আজীবন বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি নিয়ে পূর্বাভাস দেবে নতুন এআই মডেল
চিকিৎসাশাস্ত্রে বড় অংশ জুড়ে থাকে রোগী কোন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন তা খুঁজে বের করা—বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ আর শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে। তবে সমান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আরও কঠিন কাজ হলো রোগী ভবিষ্যতে কোন রোগে আক্রান্ত হতে পারেন তা আগে থেকে জানা। এই লক্ষ্যেই তৈরি হয়েছে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মডেল 'ডেলফি-২এম'। এর বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে ১৭ সেপ্টেম্বর 'ন্যাচার' সাময়িকীতে।
ডেলফি-২এম এখনো হাসপাতাল ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত নয়। তবে নির্মাতাদের আশা—একদিন এটি চিকিৎসকদের হাতে এমন একটি হাতিয়ার দেবে, যা দিয়ে রোগীরা ভবিষ্যতে এক হাজারের বেশি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আগে থেকে জানা যাবে। এর মধ্যে রয়েছে আলঝেইমারস, ক্যানসার, হৃদরোগের মতো মারাত্মক অসুখ, যা প্রতিবছর কোটি মানুষের জীবন বদলে দেয়। এতে শুধু ঝুঁকিপূর্ণ রোগী চিহ্নিত করা নয়, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও বাজেট পরিকল্পনায় সুবিধা পাবে।
এ মডেল তৈরি করেছে কেমব্রিজের ইউরোপিয়ান মলিকুলার বায়োলজি ল্যাবরেটরি (ইএমবিএল) এবং হাইডেলবার্গের জার্মান ক্যানসার রিসার্চ সেন্টার। এটি অনুপ্রাণিত হয়েছে বৃহৎ ভাষা মডেল (এলএলএম) থেকে—যেমন জিপিটি-৫ (যা দিয়ে চ্যাটজিপিটি চলে)। ভাষা মডেল ইন্টারনেটের বিপুল লেখা বিশ্লেষণ করে শব্দের ধারা শিখে পরবর্তী শব্দ অনুমান করে। গবেষকদের ধারণা ছিল, মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিপুল তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দিলে এআইও ভবিষ্যৎ রোগ অনুমান করতে পারবে।
ভাষা মডেলের নকশা মূলত লেখার জন্য তৈরি। তবে রোগীর জীবনের ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধানও বড় বিষয়। যেমন—গর্ভধারণ পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার পর দ্রুত উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়লে তার অর্থ গর্ভাবস্থার ঝুঁকি, কিন্তু কয়েক বছর পর হলে কারণ ভিন্ন। ডেলফি-২এম এই সময়ের ব্যবধানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
মডেলটি প্রশিক্ষিত হয়েছে ইউকে বায়োবাঙ্কের ৪ লাখ মানুষের তথ্য দিয়ে। সেখানে ১,২৫৬ ধরনের রোগ সময় ও ক্রমানুসারে নথিভুক্ত ছিল। এরপর আরও ১ লাখ মানুষের তথ্য দিয়ে যাচাই করা হয়। পরে ডেনমার্কের স্বাস্থ্য রেকর্ডে পরীক্ষা চালানো হয়—যেখানে ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯ লাখ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংরক্ষিত আছে।
ডেলফি-২এমের কার্যকারিতা মাপা হয় এরিয়া আন্ডার দ্য কার্ভ (এইউসি) দিয়ে। এখানে ১ মানে নিখুঁত পূর্বাভাস, আর ০.৫ মানে কেবল এলোমেলো অনুমান। আগের রোগ শনাক্তের পর পাঁচ বছরের মধ্যে নতুন রোগের ঝুঁকি বোঝাতে ব্রিটিশ ডেটায় মডেলটির স্কোর হয়েছে ০.৭৬। ডেনিশ ডেটায় তা কমে দাঁড়ায় ০.৬৭। সবচেয়ে ভালো ফল এসেছে সেই ক্ষেত্রে, যেখানে একটি ঘটনার পর আরেকটি ঘটনার সম্ভাবনা বেশি—যেমন সেপসিসের পর মৃত্যু। তবে বাইরের কারণে হওয়া রোগ, যেমন ভাইরাস সংক্রমণ, অনুমান করা কঠিন হয়েছে। সময় যত পেরিয়েছে, পূর্বাভাস তত কম সঠিক হয়েছে। দশ বছর পর গড় স্কোর নেমেছে ০.৭-এ।
মডেলটি বাস্তবে ব্যবহার করতে সময় লাগবে আরও বহু বছর। ডেলফি-২এমকে কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় রোগীদের জন্য এটি কার্যকর কি না। নির্মাতারা বলছেন, রোগের তালিকার পাশাপাশি চিকিৎসা-চিত্র ও জিনোম সিকোয়েন্স যুক্ত করলে নির্ভুলতা আরও বাড়বে।
ডেলফি-২এম একমাত্র উদ্যোগ নয়। ২০২৪ সালে কিংস কলেজ লন্ডন তৈরি করে ফোরসাইট মডেল, যা ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি অনুমান করত। তবে গত জুনে এর বড় সংস্করণ বন্ধ করা হয়, কারণ এনএইচএস ইংল্যান্ড অনুমোদন ছাড়াই ডেটা ব্যবহার করেছিল। একই ধরনের আরেকটি মডেল ইথোস (ইটিএইচওএস) তৈরি করছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়।
যদিও রোগীরা এখনই এর সুবিধা পাবেন না, তবে গবেষণার জন্য এটি বড় সুযোগ। ডেলফি-২এম জানাবে, কোন কোন রোগ একসঙ্গে দেখা দেয়। সেখান থেকে নতুন সম্পর্কের সূত্র পাওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত এআই মডেল এ গবেষণাকে এগিয়ে নেবে।
সম্ভাবনাগুলোকে রোমাঞ্চকর উল্লেখ করে ইএমবিএল-এর জিনতত্ত্ববিদ ইউয়ান বার্নি বলেন, 'আমি যেন ক্যান্ডির দোকানে ঢোকা একটা বাচ্চা।'
