সুখ খুঁজে হয়রান? সুখী থাকার রহস্য জানালেন বিশেষজ্ঞরা
সুখকে অনেকেই এক অদৃশ্য পাখির সঙ্গে তুলনা করেন—যাকে ধরা যায় না, শুধু ক্ষণিকের জন্য ছোঁয়া যায়। মানুষ প্রায়শই মনে করে, জীবনের কোনো এক বিশেষ অর্জনই তাকে স্থায়ী সুখ এনে দেবে।
হতে পারে সেটি স্বপ্নের চাকরি, ঝকঝকে নতুন গাড়ি কিংবা বহুদিনের পছন্দের মানুষের সঙ্গে প্রথম ডেটের উত্তেজনা। কিন্তু এই আনন্দের ঝলক অল্প সময়ের মধ্যেই ফিকে হয়ে আসে। তখন মনে হয়, হয়তো সত্যিকারের সুখ পেতে হলে আরও কিছু অর্জন করতে হবে, আরও কিছু পেতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক লরি সান্তোসের মতে, এটাই হলো সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা ভাবি যে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তনই আমাদের সুখ এনে দেবে।
তিনি বলেন, "সুখের সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, আমরা ভালো জিনিসে দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে যাই। যেমন, আপনার বেতন বাড়লে প্রথমে খুব ভালো লাগে, কিন্তু কিছুদিন পরই আপনি এতে অভ্যস্ত হয়ে যান এবং এটি আর আপনাকে আগের মতো সুখী করে না। এই বিষয়টিকে বলা হয় 'হেডোনিক অ্যাডাপ্টেশন', অর্থাৎ ভালো জিনিসে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া।"
অধ্যাপক সান্তোস "আপনি কি আপনার মনকে সুখী হওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত করতে পারেন?" শিরোনামের একটি ওয়েবিনারে কথা বলছিলেন। এর আয়োজন করেছিল নিউইয়র্ক-ভিত্তিক অনলাইন 'হ্যাপিনেস স্টাডিজ একাডেমি'। একাডেমিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক টাল বেন-শাহা, যিনি হার্ভার্ডে সুখ নিয়ে জনপ্রিয় কোর্স করাতেন।
সান্তোস জানান, ২০১৬ সালে যখন তিনি ইয়েলের একটি কলেজের প্রধান হন, তখন তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। তিনি দেখে অবাক হয়েছিলেন যে, বহু শিক্ষার্থী মারাত্মক হতাশায় ভুগছে, এমনকি কেউ কেউ আত্মহত্যার কথাও ভেবেছে।
তিনি বলেন, "আমি শিক্ষার্থীদের সাহায্য করার জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম। আমাদের মনোবিজ্ঞানে অনেক উত্তর আছে, এবং সেই উত্তরগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দিতে হবে, যাতে তারা সেগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে।"
২০১৮ সালে, সান্তোস ইয়েলে "সাইকোলজি অ্যান্ড দ্য গুড লাইফ" নামে একটি কোর্স চালু করেন, যা বিনামূল্যে ছিল। এটি দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়টির ৩০০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্লাসে পরিণত হয়। এই কোর্সের ওপর ভিত্তি করে এখন "হ্যাপিনেস ল্যাব" নামে একটি জনপ্রিয় পডকাস্ট এবং "কোর্সেরা" প্ল্যাটফর্মে "দ্য সায়েন্স অফ ওয়েল-বিইং" নামে একটি অনলাইন কোর্সও চালু হয়েছে।
এই অনলাইন কোর্সে অংশগ্রহণকারীদের সাপ্তাহিক "রিওয়্যারমেন্ট" বা অভ্যাস বদলের চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়, যাতে তারা বিজ্ঞানকে নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, দয়ার অনুশীলন, মেডিটেশন এবং সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর মতো কাজ।
বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই কোর্সটি করেছে এবং ভালো থাকার জন্য এর সহজ ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতির ব্যাপক প্রশংসা করেছে।
ওয়েবিনারের মূল প্রশ্নের উত্তরে সান্তোস বলেন, "এর উত্তর হলো, হ্যাঁ।" বৈজ্ঞানিক তথ্য দ্বারা সমর্থিত এমন কিছু মনস্তাত্ত্বিক কৌশল রয়েছে, যা মনের 'নেতিবাচক পক্ষপাত' বা খারাপ জিনিসের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হওয়ার প্রবণতাকে জয় করে আপনাকে সুখী হতে সাহায্য করতে পারে।
সাধারণত মনে করা হয়, সুখ হয় জিনগত, অথবা আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ফল। সান্তোস বলেন, দুটোই কিছুটা ভূমিকা রাখে, কিন্তু খাদ্য ও আশ্রয়ের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ হয়ে গেলে, সুখকে মানসিক অবস্থা হিসেবে ভাবাই বেশি কার্যকর।
তিনি বলেন, "বিজ্ঞান আমাদের বলে যে সুখ কিছুটা স্থির, আবার কিছুটা পরিবর্তনশীল। আমাদের সুখের কিছু অংশ জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।" গবেষণায় দেখা গেছে, অভিন্ন যমজ (যাদের ডিএনএ একই) সন্তানদের সুখের মাত্রা সাধারণ যমজদের তুলনায় বেশি কাছাকাছি থাকে।
তবে তিনি যোগ করেন, "আমাদের সুখের প্রায় ৩০ শতাংশ জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে, যা খুবই কম। তার মানে, পরিস্থিতি বদলানোর জন্য আমাদের হাতে একটি বড় সুযোগ রয়েছে।"
সান্তোসের মতে, সুখী হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো এটা ভাবা যে, বাইরের পরিস্থিতি বদলালে আমরা সুখী হব। গবেষণা প্রমাণ করেছে যে এই ধারণাটি ভুল।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, "আমাদের একটি ভুল ধারণা আছে যে আমাদের সুখ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। হ্যাঁ, পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, আপনি যদি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, তবে বেশি টাকা আপনার সুখ বাড়াতে পারে।"
কিন্তু এর বাইরে, পরিস্থিতি আমাদের সুখের মাত্রাকে খুব বেশি পরিবর্তন করে না। তিনি বলেন, "সুখ আসলে আমাদের আচরণ এবং মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে আসে।"
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু নির্দিষ্ট কাজ মানুষের মধ্যে সুখের অনুভূতি বাড়ায়। যেমন:
যা নেই তার পেছনে না ছুটে, যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা: কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং মানুষের সাথে সামাজিকভাবে যুক্ত হওয়া। সান্তোস বলেন, "ঝামেলাগুলোর দিকে নজর না দিয়ে, আশীর্বাদগুলোকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা।"
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: "প্রতিদিন কয়েকটি জিনিসের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তা লিখে রাখার একটি বিশেষ শক্তি রয়েছে। গবেষণা দেখায়, এই ছোট ছোট জিনিসগুলো লক্ষ্য করলে এবং লিখে রাখলে আপনার জীবন সন্তুষ্টি এবং ইতিবাচক মেজাজ বাড়তে পারে।"
সান্তোস জানেন যে এই ধরনের কথা অনেকের কাছে অবাস্তব শোনাতে পারে। তাই তিনি আরও একটি সহজ পদ্ধতির কথা বলেন। "দিনে কিছু আনন্দের মুহূর্ত খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন—একটি শিশুর হাসি, বা সকালের কফির উষ্ণতা। এই ছোট ছোট বিষয়গুলোও আমাদের মনের নেতিবাচক পক্ষপাতকে থামাতে পারে।"
এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই দিন শেষে বড় প্রাপ্তি হয়ে জমা হয়।
অনেকে ভাবতে পারেন, চরম কষ্টের মধ্যে থাকা মানুষের জন্য এই অনুশীলনগুলো হয়তো কাজ করবে না। কিন্তু সান্তোস এবং বেন-শাহারের মতে, এগুলো তখনও সাহায্য করতে পারে। বেন-শাহা বলেন, "সম্পর্ক গড়ে তোলা, শারীরিক ব্যায়াম করা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং দয়ার কাজের মতো অনুশীলনগুলো সম্পদের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং অভাবের মধ্যে থাকা সমাজে এই অনুশীলনগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।"
একাকিত্বের মহামারির কথা উল্লেখ করে সান্তোস বলেন, সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানো সুখী হওয়ার একটি কার্যকর উপায়। যদিও তিনি প্রযুক্তিবিরোধী নন, তবে তিনি মনে করেন যে আমাদের ফোনগুলো প্রায়ই মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, "আমি প্রায়ই দেখি শিক্ষার্থীরা ডাইনিং হলে একা একা বড় হেডফোন পরে বসে আছে। মানুষের সাথে যোগাযোগ করা আমাদের সুখের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রত্যেক সুখী মানুষই বেশি সামাজিক হয়। এর অর্থ হতে পারে বন্ধু এবং পরিবারের সাথে বেশি সময় কাটানো, অথবা কফি শপের বারিস্তার সাথে সামান্য কথা বলার মতো ছোট সংযোগ তৈরি করা।"
আজকের তরুণ প্রজন্ম বা 'জেন জি' আগের প্রজন্মগুলোর চেয়ে অনেক বেশি তথ্য-প্রমাণভিত্তিক। সান্তোস বলেন, "তাদের কোনো উপদেশ না দিয়ে তথ্য-উপাত্ত দেখালে, তারা তা বিবেচনা করে।"
তিনি শেষে বলেন, "সুখী হতে হলে চেষ্টা করতে হয়। এটি একবারে হয়ে যাওয়ার মতো বিষয় নয়। তবে সুসংবাদ হলো, আপনি যদি চেষ্টা করেন, তবে শেষ পর্যন্ত ভালো অনুভব করবেনই।"
অনুবাদ: নাফিসা ইসলাম মেঘা
