‘আমি চাই না আমার সুন্দর তেহরান গাজা হয়ে যাক’: ইসরায়েলি হামলায় আতঙ্কিত, বিহ্বল ইরানিরা
তেল ও রুটির দোকানে লম্বা লাইন, রাজধানী থেকে পালাতে গাড়ির দীর্ঘ সারি, আর রাতে ভয়াবহ নিদ্রাহীনতা–শুক্রবার ভোরে ইসরায়েলের আকস্মিক হামলায় এখনও হতবাক তেহরানের বাসিন্দাদের দিন কাটছে ভয় ও দ্বিধার মধ্যে।
ইরানের ২১ বছর বয়সি শিক্ষার্থী দনিয়া (ছদ্মনাম) বিবিসিকে বলেন, 'আমরা কয়েক রাত ঘুমাই না।' তিনি বলেন, 'সবাই পালাচ্ছে, আমি যাব না। আমার বাবা বলেন, নিজের ঘরে মরাই সম্মানের।'
অনেক ইরানির মতোই দনিয়া এখন যুদ্ধের মধ্যে আটকে আছেন, যেটি তার অপছন্দের শাসন ব্যবস্থা আর ইসরায়েলের মধ্যে চলছে।
গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ তিনি টিভিতে দেখেছেন। তিনি বলেন, 'আমি সত্যিই চাই না আমার সুন্দর তেহরান গাজা হয়ে যাক।'
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন ইরানের জনগণকে তাদের ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান, তখন একজন ইরানি নারীর জবাব ছিল সোজাসাপ্টা।
তিনি বলেন, 'আমরা চাই না ইসরায়েল এসে আমাদের বাঁচাক। কোনো বিদেশি দেশ কখনোই ইরানের কথা ভাবে না। আমরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রও চাই না।'
আরেক নারী বলেন, প্রথমে যখন তিনি দেখলেন ইসরায়েল ইরানের শক্তিশালী সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যা করেছে, তখন এক ধরনের 'অদ্ভুত উত্তেজনা' অনুভব করেছিলেন। তিনি ভাবতেন, তারা যেন চিরদিন বেঁচে থাকবে।
তিনি বিবিসিকে বলেন, 'হঠাৎ করে সেই ক্ষমতার ছবিটা ভেঙে গেল। 'কিন্তু পরদিন যখন শুনলাম সাধারণ মানুষও মারা গেছে—যাদের আমি চিনি না, যাদের অনেকেই আমার মতোই—তখন বুকের ভেতরে কষ্ট, ভয় আর দুঃখ ভর করে।'
তিনি বলেন, যখন তিনি শুনলেন ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রেও হামলা হয়েছে, তখন তার সেই দুঃখ রূপ নেয় ক্ষোভে। মনে হতে থাকে, ইসরায়েল যেন ইরানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে চায়।
এই প্রথমবারের মতো তিনি মৃত্যুর জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে শুরু করেছেন।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বলেছে, শুক্রবার থেকে এখন পর্যন্ত ২২০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের অনেকেই নারী ও শিশু।
অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, একই সময়ের মধ্যে ইরানে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে তাদের অন্তত ২৪ জন নাগরিক নিহত হয়েছে।
ইসরায়েলের মতো ইরানে যেমন হামলার আগাম সতর্কতা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই, তেমনি নেই কোনো আশ্রয়কেন্দ্র—যেখানে মানুষ দৌড়ে আশ্রয় নিতে পারবে।
মাঝে মাঝেই আকাশ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পড়ে। এর মধ্যে তেহরানে গাড়িবোমা হামলার খবর ইসরায়েলি ও ইরানি—দুই গণমাধ্যমেই এসেছে, যা আতঙ্ক আর বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সরকার সমর্থক অনেক মানুষও নাকি ক্ষুব্ধ—কারণ, যে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এত গর্ব করা হতো, সেটাই এখন একেবারে দুর্বল দেখাচ্ছে।আর সাধারণ অনেক ইরানির মধ্যেই সরকারের প্রতি রয়েছে গভীর অবিশ্বাস।
দনিয়া আগে মাথা না ঢেকে রাস্তায় বের হয়ে সরকারের পোশাকবিধি অমান্য করতেন। এখন পরীক্ষা পিছিয়ে যাওয়ায় তিনি বাসায়ই আছেন।
তিনি বলেন, 'রাতে খুব ভয় লাগে। ঘুমানোর আগে কিছু ঘুমের ওষুধ খাই যাতে একটু শান্তি পাই।'
ইরানি সরকার মানুষকে মসজিদ বা মেট্রো স্টেশনে গিয়ে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা কঠিন, কারণ কখন কোথা থেকে বিস্ফোরণ হবে, সেটা বোঝাই যায় না।
বিবিসিকে এক তরুণী বলেন, 'তেহরান এত বড় শহর, কিন্তু প্রায় প্রতিটি এলাকায়ই কোনো না কোনোভাবে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'এখন আমরা ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর দেখি আর যেসব বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়ের এলাকায় হামলা হয়েছে, তাদের ফোন করে খোঁজ নিই—ওরা বেঁচে আছে কি না।'
তিনি ও তার পরিবার এখন নিজেদের বাড়ি ছেড়ে এমন এক এলাকায় চলে গেছেন, যেখানে কোনো সরকারি ভবন নেই।
তবু, ইরানের মতো দেশে কে আপনার পাশে বাস করছে, তা কখনোই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
একজন ইরানি নারী বিবিসিকে বলেন, ইসরায়েলের হামলা ইরানিদের ভেতরে দ্বিধাবিভক্তি তৈরি করেছে—কেউ কেউ সরকারপক্ষের ক্ষয়ক্ষতিতে খুশি, আবার অনেকেই ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ায় ক্ষুব্ধ।
তিনি বলেন, অনেক ইরানিই তাদের মত বদলাচ্ছেন, এমনকি পরিবারগুলোর ভেতরেও তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
'এই পরিস্থিতি যেন টাইটানিক বরফের সাথে ধাক্কা খাওয়ার পরের প্রথম ঘণ্টাগুলোর মতো,' বলেন তিনি। 'কেউ পালানোর চেষ্টা করছিল, কেউ বলছিল এটা কোনো ব্যাপারই না, আর কেউ নাচছিল।'
তিনি জানান, সব সময়ই ইরানের ধর্মীয় শাসকদের বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু এখন নেতানিয়াহু তার দেশের ওপর যা করছেন, সেটাকে 'অমার্জনীয়' বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, 'যারা হামলা সমর্থন করেছেন বা করেননি, সবার জীবনই এখন একেবারে বদলে গেছে। এখন বেশিরভাগ ইরানি বুঝে গেছেন, স্বাধীনতা আর মানবাধিকার আসে না ইসরায়েলের বোমায়, যেগুলো পড়ে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের শহরে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা বেশিরভাগই এখন ভীষণ ভয় আর দুশ্চিন্তায় আছি। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে কী করব, সে জন্য প্রাথমিক চিকিৎসার জিনিস, খাবার আর পানি ব্যাগে ভরে রেখেছি।'
ইসরায়েল জানিয়েছে, ইরানের সামরিক বাহিনী সাধারণ মানুষের আবাসিক এলাকাতেই অস্ত্র ও কমান্ড সেন্টার রেখেছে ইচ্ছা করে।
বিদেশে থাকা বহু ইরানিও এই পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন।
লিডসে থাকা নারী অধিকারকর্মী ও গবেষক দোরেহ খাতিবি-হিল ইরানে থাকা পরিবার, বন্ধু ও সরকারবিরোধী কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। তিনি বলেন, 'এই মুহূর্তে ইরানি হওয়া কেমন, সেটা বোঝানো খুব কঠিন।'
তিনি বলেন, 'যারা মানুষ হত্যা ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত, সেই সরকারের লোকজন মারা যাচ্ছে দেখে অনেকে খুশি। কিন্তু আমরা জানি, সাধারণ মানুষও মরছে। এটা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।'
খাতিবি-হিল বলেন, ইরানিদের সঠিক খবরও জানানো হচ্ছে না। তিনি বলেন, 'যিনি ইরানে সবার ওপরে, সেই সর্বোচ্চ নেতা এখনো নিরাপদে আছেন—আর সাধারণ মানুষ প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমরা কেউই চাই না, ইরাক, সিরিয়া বা আফগানিস্তানের মতো হয়ে যাক ইরান। আমরা এই যুদ্ধ চাই না, আবার এই শাসকদেরও চাই না।'
