল ১৯৮১ সালে, সেটি প্রথম আকাশে ওড়ে ২০০১ সালে। কিন্তু কয়েক দশক পরেও মাত্র দুটি স্কোয়াড্রন তৈরি হয়েছে।
ফলে বিমানবাহিনীকে বাধ্য হয়েই পুরোনো মিগ-২১ এর মেয়াদ বাড়াতে হয়েছে। এখন শেষ দুটি স্কোয়াড্রনও অবসর নিলে, ভারতের হাতে ৪২টির জায়গায় মাত্র ২৯টি ফাইটার ইউনিট থাকবে। কিন্তু পাইলটদের কাছে মিগ-২১ শুধু একটি যন্ত্র ছিল না, এটি ছিল আকাশের বুকে এক বিশ্বস্ত সঙ্গী।
২০০০ সালের জুলাই মাসে অবসরের মাত্র দুদিন আগে এয়ার মার্শাল ব্রার চণ্ডীগড় থেকে তার জীবনের শেষ উড়ানটি দিয়েছিলেন। সেই অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন:
'আমি আরও একবার আকাশে ছিলাম, ঠিক যেন আকাশের বুকে শেষবারের মতো ডানা মেলা এক পাখির মতো। যখন বিমান থেকে নামলাম, আমার মনটা এক অনাবিল শান্তিতে ভরে গিয়েছিল।'
