ইউক্রেনের পুরুষদের অনেকেই এখন আর যুদ্ধে যেতে চায় না
বড় যুদ্ধ যেন নরকের অগ্নিকুণ্ড। যার চাই রক্ত-মাংসের জ্বালানি। কিন্তু, প্রতিনিয়ত অজস্র হতাহতের ফলে, সেনা সংখ্যার চাহিদা মেটাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে ইউক্রেন। খবর বিবিসির।
স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অনেকেই দেশরক্ষার যুদ্ধে নাম লিখিয়েছে, তবে স্বেচ্ছাসেবীরা যথেষ্ট নয়। দৈনিক যে বিপুল সংখ্যক সেনা আহত বা নিহত হচ্ছে, তাদের জায়গায় নতুন সেনাসদস্য দরকার দেশটির।
তাছাড়া, টানা লড়াইয়ে সেনারা ক্লান্ত- পরিশ্রান্ত; মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত অনেকে। টানা ১৮ মাসের এই লড়াই গভীর ছাপ ফেলেছে সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে। একটি বড় যুদ্ধে যা স্বাভাবিক ঘটনা।
বড় যুদ্ধের আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, এক পর্যায়ে পরাজয় অবধারিত বুঝে হাল ছেড়ে দেয় জনতার এক অংশ। যুদ্ধের বিপক্ষে যেতে থাকে জনমত। ইউক্রেনেও কি তেমন কিছুই হচ্ছে? সেটা এখনও স্পষ্ট না হলেও, এরমধ্যেই অনেক পুরুষ যুদ্ধে যোগ দিতে রাজি হচ্ছেন না। লড়াই সক্ষম অনেক পুরুষই এরমধ্যে দেশ ছেড়েছেন, নাহলে ভর্তির দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে নিয়োগ এড়িয়েছেন। আরো অনেকেই বিভিন্ন ফন্দিফিকির বের করেছেন। যুদ্ধে যারা যেতে চান না, তাদের অভিযোগ, জোরজবরদস্তি করে ভর্তি করানো হচ্ছে নতুন সদস্যদের।
ইয়োহর (ছদ্মনাম) এর বাবা সোভিয়েত বাহিনীর হয়ে আফগানিস্তানে যুদ্ধ করেছিলেন। এই যুদ্ধ থেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ফিরেছিলেন তিনি। সেই দুঃসহ স্মৃতি ইয়োহরকে করে ফেরে আজো। ফলে তিনি যুদ্ধে যেতে নারাজ।
সেনাভর্তি প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে ইয়োহর বিবিসি'কে বলেন, 'এটি মান্ধাতার আমলের একটি ব্যবস্থা।'
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের আগে যারা সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ করতেন– তাদের বিকল্প হিসেবে কৃষিকাজ বা সামাজিক পরিষেবার সরকারি চাকরিতে যুক্ত হওয়ার বিকল্প দেওয়া হতো। কিন্তু, গত বছর দেশে সামরিক আইন জারি হওয়ার পর থেকে সে সুযোগ আর নেই। কিন্তু, ইয়োহর মনে করেন, এটা থাকা উচিত ছিল।
ইয়োহর বলেন, 'প্রতিটি পরিস্থিতি আলাদা আলাদা। সংবিধানে আছে (দেশ আক্রান্ত হলে) সব পুরুষকে যুদ্ধে যোগ দিতে হবে, কিন্তু আমার মতে তা আজকের দিনের মূল্যবোধের সাথে মানানসই নয়।'
সম্প্রতি ভর্তি ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে কিয়েভে পুলিশ তাকে আটকায়। এরপর তাকে একটি ভর্তিকেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল। ইয়োহর সেখানে গিয়ে কর্মকর্তাদের জানান, তার পিঠের সমস্যা রয়েছে। এক পর্যায়ে তাকে বাড়ি ফেরার অনুমতি দেন তারা। ঘরে ফিরে এখন ইয়োহর আশঙ্কা করছেন, পরের বার এমন হলে আর ছাড়া পাবেন না তিনি।
দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী হলে, বা সন্তানের একমাত্র অভিভাবক হলে, অথবা বৃদ্ধ বা অসুস্থ কোনো ব্যক্তির একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক হলে – সেনাভর্তি থেকে ছাড় দেওয়া হয়। কিন্তু, কারো বিরুদ্ধে ভর্তি ফাঁকির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে জরিমানা করা হয়, বা তিন বছরের জেলও হতে পারে।
ইয়োহরের মতে, 'নিজ নিজ পরিস্থিতি অনুসারে, সবাইকে এ যুদ্ধে অবদান রাখার সুযোগ দেওয়া উচিত। সম্মুখসারিতে যারা লড়ছেন, তাদের জন্য আমি কষ্ট অনুভব করি। কিন্তু, লড়াই-বিমুখ বা শান্তিকামী বলে নিজেকে যুদ্ধের বাইরে রাখার সুযোগও আমার নেই।'
এদিকে সেনা-নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে কিয়েভ প্রশাসন। সম্প্রতি দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদমির জেলেনস্কি সব অঞ্চলের প্রধান নিয়োগ কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করেছেন। নিয়োগ ব্যবস্থায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভীতি প্রদর্শন ও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর জেলেনস্কি এই পদক্ষেপ নেন।
অভিযোগ রয়েছে, এমন দুর্নীতি আপাদমস্তক গ্রাস করেছে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে। যেমন ওডেসা অঞ্চলের সেনাভর্তির প্রধান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দক্ষিণ স্পেনে লাখ লাখ ডলারের সম্পত্তি কেনার অভিযোগ আছে। যদিও, ওই কর্মকর্তা বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা বিবিসিকে বলেছেন, এ ধরনের অভিযোগ 'লজ্জাকর এবং অগ্রহণযোগ্য।'
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইউক্রেন মোবিলাইজেশনের ঘোষণা দিয়েছে। এর আওতায়, ৬০ বছরের কম বয়সী পুরুষদের ইউক্রেন ত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়াও হয়েছে। তারপরেও হাজার হাজার পুরুষ গোপনে দেশ ছেড়েছেন। এদের বেশিরভাগই কার্পেথিয়ান পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী রোমানিয়া হয়ে পালান।
যারা দেশে থেকে গেছেন, তাদের অনেকেই বিভিন্ন চ্যাট গ্রুপের সদস্য। ইউক্রেনে বহুল ব্যবহৃত একটি চ্যাট অ্যাপ হলো- টেলিগ্রাম। এর চ্যাট গ্রুপগুলোর সদস্যরা নিয়োগ কর্মকর্তারা কখন কোন এলাকায় অবস্থান করছেন- সে সম্পর্কে সবাইকে জানিয়ে দেন। এভাবে ওই এলাকায় যারা ভর্তির উপযুক্ত, তারা অন্যত্র চলে যান। প্রতিটি অঞ্চল বা শহরের জন্য এমন পৃথক পৃথক চ্যাট গ্রুপ রয়েছে। কোনো কোনো গ্রুপের সদস্য সংখ্যা এক লাখেরও বেশি।
জলপাই রঙা উর্দির কারণে এসব গ্রুপগুলোয় নিয়োগ কর্মকর্তাদের সাংকেতিক নামে বা 'অলিভ' বলে উল্লেখ করা হয়।
নিয়োগকর্তারা সাধারণত যাদের দেখা পান, তাদের হাতে ভর্তিকেন্দ্রে হাজির হয়ে নিবন্ধন করার নোটিশ ধরিয়ে দেন। কিন্তু, অনেককেই অকুস্থল থেকে সরাসরি তুলে নিয়ে যাওয়ার কথাও জানা গেছে।
হয়রানি এড়াতে অনলাইনের জাতীয় তথ্যভাণ্ডারে নাগরিকদের নিজ নিজ তথ্যের আপডেট দেওয়া অনুরোধ করেছে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। কর্তৃপক্ষটি জানিয়েছে, এসব তথ্যানুসারে কোনো নাগরিককে ডেকে পাঠানো হলে, তাকে উপযুক্ত পদে নিয়োগ করা হবে।
কিন্তু, নিয়োগ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রুক্ষ আচরণ ও ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ভর্তির পর মাত্র এক মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগও অজস্র।
এই অবস্থায়, জনগণের মধ্যে আস্থা ফেরাতে চায়কর্তৃপক্ষ। জেলেনস্কির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তারই ইঙ্গিত। প্রচারণার ক্ষেত্রেও তা তুলে ধরা হচ্ছে।
সেনাভর্তির সাম্প্রতিক এক বিজ্ঞাপনে এমন একটি স্লোগান রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, 'ভয় পাওয়ায় কোনো সমস্যা নেই'।
কিয়েভের কাছাকাছি এক গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটানোর ক্যাম্প এখন পরিত্যাক্ত। সেখানে নাগরিকরা এখন রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। বিবিসির প্রতিবেদক অকুস্থলে গিয়ে দেখেন প্রশিক্ষণের দৃশ্য।ক্যাম্পের রাস্তায় টহল দিচ্ছিলেন এই প্রশিক্ষণার্থীরা, তাদের প্রশিক্ষক হঠাৎ 'গ্রেনেড' বলে চিৎকার করলেন। সঙ্গে সঙ্গে সবাই শুয়ে পড়েন মাটিতে।
প্রশিক্ষণার্থীদের কাছে আসল আগ্নেয়াস্ত্র নেই, কিন্তু তাদের মতে এই প্রস্তুতি দরকারি। ভবিষ্যতে যদি সেনাবাহিনী থেকে ডাক আসে, তখন যেন তারা তৈরি থাকতে পারেন।
এদের অনেকেই যুদ্ধে যোগ দিতে আগ্রহী। অ্যান্টন নামের ২২ বছরের এক ছাত্র জানান, তিনি এরমধ্যেই যুদ্ধে যোগদানের বিষয়ে মনস্থির করেছেন।
তিনি বলেন, 'যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন আমি ভর্তির জন্য তৈরি ছিলাম না। এখন আগামীতে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি।'
দেশের সংকটকালে সেনাভর্তি এড়ানো সঠিক নয় বলে মনে করেন অ্যান্টন, তবে কেন কেউ কেউ যুদ্ধে যেতে চায় না, সেটাও তিনি বোঝেন।
যুদ্ধকে তিনি ভয় পান কিনা, বিবিসি প্রতিবেদকের এই প্রশ্নের উত্তরে অ্যান্টন বলেন, 'অবশ্যই পাই। সবাই ভয় পাচ্ছে। কিন্তু, পরিস্থিতি যদি আরো বাজে রূপ নেয়– তাহলে কিয়েভে নিশ্চিন্তে হাত গুটিয়ে বসে থাকব না।'
রাশিয়ার মতো বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ লড়াইয়ে সকল প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে ইউক্রেন। ফলে পুরো দেশটি দখলের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে মস্কো এখন দেশটির পাঁচ ভাগের এক ভাগ দখলে রাখার চেষ্টা করছে।
যদিও ইউক্রেনকেও নিজের সমস্যায় জর্জরিত। তাদের পাল্টা-আক্রমণে নেই প্রত্যাশিত গতি, অগ্রগতিও সামান্য। এরমধ্যে নাগরিকদের যুদ্ধে যোগদানের জন্য উজ্জীবিত রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের ময়দানে সেনার চাহিদা অস্বীকার করার উপায় যেমন নেই, তেমনি অস্বস্তিকর সত্যিটা হলো– যুদ্ধে সবাই যেতেও চায় না।
