যখন চট্টগ্রামের বন্দর থেকে শুরু হতো হজযাত্রা
একদম শুরুতে এখানকার মানুষ কোনপথে হজে যেতেন সে বিষয়ে জানা যায়না। জাহাজের আগে হয়ত মানুষ পায়ে হেঁটে, উট-গাধার পিঠে চড়ে যেতেন হজে। কিন্তু গণহারে যাওয়া শুরু হয় জাহাজেই। লিখিত ইতিহাস তা-ই বলে।
এছাড়া, ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল দিয়ে স্থলপথটি ছিল দীর্ঘ, কষ্টকর ও বিপদসংকুল। আবার আরবরা ছিলেন ব্যবসায়ী। তারা পালতোলা জাহাজে করে সাগরপথে বিশ্বের বিভিন্নপ্রান্তে যাওয়া-আসা করতেন।
এশিয়ার পূর্বদিকে আসা-যাওয়ার পথে তারা অবস্থান (বিশ্রাম) করতেন চট্টগ্রাম বন্দরে। এখান থেকে তারা অন্যত্র যাতায়াত করতেন। পরবর্তীতে এখানেও এসেছেন বাণিজ্যিক কারণে। আর তখন চট্টগ্রাম বন্দর ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক বন্দর।
সুতরাং সেসময়ে যে এখান থেকে যাওয়া হয়নি একথা বলা যায়না।
তবে সূচনাকাল নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও, হতে পারে এই সফরগুলো মুসলিমদের সিন্ধু বিজয়ের (৬৬৪-৭১২ খ্রিস্টাব্দ) আগেই শুরু হয়েছিল। তাছাড়া, হজযাত্রা নিয়ে যত লিখিত ইতিহাস আছে, সেগুলোও সব মধ্যযুগের।
যেমন—চট্টল তত্ত্ববিদ ও ইতিহাস গবেষক আবদুল হক চৌধুরীর 'চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা' গ্রন্থে বলা হয়েছে, সুলতানি আমলে (১৩৪০-১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ) বাংলাদেশ তথা সমগ্র পূর্ব ভারতের হজযাত্রীরা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজ করে হজে যেতেন। হজযাত্রীরা চট্টগ্রাম বা সাতগাঁও বন্দর থেকে আরবের জেদ্দা বন্দরে যেতেন। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর হয়ে আরব সাগরের গালফ অব এডেন হয়ে জেদ্দা বন্দরের দূরত্ব প্রায় ৫ হাজার ৬৩৩ নটিক্যাল মাইল।
সুলতানি আমলে হজযাত্রার আরেক প্রমাণ মেলে, ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত 'জার্নাল অব দ্য বিহার রিচার্জ সোসাইটি'তে(ভলিউম-৪২,খণ্ড-২)। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, দিল্লির সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের আমলে বিহারের বিখ্যাত এক ব্যক্তি ছিলেন হযরত মোজাফ্ফর শাহ বলখী।
তিনি হজে যাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করে চিঠি লেখেন সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের কাছে। চিঠি পেয়ে গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ হাজিদের প্রথম জাহাজে (চট্টগ্রাম বন্দর থেকে) করে তাকে হজে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
সুতরাং সুলতানি আমলে চট্টগ্রাম থেকে হজযাত্রা যে বেশ ভালোভাবেই চলেছিল সেটা নিশ্চিত।
বোম্বাই হাজি!
মোগল আমলেও হজযাত্রা হতো চট্টগ্রাম বন্দর থেকে। তবে সেসময় ভারতের সুরাট বন্দর ছিল বেশি জমজমাট।
গুজরাটের সুরাটকে সেকালে বলা হতো 'বাব-আল মক্কা' বা বন্দরে মোবারক। সম্রাট আকবরই ছিলেন প্রথম মোগল শাসক, যিনি সরকারি খরচে কিংবা ভর্তুকি দিয়ে হজযাত্রার ব্যবস্থা করেছিলেন।
তখন সমুদ্রপথে পর্তুগিজদের কার্তাজ পাস সংগ্রহ করা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ১৫৭৫ সালে পর্তুগিজদের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি সই হওয়ার পর থেকে আকবর প্রতিবছর একটি হজ নৌবহর পাঠানোর ঘোষণা দেন।
মোগল বাদশারা নিজেরা গিয়েছেন এমনটা কোথাও পাওয়া যায়না যদিও। তবে মোগল সম্রাট পরিবার থেকে প্রথম যে নারী গিয়েছিলেন, তিনি আকবরের ফুপু সম্রাট বাবরের কন্যা গুলবদন বেগম। এছাড়া ইতিহাস আছে, মোগল শাসকরা কাউকে নির্বাসন দিতে চাইলে হজে পাঠিয়ে দিতেন।
এরপর ব্রিটিশ আমলে হজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান বন্দর হয়ে ওঠে বোম্বে বা মুম্বাই বন্দর। চট্টগ্রামের বন্দর তখন প্রায় বন্ধ। ব্রিটিশ সরকারের অধিভূক্ত বার্মা, পাকিস্তান, বাঙলাদেশের মতো দূর দূরান্ত থেকে লোকেরা আসত বোম্বেতে যাবার উদ্দেশ্যে।
ফলে হজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়া এবং ফিরে আসা পর্যন্ত পুরো সময় লাগত ৬/৭ মাস।
অনেকে আবার বোম্বেতে গিয়ে লটারিতে না টিকে ফিরে আসতেন। জাহাজের আসনসংখ্যার তুলনায় আবেদনকারী হতেন অনেক বেশি। তাই লটারি করা হতো। যাদের লটারিতে নাম আসত না, তারা ফিরে যেতেন। তাই অনেকে মজা করে বলতেন, বোম্বাই হাজি!
জাহাজগুলো যেমন ছিল অস্বাস্থ্যকর, তেমন থাকত অতিরিক্ত যাত্রীতে ঠাসা
কিন্তু ঊনিশ শতকের শেষদিকে হজ ভারতীয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে, কারণ কলেরা সংক্রমণ। বিশেষ করে ১৮৬৫ সালের দিকে ভারতীয় হাজিদের মাধ্যমে আরবে কলেরা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং সেখান থেকে ছড়ায় ইউরোপ ও আমেরিকায়।
এ প্রেক্ষাপটে ভারত সরকার একাধিক আইন পাশ করে, যাতে জাহাজ চলাচল এবং কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। তবে, অধিক মুনাফার আশায় অনেক জাহাজমালিক এই নিয়মগুলো উপেক্ষা করতেন এবং যত বেশি সম্ভব যাত্রীবোঝাই করতেন জাহাজে।
জাহাজগুলো যথাযথভাবে পরীক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ ও জনবলও ছিল না। তার ওপর জাহাজগুলোর পরিবেশ যেমন ছিল অস্বাস্থ্যকর, তেমন থাকত অতিরিক্ত যাত্রীতে ঠাসা। The Times of India-এর মতো পত্রিকাগুলোতে হাজিদের দুরবস্থার বর্ণনা করে নানা রকম চাঞ্চল্যকর সংবাদ প্রকাশিত হতো তখন।
এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ভারত সরকার ১৮৮৬ থেকে ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত টমাস কুক কোম্পানিকে হজের জন্য সরকারি ভ্রমণ এজেন্ট হিসেবে নিযুক্ত করে। তবে হজ ভ্রমণে মুনাফা না থাকায় কোম্পানিটি এ সেবা বন্ধ করে দেয়। এরপর ভারতীয় হাজিরা আবার ব্রিটিশ ও ভারতীয় বিভিন্ন দালাল ও এজেন্টের সাহায্যে হজযাত্রা শুরু করেন।
১৯৩০-এর দশকের শেষদিকে, ভারতের ৭০ শতাংশ হজ জাহাজই মোগল লাইনের মালিকানাধীন ছিল। কিন্তু বোম্বে গিয়ে যাতায়াতের পথগুলো ছিল প্রতিকূল। তাই পূর্ব ভারতীয়রা যাতে কলকাতা বন্দর দিয়ে হজে যেতে পারেন, সে বিষয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রস্তাব উত্থাপন করেন চট্টগ্রামের খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী। তিনি নিজেই ছিলেন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একজন সদস্য।
ব্রিটিশ সরকার রাজি হলে, চট্টগ্রামের প্রখ্যাত শিল্পপতি এ.কে খানের শ্বশুর ফটিকছড়ির প্রখ্যাত ব্যবসায়ী আবদুল বারী চৌধুরীর শিপিং লাইনের ইংলিশতান জাহাজে করে ১৯৩৭ সালে কলকাতা বন্দর দিয়ে হজযাত্রী গমন শুরু হয়। (দৈনিক পূর্বকোণ, ২৯ মে ২০২৩, হজের ইতিহাসে চট্টগ্রামের অবস্থান)
রোজার ঈদের পরপরই চট্টগ্রাম নগরীতে হজের মৌসুম শুরু হয়ে যেত
এরপর ভারত-পাকিস্তান আলাদা হলে, ১৯৪৮ সালে সরকারিভাবে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সাগর পথে হজযাত্রী পরিবহন শুরু হয়। সেই লক্ষ্যে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ৯ একর ৩৫ শতকের একটি স্থায়ী হাজি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখান থেকে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সব হাজিরা হজে যাতায়াত করতেন।
ক্যাম্পের ভেতরে ছিল একটি প্রকাণ্ড মসজিদ, একটি দ্বিতল প্রশাসনিক ভবন ও যাত্রীদের অবস্থানের জন্য ৭টি দ্বিতল ভবন। অন্তত এক সপ্তাহ থাকতে হতো হাজি ক্যাম্পে। সেখানেই তাদের হজযাত্রার প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
এ সময় চট্টগ্রাম থেকে রোজার ঈদের পরপর 'সাফিনা-ই-আরব' ও 'সফিনা-ই-আরাফাত' নামে দুটি জাহাজ দুই ট্রিপে হজযাত্রী নিয়ে জেদ্দা গমন করত।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম-করাচি নিয়মিত জাহাজটি (শামস) চট্টগ্রাম থেকে হজযাত্রী নিয়ে করাচি বন্দরে পৌঁছত। সেখান থেকে বড় জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া হত জেদ্দায়।
পাশাপাশি বিমানসেবাও ছিল, কিন্তু অল্প কিছু সচ্ছল হাজিই ঢাকা থেকে করাচিতে বিমানে করে যেতেন।
জাহাজের প্রথম ট্রিপ ছাড়তো রোজার ঈদের সাতদিন পরে। প্রথম ট্রিপে যাওয়ার জন্য হজযাত্রীদের অনেকেই ঈদুল ফিতরের পরপরই পাহাড়তলীর হজ ক্যাম্পে চলে আসতেন। দুই জাহাজ মিলে প্রথম ট্রিপে যেতেন প্রায় ১,৩০০ হজযাত্রী।
১৯৪৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জেদ্দায় গিয়েছিলেন মোট ৩,৮৯৫ জন। দূর-দূরান্তের হজযাত্রীরা যেন নির্বিঘ্নে চট্টগ্রামে আসতে পারেন, সেজন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রেল ও অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহনের টিকিট ইস্যু করা হতো।
হজ যাত্রায় সেসময় জেলাভিত্তিক কোটা ছিল
দেশের উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের মতো জায়গাগুলো থেকে আবেদন আসত কম। ওদিকে চট্টগ্রামের কোটা পূরণ হয়ে যেত সবার আগে। তাই অন্যান্য জেলা থেকে আবেদন নিয়ে আবার চট্টগ্রামের ওয়েটিং লিস্ট থেকে নেওয়া হতো বাকিদের।
অনেকে আবার আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে অন্যান্য জেলা (যেসব জেলায় কোটা খালি থাকত) থেকে আবেদন করতেন হজের জন্য। রকিবুল ইসলামের পৈতৃক বাড়ি ঝিনাইদহে। তার মামার বাড়ি চট্টগ্রামে। মায়ের মুখে শুনেছেন, যাওয়ার সময় তার নানা আবেদন করেছিলেন তার বড় চাচাকে দিয়ে (ঝিনাইদহে)। যদিও হজের স্মৃতি যা শুনেছিলেন বাবা-চাচাদের মুখে, তার বিশেষ কিছু নেই। শুধু মনে আছে যাত্রাপথে তার দাদা অনেকরকম পশুপাখি দেখেছিলেন।
হজযাত্রীর সংখ্যা অত্যধিক থাকায় ডেক শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হত। চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিংয়ে এই লটারি অনুষ্ঠিত হতো। অন্যদিকে ১ম এবং ২য় শ্রেণির ভাড়া বেশি থাকায়, কিছু কিছু আসন খালিও যেত।
যেহেতু, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হত এবং সৌদি আরবের তীব্র গরম আবহাওয়া ও প্রচণ্ড ভিড়ে অনেক হাজি খুব দুর্বল ও অসুস্থ হয়ে পড়তেন। তাই হজযাত্রীদের সাথে যেতেন চিকিৎসক, মেডিকেল অফিসার, এবং নার্স।
খান বাহাদুর আহছানউল্লার 'আমার জীবনধারা' গ্রন্থে লিখেছেন: 'আমাদের সঙ্গে প্রচুর চাল, ডাল, ঘি, চিনি ও চা ছিল। আমাকে রান্নার ভার দেওয়া হলো। আমি দুপুরে খিচুড়ি রাঁধতাম। মঞ্জিলে মঞ্জিলে কেবল জ্বালানি কাঠ ও পানি খরিদ করা হতো। পথিমধ্যে মাছ দুষ্প্রাপ্য ছিল। তবে ছাগলের মাংস পাওয়া যেত। জাহাজ সোকোট্টার (ভারত মহাসাগরে চারটি দ্বীপের একটি মালা, ইয়েমেনের অংশ) কাছে পৌঁছালে সমুদ্রের গর্জন শুরু হয়। উত্তাল তরঙ্গে জাহাজ দুলে ওঠে। আমাদের কামরার কাচের সব বাসনপত্র ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। অন্ধকারের ভেতর আমি হাঁটু গেড়ে জাহাজের শিকল ধরে মৃত্যুর প্রহর গুনতে থাকি। ডেকের যাত্রীরা বমি ও মলমূত্র ত্যাগ করে দেয়।'
মৃতদের ভাসিয়ে দেওয়া হতো সাগরে
আয়ারল্যান্ড থেকে প্রকাশিত আইরিশ টাইমস পত্রিকায় 'অ্যান আইরিশম্যানস ডায়েরি অন আ পিলগ্রিম শিপ টু জেদ্দা' নামে লেখক নরম্যান ফ্রিম্যানের একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। যেখানে ১৯৫৪ সালের হজযাত্রীদের দুর্দশার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
ফ্রিম্যান তখন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ 'সারধানা'য় চাকরি করতেন। তিনি লেখেন, 'আমি যে জাহাজে কাজ করতাম, সেটি জেদ্দা বন্দর থেকে ১,৫০০ হজযাত্রী নিয়ে চট্টগ্রামে আনার দায়িত্ব পেয়েছিল। অপুষ্টি ও অসুস্থতার কারণে যাত্রীদের খুব কষ্ট হয়েছিল। আমাদের ডাক্তাররা যতটা সম্ভব চেষ্টা করেছিলেন। ভাগ্য ভালো ছিল যে শুধু চারজন মারা গিয়েছিলেন। কারণ এ সংখ্যা আরও বেশি হতো। তাদের লাশ ক্যানভাসে মুড়ে, সীসা বেঁধে, জাহাজের পেছন দিক দিয়ে সমুদ্রে নামানো হয়। ইমাম দোয়া পড়লেন, আর লাশগুলো গড়িয়ে ভারত মহাসাগরে ভেসে গেল।'
'শেষ পর্যন্ত যখন আমরা চট্টগ্রামে পৌঁছালাম, ক্লান্ত হজযাত্রীরা সামান্য মালপত্র হাতে নিয়ে জাহাজ থেকে নেমে গেলেন। এত কষ্ট, ভোগান্তির পরও তাদের চোখেমুখে এক ধরনের তৃপ্তি, মর্যাদাবোধ ছিল,' লিখেছেন ফ্রিম্যান।
মমতাজউদ্দীন আহমেদ পুরান ঢাকার বাসিন্দা। তিনি তার চাচির ভাইকে দেখেছেন হজের উদ্দেশ্যে রেলে করে চট্টগ্রাম যেতে। তার সেই আত্মীয় ফিরে এসেছিলেন প্রায় তিনমাস পর। সেই আত্মীয়ের মুখেই শুনেছিলেন, সহযাত্রীদের মধ্যে যারা মারা গিয়েছেন, তাদের কীভাবে সাদা কাপড়ে মুড়ে স্লিপারের মতো একটি পাটাতনে ঠেলে সাগরে ভাসিয়ে দিতে।
এ ব্যাপারে ইসলাম ও ভ্রমণ বিষয়ক লেখক এবং হজযাত্রী কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আহমেদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, মৃতদেহটি যেন ভেসে না ওঠে সেজন্য ভারী পাথর বেঁধে একটি আংটার সাহায্যে সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হতো। অনেকসময় এই মৃতদের খবর টেলিগ্রাফের মাধ্যমেই জানিয়ে দেওয়া হতো স্বজনদের। কিন্তু যারা জানতে পারতেন না, তারা গিয়ে বন্দরে অপেক্ষা করতেন প্রিয়জন ফিরে আসার আশায়।
জেটি ভরে যেত বিদায় দিতে আসাদের ভিড়ে
অনেকে ফিরে আসতে না পারার ভয়ে বা জীবনের শেষ ভ্রমণ হিসেবে হজকে বিবেচনা করতেন। তখন ধরেই নেওয়া হতো, যিনি যাচ্ছেন তিনি আর ফিরে আসবেননা। তাই যাওয়া ব্যক্তিদের বিদায় দিতে আসতেন চেনা-জানা সবাই। তারা আশেপাশের হোটেলে বা আত্মীয়দের বাসায় উঠতেন। আত্মীয়-পরিজনের কারণে এতই ভিড় হতো যে, চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে অবস্থিত চার নম্বর জেটি হজযাত্রীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। ১৭টি জেটির মধ্যে চার নম্বর জেটি ছিল সবচেয়ে বড় এবং খোলামেলা পরিবেশের।
বিদায় দেওয়ার দিন হজযাত্রীদের বাসে করে নিয়ে যাওয়া হতো বন্দরে। সকাল ৯টা-১০টা নাগাদ জাহাজে সব যাত্রী উঠে পড়লে জাহাজের সিঁড়ি তুলে নেওয়া হতো। আর নিরাপত্তা বাহিনীর ঘেরাও তুলে বন্দরে সাধারণের প্রবেশ অনুমতি দিত। তখন আত্মীয়-পরিজনেরা তো থাকতেনই, আশেপাশের লোকেরাও এসে ভিড় জমাতেন হজযাত্রীদের রওনা হওয়া দেখতে।
দোয়া ও মোনাজাত শেষে জাহাজ জেটি থেকে ধীরে ধীরে ছেড়ে যেত। দর্শনার্থীদের কেউ কান্নারত, কেউ হাসিমুখে হাত নেড়ে বিদায় দিতেন—যতক্ষণ পর্যন্ত প্রিয়জনদের দেখা যেত।
কর্ণফুলী নদী পেরিয়ে জাহাজ যখন সমুদ্রে প্রবেশ করত, তখন দেশি-বিদেশি অন্যান্য জাহাজ হুইসেল বাজিয়ে হজযাত্রীদের শুভেচ্ছা জানাত। সে সময় হাতে গোনা কয়েকজনই হজে যেতে পারতেন, তাই হজ ছিল অনেক বেশি গৌরব ও সম্মানের বিষয়।
আহমাদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, '১৯৭১ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, স্কুল কলেজ সব বন্ধ হয়ে যায়, আমি তখন ছাত্র ছিলাম। আমি চলে গেছিলাম হজ করতে। জাহাজের ডেকে বা তৃতীয় শ্রেণিতে তখন ভাড়া পড়ত ১,৯১৯ টাকা। যদিও সেবার আমার আর যাওয়া হয়নি। তবে এই টাকার মধ্যে এক হাজার টাকা সৌদি আরবে থাকা-খাওয়া খরচ এবং ৯১৯ টাকা জাহাজে খাওয়া ও ভাড়া এবং অন্যান্য সরকারি খরচ।'
'জাহাজে দ্বিতীয় শ্রেণিতে যাতায়াত করলে সবমিলিয়ে খরচ হতো ৪,৫০০ টাকা। এছাড়া প্রথম শ্রেণিতে সর্বমোট খরচ হতো ৭,০০০ টাকার কিছুটা বেশি—যা বিমানের তুলনায় আবার কম ছিল,' বলেন তিনি।
যুদ্ধ শেষে হজযাত্রীরা ছিলেন আতঙ্কে
যুদ্ধ শুরু হলে সফিনায়ে আরব ও সফিনায়ে আরাফাতের প্রথম ট্রিপ হজের উদ্দেশ্যে রওনা হলেও দ্বিতীয় ট্রিপ আর যেতে পারেনি।
আহমেদুল ইসলাম জানান, '১৯৭২ সালের ২৭ জানুয়ারি ছিল আরাফাত দিবস। ফলে হজযাত্রীরা রওনা দিয়েছেন আরও আগেই। দেশ স্বাধীন হলে তারা পড়ে যান উৎকণ্ঠায়। কারণ তাদের সব কাগজপত্র ছিল পাকিস্তান সরকারের। তারা না পাকিস্তানে ফিরে যেতে পারছেন, না বাংলাদেশে ঢুকতে পারছেন। পরে বঙ্গবন্ধু স্বয়ং জাতিসংঘের মাধ্যমে সৌদি বাদশাহ ফয়সালের কাছে চিঠি লেখেন, যাতে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে যাওয়া হজযাত্রীদের ফেরত আসার অনুমতি দেওয়া যায়। সৌদি সরকারের অনুমতি লাভের পর ভারতীয় মোহাম্মমদী জাহাজে করে দুই ট্রিপে হাজিদের পাঠানো হয়।'
কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে তখন অসংখ্য মাইন এবং জাহাজ ডুবে থাকায় তা ছিল অনিরাপদ। হাজিভর্তি জাহাজকে তাই মংলা বন্দরমুখী হতে হয়। কিন্তু নাব্যতা স্বল্পতার কারণে সেখানেও নোঙর ফেলতে ব্যর্থ হয় জাহাজ।
অবশেষে অনেক কষ্টে নদীতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চাঁদপুরে নোঙর ফেলে মোহাম্মদী জাহাজ।
এদিকে হজযাত্রীদের ফিরে আসার খবরে হাজার হাজার নিকটতম লোকজন মংলা যান তাদের গ্রহণ করতে। পরে তারা আবার চাঁদপুরে ফিরে আসেন।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২-১৯৭৫/৭৬ সাল পর্যন্ত হজ গমন ছিল সীমিত। কেননা বাংলাদেশ সৌদি আরবের স্বীকৃতি তখনও পায়নি। এরপর জাতিসংঘের মাধ্যমে বাদশাহ ফয়সালের কাছে চিঠি পাঠালে, সৌদি বাদশাহ সম্মত হন।
ভারত সরকারের সহায়তায় তখন তাদের মোহাম্মদী জাহাজে করে হজযাত্রীরা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রওনা দেন। কিন্তু মোহাম্মদী জাহাজ অতি পুরানো বিধায় পরের বছর শুধু বাংলাদেশ বিমানে মাত্র ৩ হাজার জনকে লটারির মাধ্যমে নির্ধারণ করে ঢাকা থেকে বিমানে ক্রয় হজে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
হাজিদের জন্য বাংলাদেশি একমাত্র জাহাজ, 'হিজবুল বাহার'
১৯৭৬/৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার 'হিজবুল বাহার' নামে একটি জাহাজ কেনে। এ জাহাজের ধারণ ক্ষমতা ছিল ১,৮০০ জন। যাতায়াত করতে প্রায় দুই মাস সময় লাগত। পরবর্তীতে ব্যয় সংকোচনের জন্য এ জাহাজ নৌবাহিনীকে স্থানান্তর করা হয়।
নৌবাহিনী শহীদ সালাহউদ্দিন নামকরণ করে তাদের তত্ত্বাবধানেও হজযাত্রী যাতায়াত করে কয়েক বছর। এরপর জাহাজটি মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
১৯৭৭ সালের পর ঢাকা-জেদ্দা সৌদি এয়ারলাইন্স ফ্লাইট চালু করলে পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন শুরু হয়। তখন ওমরাহ করতে আসা-যাওয়া ভাড়া ছিল ৯,০০০ টাকার কিছু বেশি। যাত্রাসময়ও কমে আসে ৬-৭ ঘণ্টায়। এ প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকলে ১৯৮০-এর দশকের শুরুতেই সমুদ্রপথে যাত্রী পরিবহন ক্রমশ কমে যায়। ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচলও বন্ধ হয়ে গেলে একসময় চট্টগ্রামের হজ ক্যাম্পটি বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর হাজিক্যাম্পকে ঘিরে একসময় হজ মৌসুমে পুরো চট্টগ্রাম শহরে বিরাজ করতো এক ধর্মীয় উৎসবমুখর, আবেগঘন পরিবেশ। আর ছিল মোয়াল্লেমদের আনাগোনা।
ব্রিটিশ রাজত্বের সময় থেকেই আরব উপদ্বীপ থেকে মোয়াল্লেমরা প্রতিবছর হজের তারিখের কয়েক মাস আগে চট্টগ্রামে এসে স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তির বাড়িতে অবস্থান করতেন। সম্ভবত ব্রিটিশ প্রশাসনের হজ ব্যবস্থাপনার বাইরে ছিল চট্টগ্রামে আরব মোয়াল্লেমদের এই ব্যবস্থাপনা। মোয়াল্লেমগণ হজযাত্রীদের আকৃষ্ট করতে এদেশ সফর করতেন।
আহমেদুল ইসলাম জানান, 'স্টেশন রোডের হোটেল মিসকাহ ছিল সেই সময়কার চট্টগ্রামের অন্যতম আকর্ষণীয় হোটেল। সেখানেই তারা থাকতেন। কিন্তু হোটেলে তারা কমই খাবার খেয়েছেন! সৌদি ভূখণ্ড থেকে এসেছেন বলে স্থানীয়রা তাদের অনেক সম্মান, শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। নিজ বাড়িতে বাড়িতে দাওয়াত করে খাওয়াতেন এসব মোয়াল্লেমদের। দাওয়াত খেয়ে কুলোতে পারতেন না মোয়াল্লেমরা।'
পাহাড়তলীর হাজী ক্যাম্প ঘিরে এই ধর্মীয় আনন্দঘন পরিবেশ ছিল পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে, হিজবুল বাহার যতদিন ছিল ততোদিন পর্যন্ত। এরপর আশির দশকে ঢাকা থেকে ফ্লাইট ব্যবস্থা চালু হলে বিভিন্ন জায়গায় অস্থায়ী ক্যাম্প নির্মিত হয়।
পরে ১৯৮৯ সালে এ হজ কার্যক্রম স্থায়ীভাবে ঢাকার আশকোনায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকেই বর্তমানে হজ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
