রেমব্রান্ট থেকে পিকাসো: যেভাবে শনাক্ত করবেন ভুয়া চিত্রকর্ম
সাম্প্রতিক কিছু শিল্প জালিয়াতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রতারণামূলক শিল্পকর্মের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ডিজিটাল যুগে প্রতারণার নতুন রূপ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও, শিল্প জগতে জালিয়াতির প্রচলন বহু শতাব্দীর। সম্প্রতি, ইতালির পুলিশ বিখ্যাত শিল্পীদের নামে ভুয়া চিত্রকর্ম তৈরির একটি গোপন কর্মশালার সন্ধান পেয়েছে রোমে। সেখানে পিকাসো, রেমব্রান্টের মতো শিল্পীদের চিত্রকর্মের জাল কপি অনলাইনে বিক্রি করা হতো, এমনকি এসবের জন্য জাল সার্টিফিকেটও তৈরি করা হতো।
এদিকে, লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারির রুবেন্সের বিখ্যাত চিত্রকর্ম 'স্যামসন অ্যান্ড ডেলিলাহ' নিয়েও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, এই চিত্রকর্মটি রুবেন্সের আসল কাজ নয়। বরং তিন শতাব্দী পর তৈরি করা একটি নকল চিত্রকর্ম। সুইস গবেষণা সংস্থা আর্ট রিকগনিশনের এআই বিশ্লেষণেও এর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে ন্যাশনাল গ্যালারি এখনও এটিকে রুবেন্সের মাস্টারপিস হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়ে আসছে।
এই বিতর্ক শিল্প জগতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে—জালিয়াতি কখনও বৈধতা পেতে পারে কি? একটি নকল চিত্রকর্ম কি শিল্পমূল্যে আসলকে ছাড়িয়ে যেতে পারে? নতুন প্রযুক্তি যেমন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও উন্নত বিশ্লেষণ পদ্ধতি শৈল্পিক সত্যতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এর ফলে সাংস্কৃতিক আইকন ও ঐতিহাসিক শিল্পকর্মের মূল্যায়ন নিয়ে নতুন বিতর্কও তৈরি হচ্ছে। বিবিসি'র এই বিশ্লেষণে একটি নকল চিত্রকর্মকে চিহ্নিত করার পাঁচটি সাধারণ কিন্তু কার্যকর উপায় দেখানো হয়েছে।
রঙ সম্পর্কিত জ্ঞান
একটি শিল্পকর্মের সত্যতা যাচাই করার জন্য কিছু সহজ নিয়ম অনুসরণ করলেই বোঝা যায় এটি আসল নাকি জাল। জার্মান শিল্প জালিয়াত উলফগ্যাং বেল্ট্রাচি এবং তার স্ত্রী লক্ষ লক্ষ ডলারে জাল চিত্রকর্ম বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু তাদের তৈরি একটি জাল শিল্পকর্মে টাইটানিয়াম-সাদা রঙ ব্যবহারের ভুল ধরা পড়ে। কারণ, এই রঙটি সেই সময়ে পাওয়া যেত না। এতে করে তাদের চিত্রকর্মে করা প্রতারণা ফাঁস হয়ে যায়।
একইভাবে, পারমিগিয়ানিনোর নামে বিক্রি হওয়া 'সেন্ট জেরোম'-এর চিত্রকর্মেও ১৯৩৫ সালে উদ্ভাবিত এক ধরনের কৃত্রিম রঞ্জকের উপস্থিতি ধরা পড়ে, যা তার কাজ হওয়া অসম্ভব করে তোলে।
অতীতের সঙ্গে দৃঢ় সংযোগ থাকা
শিল্পকর্মের সত্যতা যাচাই করতে এর ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই আকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে চিত্রকর্মের অতীত খুঁজেন না। এতে করে প্রতারিত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ২০তম শতকের অন্যতম সফল জালিয়াত ডাচ শিল্পী হান ভ্যান মিগেরেন এমনই এক কৌশলে ভার্মিয়ারের নামে একাধিক চিত্রকর্ম বিক্রি করেন। বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে ক্রেতারা তার কাজের ঐতিহাসিক প্রমাণ খুঁজে দেখার চেষ্টাও করেননি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডাচ কর্তৃপক্ষ এক নাৎসি কর্মকর্তার কাছে ভার্মিয়ারের বিখ্যাত ছবি 'দ্য গার্ল উইথ গোল্ডেন এয়ার রিং' বিক্রির অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করে। কিন্তু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে মিগেরেন বিশেষজ্ঞদের সামনে নতুন করে ঐ ছবিটি আঁকেন, যা সবাইকে অবাক করে দেয়।
শিল্পকর্মের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনাগুলি প্রমাণ করে যে অতীতের সঙ্গে দৃঢ় সংযোগ থাকাই শিল্পের মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। বিবিসির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'ফেক অর ফরচুন?'-এর এক পর্বে উপস্থাপক ফিলিপ মোল্ড একটি চিত্রকর্ম নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন, যা তিনি ৩৫ হাজার পাউন্ডে বিক্রি করেছিলেন।
পরবর্তীতে গবেষণা করে জানা যায়, এটি আসলে ইংরেজ রোমান্টিক শিল্পী জন কনস্টেবলের আসল কাজ এবং এর মূল্য ২ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি। সুতরাং একটি শিল্পকর্মের সত্যতা যাচাই করতে তার রসায়ন ও ইতিহাস উভয়কেই গুরুত্ব দিতে হয়। কারণ সঠিক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই জালিয়াতির পর্দা ফাঁস করা সম্ভব।
সুক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি
শিল্পীদের অঙ্গভঙ্গি, তাঁদের স্বাভাবিক তুলির আঁচড় এবং নকশা তৈরির দক্ষতা ক্যানভাস বা কাগজে লেখা আঙুলের ছাপের মতো নয়। একজন শিল্পীর তুলির স্পর্শের সূক্ষ্মতা এবং অন্যজনের দৃঢ়তা বোঝা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে যখন আপনার প্রতিটি আঁচড় সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষিত হয় এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়।
রঙ-তুলির এই সুক্ষ্মতা বজায় রাখা বেশ চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। এরকম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্রিটিশ জালিয়াত এরিক হেবর্ন অ্যালকোহলের সাহায্য নিতেন। তিনি মান্টেগনা, টিপোলো, পাউসিন, পিরানেসিসহ ১ হাজারেরও বেশি চিত্রকর্ম জাল করেছিলেন।
বেলট্রাচি এবং ভ্যান মিগেরেনের নকল চিত্রকর্ম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে তাদের আঁচড়ের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। কিন্তু ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে হেবর্নের তৈরি নিখুঁত জাল অঙ্কন বিশেষজ্ঞদের বিভ্রান্ত করেছিল। এখনও তাঁর কিছু কাজ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত থাকলেও তারা সেগুলোকে জাল বলে স্বীকার করতে চায় না।
গভীর অনুসন্ধান
রঙের উপাদান, উৎস এবং তুলির চাপ বিশ্লেষণ করেও জালিয়াতি ধরা না গেলে আরও গভীরে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। ১৯৯০-এর দশকের পর ২০ বছর ধরে ভিনসেন্ট ভ্যান গখের আঁকা 'স্টিল লাইফ উইথ মিডৌ ফ্লাওয়ার্স অ্যান্ড রোজেস' ছবিটির সত্যতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক চলছিল। অনেকের মতে, ছবির গোলাপ, ডেইজি ও বন্যফুলের অস্বাভাবিক লাল ও নীল রঙ তাঁর স্বাভাবিক রঙতালিকার সঙ্গে মেলে না। এছাড়া, চিত্রকর্মটির কোনো স্বত্বাধিকার রেকর্ডও পাওয়া যাচ্ছিল না।
তবে ২০১২ সালে এক্স-রে পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে শিল্পী অর্থ সাশ্রয়ের জন্য ক্যানভাস পুনর্ব্যবহার করেছিলেন এবং এর নিচে আরও একটি চিত্রকর্ম লুকিয়ে ছিল। ১৮৮৬ সালের জানুয়ারিতে ভাই থিওকে লেখা এক চিঠিতে ভ্যান গখ উল্লেখ করেছিলেন, 'এই সপ্তাহে আমি দুই কুস্তিগীরের নগ্ন শরীরের একটি বড় চিত্র এঁকেছি এবং এটি আঁকতে আমার বেশ ভালো লেগেছে।'
শতাব্দীর পর শতাব্দী রঙের স্তরের আড়ালে থাকা কুস্তিগীরদের সেই দৃশ্য কেবল ছবিটিকে অবৈধতার অভিযোগ থেকে মুক্তই করেনি, বরং এটিকে এক নতুন ধরণের জটিল শিল্পকর্মে পরিণত করেছে।
ছোট ছোট ভুলই বড় জালিয়াতি ফাঁস করে
শিল্পকর্মের সত্যতা যাচাই করার ক্ষেত্রে বানান পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হতে পারে। কারণ এটি করলে শিল্প-সংগ্রাহক পিয়েরে ল্যাগ্রেঞ্জ ১৭ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে পারতেন। তিনি ২০০৭ সালে ভুলভাবে জ্যাকসন পোলকের নামে চিহ্নিত একটি চিত্রকর্মের জন্য পরিশোধ করেছিলেন।
শিল্পী পোলকের স্বাক্ষর বেশ স্বতন্ত্র ছিল। তিনি তার ইংরেজি নামের শেষের বর্ণ 'কে'-এর আগে স্পষ্টভাবে 'সি' লিখতেন। কিন্তু ওই জালিয়াতি চিত্রকর্মে সেই বর্ণটি বাদ পড়েছিল। এই ছোট ভুল শুধু একটি জালিয়াতিই প্রকাশ করেনি বরং পুরো একটি গ্যালারির সুনাম নষ্ট করেছিল।
এমন ভুল স্বাক্ষরই ছিল বহু জাল চিত্রকর্মের অন্যতম চিহ্ন, যা মার্ক রথকো, উইলেম ডি কুনিং এবং রবার্ট মাদারওয়েল-এর নামে বাজারজাত করা হয়েছিল। নিউ ইয়র্কের অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত গ্যালারি, নোডলার অ্যান্ড কো., এই জাল চিত্রকর্ম বিক্রি করে ৮০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। এসব শিল্প সরবরাহকারী দাবি করতেন, তিনি 'মিস্টার এক্স' নামক এক রহস্যময় সংগ্রাহকের কাছ থেকে এসব সংগ্রহ করেছেন।
এসব কেলেঙ্কারি ফাঁস হবার আগেই ১৬৫ বছরের পুরোনো গ্যালারিটি বন্ধ হয়ে যায়। এই জালিয়াতির মূল সন্দেহভাজন ৭০ বছর বয়সি চীনা শিল্পী পেই-শেন কিয়ান কুইন্সের একটি জালিয়াতির কারখানা থেকে নিখোঁজ হন এবং পরে চীনে পালিয়ে যান।
