বন উজাড়, ঝিরি ভরাট: বান্দরবানের ডিম পাহাড়ে অবৈধ গাছ ব্যবসার তাণ্ডব
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত আলীকদম-থানচি সড়কটি বান্দরবানের অন্যতম মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার। খাড়া সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে মেঘের আনাগোনা আর পাহাড়ি ঝরনাধারা পর্যটকদের মুগ্ধ করলেও, এই সৌন্দর্যের আড়ালে ডিম পাহাড়ের গহিন অরণ্যে নিরবে ঘটে চলেছে এক ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়।
গত ২২ এপ্রিল ডিম পাহাড়ের '২৩ কিলোমিটার' পয়েন্টে আলীকদম-থানচি সড়কের পাশে লতাপাতায় ঢাকা একটি সরু পথ দেখা যায়, যা মহাসড়ক থেকে প্রায় অদৃশ্য। সেই গোপন পথ দিয়েই বেরিয়ে আসতে দেখা গেল নীল ত্রিপলে ঢাকা একটি ট্রাক। ত্রিপলের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল বনের সদ্য কেটে আনা বিশাল সব গাছের গুঁড়ি। ট্রাকের ভেতরে দুজন শ্রমিক বসে ছিলেন এবং পেছনে থাকা অন্য একজন আলোকচিত্রীকে দেখে দৌড়ে বনে পালিয়ে যান। এরপর ট্রাকটি দ্রুত আলীকদমের দিকে রওনা দেয়।
সেই গোপন পাহাড়ি পথ ধরে নিচে প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটার পর দেখা গেল ধ্বংসযজ্ঞের প্রকৃত রূপ। পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বিপুল পরিমাণ সদ্য কাটা গাছের গুঁড়ি। কোনোটি মাঝখান থেকে চেরা, আবার কোনোটি আসবাবপত্র তৈরির উপযোগী চৌকো ব্লকে রূপান্তর করা হয়েছে। পাহাড়জুড়ে গাছের তাজা স্টাম্প বা গোড়া। কাটা গাছগুলোর অনেকগুলোর পাতাই তখনো সবুজ এবং গোড়ার মাটি ভেজা ছিল, যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে গাছগুলো মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই কাটা হয়েছে।
পাহাড়ের আরও নিচে নামলে দেখা যায় 'ব্যাংঝড়ি ঝিরি'। আদিবাসী ম্রো সম্প্রদায়ের জন্য একসময়কার পানির প্রধান উৎস এই ঝিরিটি এখন গাছের গুঁড়ি আর ধ্বংসাবশেষে প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত সামাজিকভাবে সংরক্ষিত 'পাড়াবন'-এর বড় বড় গাছগুলো পরিকল্পিতভাবে উজাড় করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের দাবি, আলীকদম-থানচি সীমান্ত সংলগ্ন দুর্গম এই এলাকায় একটি সক্রিয় গাছ পাচারকারী সিন্ডিকেট চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পামিয়া ম্রো পাড়া, তন্তুয়ী পাড়া, নামচাক পাড়া, কাকই পাড়া ও আদই পাড়া এবং এর আশপাশের প্রায় ২০০ একর প্রাকৃতিক বন উজাড় করে দিয়েছে।
বান্দরবান জেলা সদর থেকে ১২৭ কিলোমিটার এবং আলীকদম থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে এই এলাকার অবস্থান। আলীকদম-থানচি সড়ক থেকে প্রায় এক ঘণ্টা পাহাড়ে হাঁটার পর যে ধ্বংসলীলা চোখে পড়ে, তা উপেক্ষা করার মতো নয়। স্থানীয়রা জানান, ট্রাক চলাচলের জন্য পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। পাহাড় ও পাথর কাটতে নিয়মিত 'এস্কাভেটর' বা ভেকু মেশিন ব্যবহার করা হয়েছে। আর গাছ কাটার অবশিষ্টাংশ এবং রাস্তা তৈরির মাটির স্তূপে ঝিরির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
উজাড় করা গাছগুলোর মধ্যে রয়েছে গর্জন, চম্পা ফুল, কড়ই, বৈলাম, গুটগুটিয়া, লালি ও চাপালিশের মতো প্রজাতি, যা একসময় এই গভীর বনে প্রচুর পরিমাণে ছিল। স্থানীয়ভাবে এগুলো 'পড়াবন' বা 'পাড়াবন' নামে পরিচিত, যা মূলত পাহাড়ের আদিবাসী সম্প্রদায় তাদের সামষ্টিক ব্যবহারের জন্য সামাজিকভাবে সংরক্ষণ করে। যদিও এগুলো সামাজিকভাবে পরিচালিত, তবুও বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া এখান থেকে বড় গাছ কাটা আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের শেষের দিক থেকে কোনো বাধা ছাড়াই এই নিধনযজ্ঞ চলছে।
বনের ভেতর ঝিরির পাশে শ্রমিকদের জন্য তৈরি করা দুটি অস্থায়ী ঘর বা 'ছাউনি' পাওয়া গেছে। এর একটিতে প্রায় ১০ জন শ্রমিকের থাকার জায়গা রয়েছে। ঘরের ভেতরে রাখা ছিল ইলেকট্রিক করাত বা চেইন-শ। ঝিরি থেকে প্লাস্টিকের পাইপের মাধ্যমে পানি তোলার জন্য সৌর প্যানেলচালিত পাম্প ব্যবহার করা হচ্ছে। বাইরে শ্রমিকদের কাপড় ঝুলছে এবং পাশেই রান্নার প্রস্তুতি চলছিল।
সেখানে উপস্থিত কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে আসা শ্রমিক সরদার মো. ইসমাইল জানান, আলীকদমের আবু ইসমাইল নামে এক কাঠ ব্যবসায়ী তিন-চার মাস আগে তাদের এখানে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, "আমরা দিনমজুরি করে চলি। এলাকায় কাজ নেই বলে এখানে কাজের আশায় এসেছি।" তার দাবি অনুযায়ী, ৪৫০-৫০০ টাকা মজুরিতে ৭-৮ জন শ্রমিক নিয়মিত গাছ কাটছে। ইসমাইল আরও বলেন, "এখানে বেশিরভাগই লালি ও তুলা গাছ। দামি গাছের মধ্যে মাত্র একটি বৈলাম পাওয়া গেছে।" তিনি জানান, গাছ কাটা এখন বন্ধ, এখন শুধু দিনে একবার বা দুবার করে ট্রাক ভর্তি করে পাচার করা হচ্ছে।
চকরিয়া থেকে আসা আরেক শ্রমিক শামসুল আলম জানান, তিনি ১৮ দিন আগে এখানে এসেছেন এবং গাছ পরিবহন ও রান্নার কাজের জন্য দিনে ৪৫০ টাকা পান। তবে বনের ভেতরের অবস্থা শ্রমিকের দাবির সাথে মিলছে না। সদ্য কাটা গাছের গুঁড়ি আর ভেজা মাটি প্রমাণ দিচ্ছে যে নিধনযজ্ঞ একেবারে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত চলেছে।
বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, আলীকদম-থানচি সড়কের ২৩ কিলোমিটারে সেনাবাহিনীর তল্লাশি চৌকি এড়াতে 'কলার ঝিরি' নামক একটি বাইপাস রাস্তা ব্যবহার করে গাছ পাচার করা হচ্ছে। তাদের আরও অভিযোগ, কিছু গাছ বন বিভাগের 'জোত পারমিট' (ট্রানজিট পেপার) ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হচ্ছে, আবার কিছু অংশ আলীকদমের অবৈধ ইটভাটা ও তামাক চুল্লিতে জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। ঢালু পাহাড়ের শতবর্ষী সব গাছ উজাড় করে পাহাড়কে প্রায় ন্যাড়া করে ফেলা হয়েছে।
মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী আবু ইসমাইল বড় গাছ কাটার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, "আমি শুধু জ্বালানি কাঠ কিনেছি। জুম চাষের পর অবশিষ্ট কাঠ হওয়ার কথা ছিল।" তিনি আরও দাবি করেন যে, থানচির একটি আলাদা গ্রুপ বড় গাছ কাটা এবং পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির জন্য দায়ী। তিনি বলেন, "ভুলবশত আমি এতে জড়িয়েছি, এখন এই ব্যবসা ছেড়ে দেব।"
পামিয়া পাড়ার বাসিন্দা লাইরু ম্রো বলেন, সাংবাদিকরা এলাকা ত্যাগ করার পরও গাছ কাটা থামেনি। তিনি বলেন, "সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে কেউ হয়তো শ্রমিকদের সতর্ক করেছিল। আপনারা যাওয়ার পর দিনভর আরও কাঠ সরানো হয়েছে এবং রেইড বা অভিযানের ভয়ে তারা রাতেও গাছ পরিবহন করেছে।" লাইরু আরও জানান, ২০২৪ সালের শেষে যখন গাছ কাটা শুরু হয়, তখন তারা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু লাভ হয়নি। চলতি বছরের শুরুতে তারা আবারও চেষ্টা করলে ব্যবসায়ীরা দাবি করেন যে তারা এক ম্রো বাসিন্দার কাছ থেকে বাগানটি কিনে নিয়েছেন। কিন্তু লাইরুর মতে, এটি সামাজিকভাবে সংরক্ষিত পাড়াবন।
এই বছরের জানুয়ারিতে প্রথমে আলীকদম সেনা জোন এবং পরে উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। লাইরু বলেন, "সেনা জোন থেকে আমাদের বলা হয়েছিল এক মাস পর নির্বাচন, তাই নির্বাচনের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইউএনও অফিস থেকে আমাদের পুলিশ ও বন বিভাগের সহায়তা নিতে বলা হয়। কিন্তু গাছ কাটা কখনো থামেনি।" শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ না পেয়ে বাসিন্দারা ধ্বংসযজ্ঞের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
এই পরিবেশগত বিপর্যয়ের প্রভাব ইতিমধ্যে আশপাশের গ্রামগুলোতে পড়তে শুরু করেছে। পামিয়া পাড়া, তন্তুয়ী পাড়া, নামসাক পাড়া, কাকই পাড়া, কুইরিং পাড়া ও সানখলা পাড়াসহ অন্তত ছয়টি গ্রামের পানির প্রধান উৎস এই 'ব্যাংঝড়ি ঝিরি'। বনের গাছ উজাড় হওয়ার ফলে এই ঝিরিটি এখন শুকিয়ে যাচ্ছে। পামিয়া পাড়ার মেনচং ম্রো বলেন, "আগে এই ঝিরিতে প্রচুর মাছ, কাঁকড়া আর পানি ছিল। গাছ কাটার পর থেকে আগের মতো আর পানি পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা অনেক চেষ্টা করেও গাছ কাটা থামাতে পারিনি।" আদই পাড়ার কার্বারি কাম্প্লাত ম্রো জানান, ৭-৮টি গ্রামের মানুষ এই ঝিরির পানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সংকট চরমে পৌঁছেছে।
বন্যপ্রাণীও দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। নামচাক পাড়ার মেন রাও ম্রো বলেন, মাত্র দুই বছর আগেও এই বন পশুপাখিতে ভরা ছিল। তিনি বলেন, "এখানে বন্যশূকর, হরিণ, বনমোরগ আর বানর ছিল। গত বছরও এখানে দুটি ভালুক দেখা গেছে। বন এভাবে ধ্বংস হলে কিছুই আর বাঁচবে না।" তাঁর মতে, এই পাড়াবনটি প্রায় ৫০ একর এলাকার ওপর ছিল, যদিও এর কোনো আনুষ্ঠানিক জরিপ নেই।
বাসিন্দারা স্থানীয় লংলে ম্রো নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পাড়াবনের অংশ বিক্রির অভিযোগ তুলেছেন। সেনা জোন ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া লিখিত অভিযোগে তাঁর নাম রয়েছে। লংলে ম্রো কাঠ বিক্রির কথা স্বীকার করলেও বড় গাছ কাটার অনুমতি দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, "কয়েক বছর ধরে জুম চাষ ভালো হচ্ছিল না। অভাবের কারণে আমি কিছু কাঠ জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করেছি। বড় গাছ বিক্রির কোনো কথা ছিল না।"
এই ঘটনার পর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা তীব্র হচ্ছে। চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল বন ও ভূমি অধিকার সুরক্ষা আন্দোলনের বান্দরবান চ্যাপ্টারের সভাপতি জুয়াম লিয়ান আমলাই বন বিভাগকে দায়ী করে বলেন, "বন বিভাগের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এমন বিশাল নিধনযজ্ঞ ঘটা অসম্ভব।"
তবে বন কর্মকর্তারা জনবল সংকটের কথা বলছেন। তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম জানান, এলাকাটি তাদের প্রশাসনিক এক্তিয়ারভুক্ত হলেও সেখানে তাদের কোনো সক্রিয় কার্যক্রম ছিল না। তিনি বলেন, "আমাদের এক্তিয়ারে ৫,৭৮৪ একর বনভূমি রয়েছে। কিন্তু সীমিত জনবল নিয়ে এত দূরে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন। তবুও ইউএনও'র সাথে আলোচনা করে আমরা পরবর্তী ক্ষতি রোধের চেষ্টা করব। বন আইন বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিষয়টি নজরে আসার পর দ্রুত অভিযানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গণমাধ্যম ও স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২২ এপ্রিল সকালে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঞ্জুর আলমের নেতৃত্বে ডিম পাহাড় এলাকায় দিনভর অভিযান চালানো হয়। অভিযানে প্রায় ৩০০ ঘনফুট কাঠ জব্দ করা হয়, বনের ভেতর শ্রমিকদের ছাউনি ধ্বংস করা হয় এবং পাহাড় কাটায় ব্যবহৃত একটি এস্কাভেটর অচল করে দেওয়া হয়। অভিযানের খবর পেয়ে শ্রমিকরা আগেই পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
ইউএনও মঞ্জুর আলম বলেন, "এস্কাভেটরটি এমনভাবে অচল করে দেওয়া হয়েছে যে, ২.৫ থেকে ৩ লাখ টাকা খরচ না করে এটি আর চালানো যাবে না। এর ফুয়েল ট্যাঙ্কে মাটি ও পাথর ভরে দেওয়া হয়েছে এবং হাতুড়ি দিয়ে জয়েন্টগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে।" তিনি নিশ্চিত করেন যে বন আইনে নিয়মিত মামলা করা হবে এবং ফারুক নামক এক ব্যক্তি ও পান বাজারের দুটি করাতকল শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে শীঘ্রই অভিযান চালানো হবে।
আপাতত ব্যাংঝড়ি পাহাড়ের ক্ষতগুলো দৃশ্যমান—উজাড় হওয়া ঢাল, ভরাট হয়ে যাওয়া ঝিরি আর সেই নীরব বন যেখানে একসময় বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ছিল। পাহাড় চিরে বানানো রাস্তাটি এখন এক অরক্ষিত বন নিধনের সাক্ষ্য দিচ্ছে, যার ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় মানুষ তাদের পানি, জীববৈচিত্র্য আর ভবিষ্যৎ হারিয়ে যেতে দেখছে।
