মিয়ানমারে নির্বাচনী ভিন্নমত দমনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান, বিরোধীদের ভোট বয়কটের ডাক
চলতি বছরের ডিসেম্বরে নির্ধারিত নির্বাচনের আগে বিরোধিতাকারীদের দমন করতে কড়া নির্বাচনী আইন প্রণয়ন করেছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। এই আইনে গুরুতর অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
পাঁচ মাস পর অনুষ্ঠেয় নির্বাচন সামনে রেখে মঙ্গলবার এই নতুন আইনটি প্রণীত হয়। এর আগে ইয়াঙ্গুনসহ জান্তা-নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় সামরিক সমর্থক ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে একাধিক উচ্চপর্যায়ের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়ে গেছে।
নতুন আইনে নির্বাচনী কার্যক্রমে বাধা দিলে ৩ থেকে ৫ বছর, ভোটকেন্দ্র বা ব্যালট বাক্সে ভাঙচুর চালালে ৫ থেকে ১০ বছর (দলবদ্ধভাবে করলে যাবজ্জীবন), নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কাউকে গুরুতর আহত করলে ১০ থেকে ২০ বছর এবং মৃত্যু ঘটলে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন আইনটি জান্তার নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং সমালোচনাকারীদের দমন করতেই আনা হয়েছে।
নির্বাচনী নিরাপত্তা তদারকির জন্য গঠিত একটি কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্ব দেবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। উপদেষ্টা হিসেবে থাকবেন প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী এবং সচিব হবেন জাতীয় পুলিশপ্রধান। এ কমিটি নির্বাচনে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থার কার্যক্রম নজরে রাখবে, নির্বাচন ব্যাহত করতে চাওয়াদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে এবং স্থানীয় কমিটি গঠন করবে।
নির্বাচিত প্রার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী ও নির্বাচনী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে পুলিশ।
সমালোচকরা বলছেন, নতুন এই আইনটি প্রাক্তন জান্তা নেতা থান শোয়ের সময়কার এক আইনের মতোই, যা তথাকথিত 'ন্যাশনাল কনভেনশন' নিয়ে প্রশ্ন তোলা নিষিদ্ধ করেছিল। সেই আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল ২০ বছরের কারাদণ্ড।
তবে মিন অং হ্লাইং এবার শাস্তি বাড়িয়ে দিয়েছেন যাবজ্জীবন কিংবা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত।
যেখানে সরকার বলছে, এই আইন শান্তিপূর্ণ ও সফল নির্বাচন নিশ্চিত করবে, বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে প্রতিবাদ দমন করতেই এটি প্রণয়ন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারের জনগণের বড় অংশই জান্তার নির্ধারিত এই নির্বাচনের বিরুদ্ধে।
'নির্বাচন সুরক্ষা আইন'-এর পাশাপাশি জান্তা সরকার নিম্নকক্ষ, উচ্চকক্ষ এবং আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক সংসদের নির্বাচন সংক্রান্ত বিধানেও পরিবর্তন এনেছে। সোমবার 'রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন'-এ দ্বিতীয় সংশোধনীও যুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে, বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে মিয়ানমারে জারি থাকা জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং। তিনি ডিসেম্বরের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশও দিয়েছেন। তবে জান্তা বিরোধী গোষ্ঠীগুলো ইতোমধ্যে এ নির্বাচনের বিরুদ্ধে বয়কটের ডাক দিয়েছে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর থেকে মিয়ানমারে সেনা সরকার টানা জরুরি অবস্থা জারি রেখেছিল। এতে দেশটিতে ব্যাপক সহিংসতা ও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, যাতে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে থাকা সু চির সরকারের এক সাবেক সংসদ সদস্যও এএফপিকে নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।
