এভারেস্টে সরঞ্জাম পৌঁছে দেবে ড্রোন, বদলে যেতে পারে পর্বতারোহণের ধারা
স্বচ্ছ শুভ্র তুষারে ঢাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু জায়গাটি। এরমধ্যেই বিশালাকৃতির শিলা পর্বতের গায়ে বিরাজ করছে এক নিরবচ্ছিন্ন নিরবতা। হঠাৎই উঁচু জায়গা থেকে একটি মই ভেঙে পড়ার শব্দে নিমেষেই ভেঙে গেল সেই নিরবতা।
এভারেস্টের বেস ক্যাম্পে বসে সেই নিরবতাই উপভোগ করছিলেন মিলান পান্ডে। এভারেস্টের এমন সৌন্দর্য দেখার সৌভাগ্য হয় গুটি কয়েক মানুষেরই। পান্ডে কোনো ক্র্যাম্পন ও বরফ কুড়াল ছাড়াই সেখানে পৌঁছে গেছেন।
মিলান পান্ডে পেশায় একজন ড্রোন পাইলট এবং তার কাজ হয়ত পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতটিতে আরোহনের চিত্র চিরকালের জন্য পরিবর্তন করে দিতে পারে।
পান্ডে এখন মই, দড়ি এবং অক্সিজেন সিলিন্ডার ড্রোনের মাধ্যমে শেরপাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। এছাড়া বেস ক্যাম্প ও ক্যাম্প ওয়ানের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত খুম্বু আইসফলের ডাক্তারদের কাছেও প্রয়োজনীয় জিনিস পাঠাতে পারেন পান্ডে।
বিশেষজ্ঞ শেরপারা সাত দশক ধরে এভারেস্টে পর্বতারোহীদের জন্য পথ নির্ধারণ ও তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে আসছেন। এয়ারলিফ্ট টেকনোলজিতে কর্মরত পান্ডে বিশ্বাস করেন যে, ড্রোন চালনায় তার প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও শেরপাদের দশকব্যাপী পর্বতারোহণের জ্ঞান একত্র করা হলে পৃথিবীর ছাদকে আরও বেশি নিরাপদ করা যাবে।
বেস ক্যাম্প সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,৩৬৪ মিটার (১৭,৫৯৮ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত এবং ক্যাম্প ওয়ান ৬,০৬৫ মিটার (১৯,৯০০ ফুট) উচ্চতায়।
দুই পয়েন্টের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ১.৮ মাইল। শেরপাদের এই যাত্রাটি করতে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগে, কিন্তু একটি ড্রোন প্রায় ছয় থেকে সাত মিনিটে এটি সম্পন্ন করতে পারে।
ইম্যাজিন নেপাল সংস্থার শেরপা মিংমা জি ২০২৩ সালে একটি তুষারধসের তিন বন্ধু এবং পর্বত গাইডকে হারান। এ ঘটনার পর থেকে তিনি এমনি একটি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
মিংমা জি বলেন, "পর্বতে পথ চিহ্নিত করতে এবং পরবর্তীতে যন্ত্রপাতি নিয়ে আসতে প্রায় ২০ বারের মতো উঠানামা করতে হয়। আমি শুনেছিলাম, চীনে এমন কাজে তারা ড্রোন ব্যবহারে করে। তাই আমি ভাবতে লাগলাম এখানে কেন নয়?"
এয়ারলিফট নেপালের সিইও রাজ বিক্রম খুম্বু পৌরসভায় এভারেস্টের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরির জন্য ড্রোন ব্যবহার করছিলেন। সেসময় সে অঞ্চলের মেয়র তাকে জিজ্ঞেস করেন এসব ড্রোন কতটা ওজন বহন করতে পারে। এরপর ২০২৪ সালের এপ্রিলে চীনের ডিজেআই কোম্পানির দেওয়া দুটি ড্রোন নিয়ে পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করে এয়ারলিফট।
বিক্রম বলেন, "এটি আমাদের প্রথম এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে প্রথম পরীক্ষামূলক অভিযান হওয়ায় আমরা এর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দিহান ছিলাম। কারণ এমন উচ্চতায় ও ঠাণ্ডায় ড্রোনগুলো ঠিকঠাক কাজ করবে কিনা আমরা নিশ্চিত ছিলাম না।"
তিনি আরও বলেন, দৃশ্যমানতা ও বাতাসের গতিবেগ ছিল আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ভৌগোলিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খেতেই আমাদের এক মাস সময় লেগেছিল।
এয়ারলিফট নেপাল প্রথম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে একটি ড্রোন ব্যবহার করে ক্যাম্প ওয়ান থেকে বেস ক্যাম্প পর্যন্ত প্রায় ১,১০০ পাউন্ড আবর্জনা নামিয়ে আনে।
এর জন্য ৪০ বারের বেশি ড্রোন ওড়াতে হয়েছিল। ড্রোনটি প্রায় ৬৬ পাউন্ড ওজন বহন করতে পারে, তবে নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা একবারে প্রায় ৪৪ পাউন্ড করে পরিবহণ করে।
২০২৫ সালের এভারেস্ট পর্বতারোহণ মৌসুমের জন্য পান্ডে বলেন, এয়ারলিফট টেকনোলজি মৌসুম শুরুর আগে শেরপাদের সরঞ্জাম পরিবহনে সহায়তা করবে এবং মৌসুম শুরু হলে আবর্জনা সরিয়ে নেবে।
শেরপারা পাণ্ডেকে জানান, কোন দিকে যেতে হবে, তারপর পান্ডে একটি ছোট ড্রোন উড়িয়ে পথনির্দেশনা দেন। এরপর শেরপারা আগের মতোই কাজ করেন — তারা চড়ে যান বিপজ্জনক আইসফল অঞ্চলে, যা বরফাবৃত পথের সবচেয়ে কঠিন ও বিপজ্জনক অংশ।
পান্ডে ব্যাখ্যা করে বলেন, "শেরপারা পথ দেখে কোথায় একটি সিঁড়ি লাগবে, কোথায় দড়ি লাগবে তা ওয়াকিটকির মাধ্যমে জানিয়ে দেন। আর আমরা সে অনুযায়ী তাদের সরঞ্জাম পাঠিয়ে দেই।"
তিনি জানান, এসব ড্রোন ব্যবহার করে অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ওষুধের মতো জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামও পাঠানো সম্ভব।
পরিসর সম্প্রসারণ
এয়ারলিফটের বর্তমানে দুটি ডিজেআই ড্রোন রয়েছে। এর মধ্যে এ বছর শুধু একটি এভারেস্টে ব্যবহার করা হচ্ছে। দ্বিতীয়টি ব্যাকআপ হিসেবে রাখা হয়েছে। তবে প্রয়োজনে দুটো ড্রোনই ব্যবহার করা হবে।
তবে এসবের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থ। প্রতিটি ড্রোনের দাম ৭০,০০০ ডলার এবং অভিযান শুরুর আগেই শুধু ক্রয় করতেই ব্যয় হয় এতো ডলার।
বিক্রম বলেন, "বেস ক্যাম্পে সবকিছুই খুব ব্যয়বহুল।"
তিনি বলেন, "যেহেতু এখানে কোনো বিদ্যুৎ নেই, তাই ব্যাটারি চার্জ করতে অনেক তেল প্রয়োজন হয়। ক্যাম্পে পৌঁছানোর খরচ, মানবশক্তির খরচ, আবাসন, খাবার সবকিছুই এখানে অনেক ব্যয়বহুল।'
বিক্রম একজন অ্যারোন্যাটিকাল ইঞ্জিনিয়ার। তবে ড্রোনের বিষয়ে তিনি বরাবর আগ্রহী ছিলেন। তিনি নেপালে এক দশক আগেই নিজেই একটি ড্রোন তৈরি করে ছিলেন। সেসময় দেশে ড্রোন ছিল হাতে গোনা। ড্রোনটি ২০১৫ সাল নেপাল ভূমিকম্পে ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
পান্ডে বলেন, "আমরা শুধু এর মাধ্যমে সরঞ্জাম সরবরাহ করছি তা নয়। অনুসন্ধান ও উদ্ধার আমাদের কাজে আগে অগ্রাধিকার পাবে। মানুষ পথ ভুল করবে আমরা তাদের অবস্থান খুঁজে বের করতে সাহায্য করতে পারি।
শেরপা সম্প্রদায়ের কিছু সদস্য বিপজ্জনক উচ্চ পর্বতগুলোতে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিদেশে ভালো চাকরি ও বেতনের জন্য চলে যাচ্ছেন।
পান্ডে বলেন, "আমরা আশা করি আমাদের ড্রোনগুলো শেরপা পেশাকে সত্যিই নিরাপদ করে তুলবে এবং আরও মানুষকে এই পর্বতারোহণের ঐতিহ্যের দিকে ফিরিয়ে আনবে। এটি আমাদের দেশের পরিচিতি এবং শেরপাদের দক্ষতা ছাড়া আমরা কখনোই এই ভূখণ্ডে চলাচল করতে পারতাম না।"
নেতার পেছনের নায়কেরা
২৮ বছর বয়সী দাওয়া জানজু শেরপা আট বছর ধরে এভারেস্টে আইসফল ডাক্তারদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করছেন। শেরপাদের দলের নেতা থাকেন একজন প্রবীণ শেরপা, যিনি বহুবছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুনদের দিক নির্দেশনা দেন। তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে প্রথমে আইসফলে যান যুবকেরা।
দাওয়া জানজু শেরপা বলেন, "এই মৌসুমে অনেক শুকনো বরফ রয়েছে, যা পথ তৈরি করাকে খুব কঠিন করে তুলবে এবং এর মাঝে অনেক বরফের টাওয়ারও আছে।
তবে এখন ড্রোন ব্যবহার করে যাত্রা শুরুর আগে একটি সম্ভাব্য পথ নির্ধারণ করা যেতে পারে। কারণ এখানকার দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পরিস্থিতি এখানে দ্রুত পরিবর্তন হয়।
জানজু শেরপা বলেন, এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। তাছাড়া অন্য জায়গায় চাকরি পাওয়া কঠিন হওয়ায় চাকরিটি তার আবেগের চেয়ে বেতনটাই মুখ্য। তবে ড্রোনগুলো সময় এবং ঝুঁকির মাত্রা অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, "আমাদের কাজ সময়সাপেক্ষ। যদি আমরা দ্রুত পথ ঠিক না করি, তবে আগত অভিযাত্রীরা বিপথগামী হবে, তাই ড্রোনের মাধ্যমে সরঞ্জাম নিয়ে আসা মানে হল যে, আমাদের শুধু সিঁড়ি নিয়ে বার বার উপর-নিচ করতে হবে না।"
তিনি আরও বলেন, "এ বছর যেমন খারাপ আবহাওয়া দেখছি, এ সহায়তা যদি না থাকতো তবে আমরা সময়মতো পথ ঠিক করতে পারতাম না।"
জানজু শেরপা তার স্ত্রী এবং দুই মেয়ের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি বলেন, "এটি একটি অ্যাডভেঞ্চারাস কাজ এবং অনেক ঝুঁকি রয়েছে, তাই যদি এটি নিরাপদ করার কোনো উপায় থাকে, আমি তাকে স্বাগত জানাই।"
প্রথম পর্বতারোহীদের একটি দল ২০২৫ সালের পর্বতারোহণ মৌসুমের জন্য ইতোমধ্যে বেস ক্যাম্পে পৌঁছেছে। এটি একটি সংকীর্ণ মৌসুম, তাই প্রায় সবাই এপ্রিল ও মে মাসে তাদের চূড়ায় আরোহণের চেষ্টা করবে।
ড্রোন ব্যবহারের কথা বলেন নিউজিল্যান্ডভিত্তিক অ্যাডভেঞ্চার কনসালট্যান্টস-এর ক্যারোলাইন ওগল। তিনি বিগত পাঁচ মৌসুমে বেস ক্যাম্পে কাটিয়ে অভিযাত্রীদের অভিযানে সহায়তা করেছেন।
তিনি বলেন, "আপনি যদি একদম শুরুর বছরগুলোর কথা চিন্তা করেন করেন দেখবেন, সেসময় কোনো স্যাটেলাইট ফোন ছিলনা, আবহাওয়ার কোনো পূর্বাভাস জানা যেত না। কিন্তু এখন এমন সব প্রযুক্তি আছে যেগুলো এ পর্বতারোহনকে নিরাপদ করেছে। আমি মনে করি ড্রোন ব্যবহারের এটি সেই প্রাকৃতিক বিবর্তনের অংশ। এটি বিশেষ করে সবচেয়ে উচ্চতায় কর্মরত শেরপাদের নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।"
পৃথিবীর সাত মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে আরোহণ করা লিসা থম্পসন বর্তমানে ইউএস ভিত্তিক আলপাইন অ্যাথলেটিকসের মাধ্যমে পর্বতারোহীদের প্রশিক্ষণ দেন, তিনি ওগলের সাথে একমত এবং ড্রোনকে "স্বাগতম ও দায়িত্বশীল বিবর্তন" হিসেবে দেখেন।
তিনি বলেন, "আমি বিশ্বাস করি না যে এই উদ্ভাবন পর্বতারোহণের দক্ষতা বা ঐতিহ্য থেকে কিছু কেড়ে নিচ্ছে। পর্বত এখনো পর্বতই। চ্যালেঞ্জ এখনো বাস্তব।"
