ধর্ম, বাণিজ্য আর ঐতিহ্য: মুম্বাইয়ের জাদুঘরে হারিয়ে যেতে বসা পারসি জগতের এক ঝলক
পারসিদের ধর্ম জরাথুস্ত্রবাদ ও তাদের অগ্নিমন্দির ঘিরে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের যেন শেষ নেই। দীর্ঘদিন ধরেই এই ধর্মাবলম্বীদের আচার, বিশ্বাস ও রীতিনীতির প্রতি এক ধরণের রহস্যময় আগ্রহ গড়ে ওঠার কারণ, তাদের অগ্নিমন্দিরে অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। খবর বিবিসি'র
তবে কেমন হয় যদি মন্দিরের অনুরূপ একটি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে কোন ধর্মীয় আঘাত ছাড়াই জরাথুস্ত্রবাদ সকলের সামনে উপস্থাপন করা যায়?
এই চাহিদাকেই সামনে রেখে মুম্বাইয়ের দক্ষিণে, এক নিরিবিলি গলিতে ঠিক এমনই একটি জায়গা রয়েছে—'ফ্রামজি দাদাভয় আলপাইওয়ালা জাদুঘর'। পারসি জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে তৈরি এই জাদুঘর যেন এক জীবন্ত দলিল।
সম্প্রতি আধুনিকায়নের পর নতুন রূপে খুলে দেওয়া হয়েছে এই জাদুঘরটি। পুরনো নথিপত্র থেকে শুরু করে পারসিদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক-আশাক, দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র, শিল্পকর্ম—সবকিছুই সাজিয়ে রাখা হয়েছে নিখুঁত যত্নে।
বর্তমানে পারসি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়। তাদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ইরানের বাসিন্দা—যারা শত শত বছর আগে ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচতে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেই অভিবাসনের মানচিত্র ও নিদর্শনও জাদুঘরে রয়েছে।
ভারতের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে পারসিদের অবদান থাকা সত্ত্বেও, তাদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জ্ঞান এখনও বেশ সীমিত।
জাদুঘরটির রক্ষনাবেক্ষক কেরমান ফাতাকিয়া জানান, 'সম্প্রতি সংস্কার করা এই জাদুঘরটি বিরল ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো তুলে ধরে পারসি সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে চায়।'
মন্দিরের বাইরের অংশ ডিজাইন করা হয়েছে মুম্বাইয়ের বলার্ড এস্টেটে বাজার গেট স্ট্রিটে অবস্থিত দ্বিতীয় প্রাচীনতম অগ্নিমন্দির 'ম্যানেকজি স্যাট আগিয়ারি'র অনুকরণে।
আর অভ্যন্তরীণ কক্ষটি তৈরি করা হয়েছে প্রিন্সেস স্ট্রিটের মেরিন লাইন্সে থাকা 'অঞ্জুমান আতাশ বহরাম' মন্দিরের আদলে।
দর্শনার্থীরা যেন প্রকৃত অভিজ্ঞতা পান, সেজন্য সেখানে প্রার্থনার রেকর্ডকৃত পাঠও পরিবেশিত হয়।
জাদুঘরের প্রদর্শনীগুলোর মধ্যে রয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার সালের সময়কার খিলানলিপিযুক্ত ইট, পোড়ামাটির পাত্র, প্রাচীন মুদ্রা ও নানা পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন—যেগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে ব্যাবিলন, মেসোপটেমিয়া, সুসা ও ইরান থেকে।
এছাড়া জাদুঘরে রয়েছে ইরানের কেন্দ্রীয় শহর ইয়াজদ থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন নিদর্শন। ইয়াজদ একসময় ছিল বিরান মরুভূমি। সপ্তম শতকে আরব আগ্রাসনের পরে অন্য অঞ্চল থেকে বিতাড়িত জরাস্ত্রুবাদীরা এখানে এসে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন।
জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রদর্শনী হলো কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা 'সাইরাস সিলিন্ডার'-এর প্রতিরূপ, যাকে বিশ্বের প্রথম মানবাধিকার সনদ বলা হয়। পাশাপাশি আছে চীন ও ইউরোপীয় প্রভাবযুক্ত ঐতিহ্যবাহী পারসি গারারা শাড়ি, যেগুলো ১৯শ শতকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পারসিদের সম্পৃক্ততার সাক্ষ্য বহন করে।
এছাড়াও রয়েছে 'টাওয়ার অব সাইলেন্স' বা 'দাখমা' এবং একটি পারসি অগ্নিমন্দিরের পূর্ণাকৃতি প্রতিরূপ।
'টাওয়ার অব সাইলেন্স' হলো একটি পবিত্র স্থান, যেখানে পারসিরা মৃতদেহ প্রকৃতির হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য রেখে আসে—না কবর দেওয়া হয়, না করা হয় দাহ ।
ফাতাকিয়া বলেন, 'প্রকৃত দাখমায় প্রবেশের অনুমতি সবার থাকে না। তাই মৃতদেহ দাখমায় রাখার পর কী ঘটে এই প্রতিরূপে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। '
জাদুঘরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্যালারিতে আছে পারসিদের সংগ্রহগুলোর নিদর্শন। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে চীনসহ নানা দেশে চা, সিল্ক, তুলা এবং বিশেষভাবে আফিম বাণিজ্যের মাধ্যমে পারসিরা বিত্তবান হয়ে ওঠেন।
সম্প্রতি জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের জন্য সেগুলো আরও আকর্ষণীয় ও বোধগম্য হওয়ার জন্য তাদের প্রদর্শনীগুলো নতুনভাবে সাজিয়েছে। বর্তমানে বিবরণী ইংরেজি ও হিন্দিতে দেওয়া হলেও, প্রতিবন্ধী ও স্থানীয় দর্শনার্থীদের কথা মাথায় রেখে ভবিষ্যতে মারাঠি ও ব্রেইল ভাষায় অনুবাদেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার লক্ষ্যে জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের সহায়তার জন্য নতুন রক্ষনাবেক্ষক ও গাইড নিয়োগেরও পরিকল্পনা করছে।
ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ভবনের প্রথম তলায় পারসি ঐতিহ্য ও ইতিহাসভিত্তিক নানা কর্মশালা ও অনুষ্ঠান আয়োজন করবে। এরই অংশ হিসেবে সামনে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে পারসি নারীদের অবদান ও উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করা হবে।
ফাতাকিয়া বলেন, 'ছোট্ট একটি জাদুঘর, কিন্তু ইতিহাসে ভরপুর। শুধু মুম্বাই বা ভারতের বাসিন্দাদের জন্যই নয়, বরং সারা বিশ্বের মানুষ পারসি সম্প্রদায় সম্পর্কে জানার জন্য এই জাদুঘরটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।'
