জেন বারকিনের প্রথম হারমেস ব্যাগ নিলামে বিক্রি হলো ১০ মিলিয়ন ডলারে
চামড়ার রং খানিক ম্লান, কোথাও দাগ তবু এই কালো ব্যাগটিই হয়ে উঠলো ইতিহাস। ব্রিটিশ অভিনেত্রী ও গায়িকা জেন বারকিনের জন্য তৈরি প্রথম হারমেস বারকিন ব্যাগটি সম্প্রতি নিলামে বিক্রি হয়েছে প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার বা ১২১ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকায় , যা এখন পর্যন্ত নিলামে বিক্রি হওয়া সবচেয়ে দামী হ্যান্ডব্যাগ।
এই ব্যাগটি ছিল জেন বারকিনের প্রতিদিনের সঙ্গী ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত। সেসময় এটি হয়ে ওঠে বিলাসিতার প্রতীক। ব্যাগটির নকশা করা হয়েছিল ঠিক তার জন্যই, আর সেই থেকেই জন্ম নেয় 'বারকিন ব্যাগ' নামক এক ফ্যাশন আইকনের।
নিলামটি আয়োজন করেছিল আন্তর্জাতিক নিলাম সংস্থা সথবিজ, যেখানে বিলাসবহুল ফ্যাশনসামগ্রী নিলা্মে তোলা হচ্ছিল, এর মধ্যে ছিল আলেকজান্ডার ম্যাককুইন ও ক্রিশ্চিয়ান ডিওরের নকশাও।
নিলামের আগে থেকেই আগ্রহী সংগ্রাহকদের দর হাঁকাতে দেখা যায় ১ মিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত, যা ভেঙে দেয় আগের সব রেকর্ড। নিলামের সরাসরি সম্প্রচারে যখন দাম বাড়তে শুরু করে, তখনই দর্শকদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়। ১০ মিনিট ধরে ৯ জন সংগ্রাহকের মাঝে চলা তুমুল দর কষাকষির শেষে ব্যাগটি কিনে নেন জাপানের এক ব্যক্তিগত সংগ্রাহক।
সথবিজের হ্যান্ডব্যাগ ও অ্যাক্সেসরিজ বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান মর্গান হালিমি এই বিক্রিকে বলেছেন ফ্যাশন ও বিলাসবহুলতার ইতিহাসে এক 'গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক'। এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, "এটি দেখায়, একজন কিংবদন্তি কিভাবে মানুষের মনে আকর্ষণ তৈরি করতে পারে এবং কীভাবে এর সঙ্গে জড়িত ইতিহাস সংগ্রাহকদের আগ্রহ ও আবেগ জাগাতে পারে । প্রথম বারকিন ব্যাগ বিক্রি হওয়াটা জেন বারকিনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব আর জনপ্রিয়তাকেই যেন উদযাপন করে।"
কোনো হীরা খচিত বা সোনায় মোড়া না থাকলেও এই ব্যাগটি ভেঙেছে আগের সব রেকর্ড। ২০২২ সালে সথবিজ একটি হোয়াইট-ডায়মন্ড খচিত 'ডায়মন্ড হিমালয়া বারকিন' বিক্রি করেছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার ডলারে। ২০২১ সালে ক্রিস্টিজ নিলামে এক কুমির-চর্মের বারকিন বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারে। এত কিছুর পরও, সব কিছুকে পেছনে ফেলে দিলো জেন বারকিনের পুরনো, একটু জীর্ণ কালো চামড়ার এই ব্যাগটি।
এমনকি আগের সবচেয়ে দামী ব্যাগ, ডায়মন্ড আর কুমির-চর্মে তৈরি 'কেলি ব্যাগ'-এরও মূল্য ছিল ৫ লাখ ১৩ হাজার ডলার, যেটাকেও টপকে গেল প্রথম 'বারকিন'।
জেন বারকিন ১৯৯৪ সালে এই ব্যাগটি বিক্রি করেছিলেন এইডস গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে। এরপর ব্যাগটি একাধিক ব্যক্তির হাতে গেলেও, এটি আবার জনসম্মুখে দেখা গেছে নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্ট এবং লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে প্রদর্শনীতে।
সর্বশেষ এই ব্যাগটি বিক্রি করেন 'ক্যাথরিন বি.' নামের এক সংগ্রাহক, যিনি ২৫ বছর আগে এটি নিলামে কিনেছিলেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, "এই নিলাম যেন আমাকে আমার নিজের বিডিং যুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দিলো… সেই বিজয়ের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।"
২০২৩ সালে ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যুর আগে জেন বারকিন এক সাক্ষাৎকারে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, "আমি মারা গেলে মানুষ হয়তো কেবল ব্যাগটার কথাই মনে রাখবে।"
এই ব্যাগটিরও নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা পরবর্তী বারকিন ব্যাগগুলোতে আর দেখা যায়নি। যেমন ব্যাগের সাইজ, হ্যান্ডল ও ধাতব রিংয়ের ডিজাইন, এমনকি ব্যাগটির কাঁধে ঝোলানো ছিল ছোট একজোড়া নখ কাটার যন্ত্র—কারণ বারকিন সবসময় তার নখ ছোট রাখতে ভালোবাসতেন।
ব্যাগের সামনে ছিল তার নামের আদ্যক্ষর 'জে.বি.' আর ব্যাগের গায়ে এখনও রয়ে গেছে তার ব্যক্তিজীবনের ছাপ—যেমন মলিন হয়ে যাওয়া 'মেডসাঁ দু মন্ড' ও 'ইউনিসেফ'-এর স্টিকার।
এই ব্যাগের জন্মের পিছনেও রয়েছে গল্প। হার্মেসের প্রাক্তন চেয়ারম্যান জঁ-লুই দ্যুমা ১৯৮৪ সালে প্যারিস থেকে লন্ডনের ফ্লাইটে বারকিনের পাশে বসছিলেন। বারকিন বলেছিলেন, তিনি এমন কোনো ব্যাগ খুঁজে পান না যেখানে তার তিন সন্তানের সব জিনিস রাখা যায়, তাই বাধ্য হয়ে তিনি একটি বড়ো ঝুড়ি নিয়ে চলাফেরা করেন যেটি ওই ফ্লাইটেই দ্যুমার ওপর পড়ে যায়!
সে সময় তিনি দ্যুমাকে বলেন, "আমি চাই আমার স্যুটকেসের অর্ধেক সাইজের একটা ব্যাগ।" দ্যুমা হেসে বলেছিলেন, "তাহলে এঁকে ফেলুন।" বারকিন তখন বিমানের বমির জন্য রাখা ব্যাগেই ডিজাইন এঁকে দেন।
১৯৮৫ সালে হার্মেস তাকে ব্যাগটি উপহার দেয়, এবং পরে তার জন্য আরও চারটি ব্যাগ তৈরি করে। বারকিন এই ব্যাগের রয়্যালটি পেতেন, কিন্তু প্রতিবছর সেটি দান করে দিতেন বিভিন্ন চ্যারিটিতে।
সথবিজের হ্যান্ডব্যাগ প্রধান মর্গান হালিমি বলেন, "হারমেস প্রথমে এই ব্যাগটি ডিজাইন করেছিল কেবল ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটাতে। কিন্তু সেটিই আজ হয়ে উঠেছে ইতিহাসের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ব্যাগ। এর চাহিদা আগামী বহু বছরেও শেষ হবে না।"
অনুবাদ : নাফিসা ইসলাম মেঘা