পুনিল ঘোষ কেবিন: ৪৩ বছর ধরে পরিবেশন করছে দই-চিড়া
জ্যৈষ্ঠ মাসের ভ্যাপসা গরমে জনজীবনের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। কখনো যৎসামান্য বৃষ্টির দেখা পাওয়া গেলেও তা গরম কমানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এই তীব্র গরমে যেকোনো ভারী খাবারই পেটের জন্য অস্বস্তিকর। বাঙালির সকালের চিরচেনা নাশতা—পরোটা, ডাল-ভাজি কিংবা ডিম; আর বিকেলে ভাজাপোড়া। গরমের মধ্যে এসব খাবার সাময়িকভাবে ক্ষুধা মেটালেও শরীর শীতল করে না।
এই গরমে শরীর ঠান্ডা করার মতো স্বস্তিদায়ক একটি খাবার হলো দই-চিড়া। ঠান্ডা দই আর ভেজা চিড়ার সঙ্গে পছন্দমতো গুড়, চিনি বা মিষ্টির রস মিশিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু এই পদ। এর সঙ্গে চাইলে বিভিন্ন ফলও মিশিয়ে নেওয়া যায়।
কুমিল্লা রেলস্টেশনের সামনেই একটি ছোট দোকানে দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে দই-চিড়া বিক্রি করছেন পুনিল ঘোষ। নিজের নামেই দোকানের নাম দিয়েছেন 'পুনিল ঘোষ কেবিন'। সকাল ছয়টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত এখানে চলে দই-চিড়া বিক্রি। কুমিল্লাবাসী তো বটেই, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও মানুষ ছুটে আসে পুনিল ঘোষের বিখ্যাত দই-চিড়া খেতে। ব্যতিক্রমী এই খাবারের স্বাদ নিতে আমরাও পৌঁছে গিয়েছিলাম কুমিল্লায়।
দশ টাকা দিয়ে শুরু
১৯৮২ সালে একই স্থানে এই দোকানটি প্রথম ভাড়া নিয়েছিলেন পুনিল ঘোষ। তখন প্রতিদিন পাঁচ টাকা করে ভাড়া দিতে হতো। ব্যবসা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে তিনি খাবারের দোকান দেওয়ার কথা ভাবেন। তবে গতানুগতিক ভাতের হোটেল দিতে চাননি তিনি; কারণ সেখানে প্রতিযোগিতা বেশি। পুনিল ঘোষ চেয়েছিলেন এমন কিছু করতে যা অনন্য। এ নিয়ে ভাবতে ভাবতেই মাথায় আসে দই-চিড়ার কথা।
শুরুতে শুধু দই, চিড়া, কলা আর গুড় দিয়ে মাখিয়ে পরিবেশন করা হতো। এর দাম ছিল মাত্র ১০ টাকা। এক বাটি দই-চিড়া খেয়ে অনেকে সকাল-বিকেলের নাশতা, এমনকি দুপুরের বা রাতের আহারও সারতেন। খুব অল্প সময়েই রেলস্টেশন এলাকায় জনপ্রিয়তা লাভ করে পুনিল ঘোষ কেবিন। কুমিল্লা শহরের অনেকেই প্রাতরাশ সারতে এখানে আসতেন।
পুনিল ঘোষ বলেন, 'প্রথম ২০ বছর শুধু কলা আর গুড় দিয়েই দই-চিড়া বানিয়ে দিতাম। পরে রেসিপিতে আরও উপকরণ যোগ করি। মিষ্টি, ছানা, টক দই, রসমালাই—যে যেভাবে চায়, সেভাবেই দিই। এখন নারিকেলও দিই। মানুষ পছন্দ করছে দেখেই আজও টিকে আছি। এই খাবার সবাই বাসায় বানিয়ে খেতে পারে, তবুও প্রতিদিন অনেক মানুষ আমার কেবিনে আসে। তাদের ভাষ্য, আমার হাতের দই-চিড়া নাকি বেশি স্বাদের!'
পুনিল ঘোষের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই কেবিনে ঢুকলেন ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি, নাম শারাফত আলী। জানা গেল, প্রায় ৪০ বছর ধরে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন তিনি এখানে দই-চিড়া খেতে আসেন। তিনি বলেন, 'পুনিল এখন আমার পরিবারের মানুষের মতো হয়ে গেছে। আমি দোকানে ঢুকলেই ও আমার জন্য দই-চিড়া বানাতে শুরু করে, আলাদা করে অর্ডার দিতে হয় না। ও জানে আমার নারিকেলে অ্যালার্জি আছে, তাই আমার বাটিতে নারিকেল দেয় না।'
দীর্ঘ সময় ধরে একই স্থানে ব্যবসা করার কারণে স্থানীয়দের কাছে 'পুনিল ঘোষ কেবিন' একটি অতি পরিচিত নাম। কুমিল্লা রেলস্টেশনের প্রধান ফটক দিয়ে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে সোজা হেঁটে গেলেই হাতের বাঁয়ে পড়ে এই দোকান। স্টেশনের সামনে আরও কিছু রেস্তোরাঁ থাকলেও পুনিল ঘোষের দই-চিড়ার কদরই আলাদা।
খাঁটি উপকরণে অকৃত্রিম স্বাদ
'পুনিল ঘোষের দই-চিড়ার স্বাদ অন্য জায়গার মতো নয়,' বলছিলেন মমতাজ বেগম। ছেলেকে নিয়ে সকালে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন তিনি। ধর্মসাগর পাড় দিয়ে হেঁটে পুলিশ লাইন রোড হয়ে বাগিচাগাঁও পার হয়ে রেলস্টেশনে এসেছেন দই-চিড়া খেতে। তিনি বলেন, 'আমার বাসার পাশেই অনেক রেস্তোরাঁ আছে, কিন্তু এত দূর হেঁটে এসেছি পুনিল বাবুর দই-চিড়ার জন্য। আমার ছেলে এটা খুব পছন্দ করে।'
পুনিল ঘোষের দই-চিড়ার স্বাদের নেপথ্যে রয়েছে কিছু বিশেষ উপকরণ, যা সচরাচর অন্য কোথাও দেখা যায় না। যেমন—নাটোরের ছানা, আখের গুড় আর নোয়াখালী থেকে আনা নারিকেল। এ ছাড়া চিড়ার সঙ্গে যে দই ব্যবহার করা হয়, তা পুনিল ঘোষ নিজেই তৈরি করেন।
এখানে দই-চিড়া দুটি প্যাকেজে বিক্রি হয়। প্যাকেজ-১-এ থাকে দই, চিড়া, নারিকেল, কলা, আখের গুড়, ছানা আর গুঁড়ো দুধ। এর দাম ১১০ টাকা (পার্সেল ১২০ টাকা)। প্যাকেজ-২-এ এর সঙ্গে যুক্ত হয় রসমালাই, যার দাম ১৫০ টাকা (পার্সেল ১৬০ টাকা)।
পার্সেলের ক্ষেত্রে বক্স ও চামচের জন্য ১০ টাকা অতিরিক্ত রাখা হয়। পার্সেল তৈরির পদ্ধতিতে রয়েছে মুন্সিয়ানা। বক্সে চিড়ার একপাশে কলা, গুড় ও নারিকেল দেওয়া হয় আর দই দেওয়া হয় আলাদা কাপে। এতে খাবার দীর্ঘক্ষণ ভালো থাকে। পুনিল ঘোষ জানালেন, দূরপাল্লার ট্রেনের যাত্রীরা অনেকেই পথে খাওয়ার জন্য এই দই-চিড়া পার্সেল নিয়ে থাকেন।
প্রতি ১০-১৫ দিন পরপর নাটোর থেকে গুড় ও ছানা সংগ্রহ করা হয়। প্রতি সপ্তাহে এখানে প্রায় ৫০ কেজি ছানা ও ৩০ কেজি আখের গুড় লাগে। এ ছাড়া ১০ কেজির মতো চিড়া ও ১৫০ কেজি দইয়ের প্রয়োজন হয় সপ্তাহে। নোয়াখালী থেকে আসা নারিকেল লাগে দৈনিক ১৫ থেকে ২০টি। গ্রীষ্মকালে এই চাহিদা আরও বেড়ে যায়, তবে শীতে কিছুটা কমে।
খাওয়ার সময় কারও যদি অতিরিক্ত চিড়া, দই, নারিকেল বা ছানা প্রয়োজন হয়, তবে তা দিতে কার্পণ্য করেন না পুনিল ঘোষ। এর জন্য তিনি কোনো অতিরিক্ত টাকাও নেন না। তিনি বলেন, 'যিনি খেতে এসেছেন, তিনি আমার মেহমান। মেহমানকে বাড়িয়ে দিলে আমার কমবে না। তাদের জন্যই আমার পেট ও সংসার চলে।'
দই-চিড়া ছাড়াও আলাদাভাবে রসমালাই, দই, টক দই, ক্ষীর দই, ছানা সন্দেশ, কফি, লাচ্ছি ও মিষ্টি বিক্রি করা হয় পুনিল ঘোষ কেবিনে।
চলছে, চলবে…
কথা বলতে বলতেই স্টেশনে ট্রেন ঢোকার 'কু-ঝিকঝিক' শব্দ শোনা গেল। ব্যস্ত হয়ে উঠলেন পুনিল ঘোষ। ফ্রিজ থেকে ভেজানো চিড়া আর দইয়ের কাপ বের করে সারি সারি সাজালেন। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে দুই হাতে পরে নিলেন পলিথিন গ্লাভস।
হঠাৎ এই ব্যস্ততার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, '১১টা বাজে, মহানগর প্রভাতী ঢুকছে। এখন যাত্রীরা নেমে আসবেন। কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ জন নিয়মিত কাস্টমার আছেন, যারা স্টেশনে নেমে আমার এখানে বসেন। তাদের জন্যই এই প্রস্তুতি।'
কোন ট্রেন কখন কুমিল্লা স্টেশনে থামে, তার পুরো সময়সূচি পুনিল ঘোষের নখদর্পণে। সকাল আটটায় উপকূল এক্সপ্রেস, ১০টায় বিজয় এক্সপ্রেস, ১১টায় মহানগর প্রভাতী, ১২টায় পাহাড়িকা এক্সপ্রেস, বেলা একটায় কমিউটার আর সন্ধ্যা ছয়টায় চট্টলা এক্সপ্রেস—সবই তার মুখস্থ। প্রতিটি ট্রেন থেকেই প্রতিদিন শতাধিক ক্রেতা আসেন তাঁর দোকানে।
কুমিল্লা শহরের পদস্থ কর্মকর্তারাও নিয়মিত লোক পাঠিয়ে এখান থেকে দই-চিড়া সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া ফুড ভ্লগারদের মাধ্যমে এখন সারা দেশের মানুষ পুনিল ঘোষ কেবিনকে চেনে। অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে ফোন করে ডেলিভারি পাঠানোর অনুরোধও করেন।
পুনিল ঘোষের বর্তমান বয়স ৬৩ বছর। প্রতিদিন ভোর ছয়টায় দোকান খোলেন, বন্ধ করেন রাত ১২টায়। কর্মচারী থাকলেও প্রধান কাজগুলো তিনি নিজ হাতেই করতে পছন্দ করেন। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে প্রবাসে থাকলেও ছোট ছেলে বাবার সঙ্গেই দোকানে বসেন। বাবার কাছ থেকেই তিনি দই-চিড়া বানানোর কৌশল রপ্ত করেছেন।
পুনিল ঘোষের কণ্ঠে তৃপ্তির সুর, 'যতদিন বেঁচে আছি, মানুষকে দই-চিড়া খাওয়াতে চাই। জীবনে এই একটা কাজই শিখেছি। এটা দিয়েই এত দূর আসা। আমি চলে যাওয়ার পর আমার ছেলেরা এভাবেই মানুষের সেবা করবে। পুনিল ঘোষ কেবিন চলছে, চলবে।'
ছবি: ফাইয়াজ আহনাফ সামিন
