এইচ-১বি ভিসা: সময়সীমা শেষ হওয়ার ভয়ে ৮ হাজার ডলার খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরলেন ভারতীয়
রোহান মেহতা (ছদ্মনাম) ভিসা ফি নাটকীয়ভাবে বাড়ার সময়সীমার আগেই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসেছেন। তবে এভাবে তাড়াহুড়ো করে ফিরে আসতে থাকে বিমানের টিকেটেই গুণতে হয়েছে ৮ হাজার ডলারের বেশি (প্রায় ৫ হাজার ৯০০ পাউন্ড)। খবর বিবিসির।
বাবার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ভারতের নাগপুরে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভিসা সংক্রান্ত সময়সীমার কারণেই তাকে সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরতে হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার একটি নির্বাহী আদেশে সই করেন, যেখানে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য ভিসা প্রোগ্রামে আবেদনকারীদের এখন ১ লাখ ডলার (প্রায় ৭৪ হাজার পাউন্ড) ফি দিতে হবে। এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোকে পরিশোধ করতে হবে।
কোম্পানি ও অভিবাসন আইনজীবীরা ইতোমধ্যেই এইচ-১বি ভিসাধারীদের, যারা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ছিলেন, তাদেরকে রোববার আদেশ কার্যকর হওয়ার আগে দেশে ফেরার পরামর্শ দিয়েছেন।
একদিন পর হোয়াইট হাউস স্পষ্ট করে জানায়, এটি এককালীন ফি হবে এবং বর্তমান ভিসাধারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তবে ততক্ষণে অনেকের জন্যই তা দেরি হয়ে গেছে।
এই কর্মসূচির আওতায় ভারতীয় কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি এই ভিসা পান। প্রতি বছর যে ৮৫ হাজার ভিসা দেওয়া হয়, তার মধ্যে ৭০ শতাংশেরও বেশি যায় ভারতীয়দের হাতে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক্স-এ (পূর্বের টুইটার) বিষয়টি পরিষ্কার করে জানালেও উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি তখনই ছড়িয়ে পড়ে।
বিবিসি ভারতের বহু এইচ-১বি ভিসাধারীর সঙ্গে কথা বলেছে।
তাদের অনেকেই কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছেন।
কারও পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি, কারণ তাদের নিয়োগকর্তারা সে অনুমতি দেননি। অনেকে একেবারেই কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।
রোহান মেহতা একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। গত ১১ বছর ধরে তিনি পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে থাকছেন। এ মাসের শুরুতে তিনি ভারতের নাগপুরে গিয়েছিলেন আত্মীয়দের সঙ্গে বাবার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে।
কিন্তু ২০ সেপ্টেম্বর তিনি বলেন, সময়সীমার আগে না ফিরতে পারলে হয়তো আর নিজের বাড়িতে ফেরার সুযোগ পাবেন না বলে আশঙ্কা করেছিলেন।
মাত্র আট ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার টিকিট বুকিং ও পুনরায় বুকিং করতে গিয়ে তিনি খরচ করেছেন ৮ হাজার ডলারেরও বেশি (প্রায় ৫ হাজার ৯০০ পাউন্ড)।
তিনি বলেন, 'আমি একাধিক টিকিট বুক করেছিলাম, কারণ বেশিরভাগ ফ্লাইটই সময়সীমার একেবারে কাছাকাছি ছিল।'
মুম্বাই থেকে ভার্জিন আটলান্টিকের ফ্লাইটে চড়ে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাওয়ার ঠিক পরেই তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, 'যদি সামান্য দেরিও হতো, আমি সময়সীমা মিস করতাম।'
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, নতুন ফি পরবর্তী ভিসা আবেদনগুলো অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর হবে না।
রোহান মেহতা গত কয়েক দিনকে 'যন্ত্রণাদায়ক' বলে বর্ণনা করেছেন। তবে এই সফরে তার সঙ্গে তার স্ত্রী ও মেয়ে ভারতে আসেননি বলে তিনি স্বস্তি বোধ করছেন।
তিনি আরও বলেন, 'আমি জীবনে যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছি তার জন্য অনুতপ্ত। আমি আমার যৌবনের সেরা সময়টা এই দেশে (যুক্তরাষ্ট্রকে) কাজ করে দিয়েছি, আর এখন মনে হচ্ছে আমাকে এখানে আর চাওয়া হচ্ছে না।'
রোোন মেহতা বলেন, 'আমার মেয়ে তার পুরো জীবনটাই যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছে। আমি নিশ্চিত নই, কীভাবে আমি সেখান থেকে জীবন উপড়ে এনে আবার ভারতে নতুন করে শুরু করব।'
এইচ-১বি একটি কর্মভিসা কর্মসূচি, যা যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষায়িত ক্ষেত্রে কাজে ইচ্ছুকদের দেওয়া হয়। এই কর্মসূচির আওতায় নিয়োগকর্তারা পেশাজীবীদের স্পনসর করতে পারেন। অর্থাৎ ভিসার আবেদনের জন্য চাকরির প্রস্তাব বাধ্যতামূলক।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে এই কর্মসূচির সর্বাধিক সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান ছিল অ্যামাজন। এর পরেই রয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট টাটা, মাইক্রোসফট, মেটা, অ্যাপল ও গুগল।
ইউরোপে ছুটিতে থাকা আরেকজন ভিসাধারীও স্বীকার করেছেন যে পরিস্থিতি বিভ্রান্তিকর।
তিনি বলেন, 'আমরা এখনো জানি না নিয়োগকর্তারা কী ভাবছেন এবং এটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে।'
তার ধারণা অনুযায়ী, এই আদেশ কেবল নতুন এইচ-১বি ভিসার জন্যই প্রযোজ্য। তবে অভিবাসন আইনজীবীরা এখনো বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছেন এবং আমাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক্স-এ (পূর্বের টুইটার) কিছু বিষয়ত স্পষ্ট করেছেন—যার মধ্যে রয়েছে যে এটি কোনো বার্ষিক ফি নয়, বরং এককালীন ফি।
তিনি লিখেছেন, 'যাদের ইতোমধ্যেই এইচ-১বি ভিসা আছে এবং বর্তমানে দেশটির বাইরে আছেন, তাদেরকে পুনঃপ্রবেশের জন্য ১ লাখ ডলার ফি দিতে হবে না।'
তিনি স্পষ্ট করেছেন, 'এইচ-১বি ভিসাধারীরা সাধারণত যেমন পারতেন, তেমনভাবেই দেশ ছেড়ে যাওয়া এবং পুনঃপ্রবেশ করতে পারবেন।'
তিনি আরও বলেন, নতুন ফি কেবল 'নতুন ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, নবায়ন বা বর্তমান ভিসাধারীদের ক্ষেত্রে নয়'।
