সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর, ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে

মিয়ানমারে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সামরিক জান্তা বাহিনী। তবে জান্তা বাহিনী বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সম্মতি ছাড়াই একতরফাভাবেই এ ঘোষণা দিয়েছে তারা।
গত শুক্রবার মিয়ানমারে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম নিশ্চিত করতেই এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় গণমাধ্যম এমআরটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল বুধবার থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত এ যুদ্ধবিরতি বলবৎ থাকবে।
মিয়ানমারের জান্তা সরকার বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো একতরফাভাবে আগেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে। তাদের এ ঘোষণার পর সামরিক বাহিনীর এ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। তবে সেনাবাহিনী সতর্ক করেছে, এখন কোনোভাবেই কারও উপর হামলা চালানো যাবে না এবং পুনরায় সংগঠিতও হওয়া যাবে না। এ নিয়ম মানা না হলে তাদের বিরুদ্ধে 'প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা' নেওয়ার হুঁশিয়ারি জানিয়েছে সামরিক বাহিনী।
গত বুধবার এমআরটিভির প্রতিবেদন অনুসারে মিয়ানমারে ভূমিকম্পে তিন হাজার তিনজন মারা গেছেন এবং সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
এদিকে প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডে ভূমিকম্পে ২২ জন মারা গেছেন। দেশটিতে অনেক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৭২ জনের মতো মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে ত্রাণ সরবরাহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেনাবাহিনী জানায়, চীনের রেড ক্রসের একটি ত্রাণের বহর সংঘাতপূর্ণ এলাকার দিকে এগুতে চাইলে, তাদের থামানোর জন্য সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলি চালায় মিয়ানমার জান্তা বাহিনী।
এ বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানায়, ঘটনার পর উদ্ধারকারী দল নিরাপদে আছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, চীন আশা করে মিয়ানমারের সব পক্ষ ও গোষ্ঠী ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিবে এবং চীনসহ অন্যান্য দেশের উদ্ধারকর্মী ও ত্রাণ সামগ্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
জান্তা সরকারের মুখপাত্র জাও মিন তুন বলেন, চীনের রেড ক্রস কর্তৃপক্ষ তাদের না জানিয়েই সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করেছে। স্থানীয় যানবাহনসহ ওই ত্রাণের বহর থামার নির্দেশ না মানলে একটি নিরাপত্তা দল সতর্কতার স্বার্থে ওই গুলি ছোড়ে।
২০২১ সালে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার নোবেল বিজয়ী অং সান সু চিকে উৎখাত করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। তবে দেশ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে জান্তাবাহিনী।
গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, অর্থনীতি ও মৌলিক সেবাসমূহ, যেমন স্বাস্থ্যসেবা, খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পুরো পরিস্থিতি দেশটিকে সঙ্কটময় অবস্থায় ফেলেছে।
জাতিসংঘ জানায়, মিয়ানমারে ছয়টি অঞ্চলে ২৮ মিলিয়ন মানুষ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ত্রাণ সহায়তার জন্য ১২ মিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে খাদ্য, বাসস্থান, পানি, স্যানিটেশন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং অন্যান্য সেবা দেওয়া হবে।
এদিকে সময় যত গড়াচ্ছে তত জীবিত মানুষ উদ্ধারের আশা তত কমে আসছে। এদিকে গতকালই মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদো-এর একটি হোটেলের ধ্বংসস্তূপ থেকে দুজন পুরুষকে জীবিত উদ্ধার ও অন্য শহরের একটি গেস্টহাউস থেকে আরও একজন পুরুষ জীবিত উদ্ধার করা হয়।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত সাগাইং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানো সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। কারণ এসব অঞ্চল সরকার বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এর আগে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সামরিক সরকারকে মানবিক সাহায্য পাঠানোর জন্য অবাধ প্রবেশাধিকার এবং ত্রাণ সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে আরোপিত বাধা অপসারণ করে দেওয়ার আহ্বান জানায়। তারা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্বাধীন গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে ত্রাণ সরবরাহের আহ্বানও জানায়।
একটি প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া ডেপুটি ডিরেক্টর ব্রায়নি লাউ বলেন, "এ দুর্যোগ মোকাবেলায় মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর ওপর নির্ভর করা যায় না। তিনি অন্যান্য দেশের সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে দেশটির সামরিক বাহিনীর উপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানান। জীবিতদের উদ্ধারে ও তাদের পুরোপুরি সহযোগিতা করতে যাতে তাদের সুযোগ দেওয়া হয় সেজন্য চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানান তিনি।"