যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা: ইউক্রেন যত বলছে, রাশিয়ার তত বিমান ধ্বংস হয়নি
মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, ইউক্রেনের সাম্প্রতিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার অন্তত ২০টি যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১০টি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। তবে এই সংখ্যা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দাবি করা সংখ্যার প্রায় অর্ধেক—রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তা।
তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও, হামলাটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তাদের একজন সতর্ক করে বলেন, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান যুদ্ধে কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া আলোচনার প্রস্তাবে মস্কো আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় বুধবার টেলিফোনে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানান, এ হামলার জবাব দিতেই হবে। ট্রাম্প পরে এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে বিষয়টি উল্লেখ করেন।
পোস্টে ট্রাম্প আরও বলেন, 'এটি একটি ভালো আলোচনা হয়েছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে শান্তির পথে অগ্রসর হওয়ার মতো আলোচনা নয়।'
ইউক্রেন জানায়, 'স্পাইডার্স ওয়েব' কোডনামে পরিচালিত এই অভিযানে তারা মোট ১১৭টি ড্রোন ব্যবহার করেছে, যেগুলো কন্টেইনার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় এবং রাশিয়ার চারটি বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করে।
বুধবার ইউক্রেন হামলার কিছু ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার কৌশলগত বোমারু বিমানগুলোতে আঘাত করছে এবং দুটি এ-৫০ সামরিক গুপ্তচর বিমানের অ্যান্টেনায় আছড়ে পড়ছে। উল্লেখ্য, রাশিয়ার বহরে এ ধরনের বিমানের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত।
দুই মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, এই হামলায় আনুমানিক ১০টি যুদ্ধবিমান সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে এবং মোট ২০টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই হিসাব ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বক্তব্যের তুলনায় অনেকটাই কম। কিয়েভে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ইউক্রেন ৪১টি রুশ বিমানে হামলা চালিয়েছে এবং তার মতে, এর মধ্যে অর্ধেক এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলো আর মেরামতযোগ্য নয়।
রয়টার্স স্বাধীনভাবে কিয়েভ বা যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এই সংখ্যাগুলোর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
এদিকে, রাশিয়া—যারা নিজেদের পারমাণবিক শক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখে—হামলার পর বুধবার কিয়েভকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে বৈশ্বিক পারমাণবিক অস্ত্রের প্রায় ৮৮ শতাংশের মালিক।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, হামলার আগে ইউক্রেন এ সম্পর্কে তাদের কিছু জানায়নি।
ট্রাম্প গত প্রায় চার মাস ধরে ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বারবার বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ এ সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি চান তিনি। কিন্তু বাস্তবে সংঘাত বরং আরও তীব্র হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের দূতাবাসগুলোও এই বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
ঝুঁকি বাড়ছে
ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউ জানিয়েছে, অভিযানের ফলে রাশিয়ার প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে এবং রাশিয়ার প্রধান একটি বিমানঘাঁটিতে থাকা কৌশলগত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যানগুলোর ৩৪ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হামলার পর উপগ্রহ থেকে তোলা বাণিজ্যিক চিত্র দেখে বিশ্লেষকেরা বলেছেন, রাশিয়ার টিইউ-৯৫ ভারী বোমারু বিমান এবং টিইউ-২২ ব্যাকফায়ার সুপারসনিক কৌশলগত বোমারু বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাশিয়া এসব বিমান ইউক্রেনের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য ব্যবহার করে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে, ইউক্রেন মুরমানস্ক, ইরকুটস্ক, ইভানোভো, রিয়াজান ও আমুর অঞ্চলের বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, শেষের তিনটি স্থানে হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। অন্যদিকে, মুরমানস্ক ও ইরকুটস্কে কয়েকটি বিমান আগুনে পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছে তারা।
গত কয়েক মাস ধরে রাশিয়ার চালানো ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি ইউক্রেনীয় যুদ্ধক্ষেত্রের চাপে পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল কিয়েভ। এই হামলা ইউক্রেনীয় মনোবলকে আরও চাঙা করেছে।
এতে আবারও প্রতীয়মান হলো, কিয়েভ এখনো রাশিয়ান আগ্রাসন প্রতিরোধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং প্রয়োজনে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ৪ হাজার ৩০০ কিলোমিটার (২ হাজার ৬৭০ মাইল) দূরেও পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে—যা মস্কোকে অপ্রস্তুত করে দিতে পারে।
এ হামলার পর রাশিয়ার প্রভাবশালী সামরিক ব্লগাররা রুশ কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে মহাকাশ কমান্ডকে দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ, পারমাণবিক অস্ত্রবাহী বোমারু বিমানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু হওয়ার সুযোগ দিয়ে কর্তৃপক্ষ অবহেলা ও আত্মতুষ্টির পরিচয় দিয়েছে।
ট্রাম্পের ইউক্রেন বিষয়ক উপদেষ্টা কিথ কেলগ এ প্রসঙ্গে বলেন, এই হামলা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ঝুঁকির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, ইউক্রেন এবার রাশিয়ার 'নিউক্লিয়ার ট্রায়াড'—অর্থাৎ স্থল, আকাশ ও সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থার ওপরও হামলা চালিয়েছে।
