৫০০ কোটি টাকার বাজার, টিকে থাকার লড়াই যেমন চালিয়ে যাচ্ছে বাঁশ
দিয়াবাড়িতে বিশ থেকে বাইশটি বাঁশের আড়ৎ রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিপ্লব হোসেনের। তল্লা বাঁশ, জাওয়া বাঁশ ও বড়া বাঁশসহ নানা ধরনের বাঁশ বিক্রি করেন তিনি।
তবে বেশি বিক্রি হয় চার ধরনের বাঁশ—বরাক, রেঙ্গুনী, মুলি ও নল বাঁশ। বরাক বাঁশ আসে টাঙ্গাইল ও রংপুর থেকে, রেঙ্গুনী ও নল বাঁশ গাজীপুর থেকে, আর মুলি বাঁশ আসে চট্টগ্রাম থেকে। ময়মনসিংহ, শেরপুর, মানিকগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাঁশ উৎপাদিত হলেও মজবুত ও পুরু হওয়ায় টাঙ্গাইলের বরাক বাঁশকে সবচেয়ে ভালো বলে মনে করা হয়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাঁশের চাষ হচ্ছে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে।
দেশে বাঁশের বাজারের আকার বছরে ৫০০ কোটি টাকার বেশি। প্লাস্টিক, লোহা ও রডের এই যুগে এমন অঙ্ক অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। বাঁশের ব্যবহার সুপ্রাচীন এবং সহজলভ্য। যারা বাঁশ ব্যবহারে অভ্যস্ত, তারা অন্য উপকরণে একই স্বাচ্ছন্দ্য পান না। একসময় গ্রামীণ জীবন বাঁশ ছাড়া প্রায় অচল ছিল। এখন শহরে বাঁশের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি।
বিপ্লব হোসেন বলেন, "ঢাকায় কনস্ট্রাকশনের কাজ বেশি হওয়ায় এখানেই বাঁশের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। বিয়ের সাজসজ্জা, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের মঞ্চ ও প্যান্ডেল তৈরিতেও প্রচুর বাঁশ লাগে। ঢাকায় বাঁশের বড় বাজার রয়েছে কল্যাণপুর, রামপুরা, কামারপাড়া, সাইনবোর্ড, মেরাদিয়া, জিঞ্জিরা ও এরশাদনগরে।"
একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশে বাঁশঝাড় দেখা যেত। পুকুরপাড় ও উঁচু জমিতেও ছিল বাঁশবাগান। শহরের বড় বাড়িগুলোতেও বাঁশঝাড় ছিল সাধারণ দৃশ্য। এখন গ্রামেও খালি জমি কমে গেছে। বসতি ও দোকানপাট বাড়ায় বাঁশের বন উজাড় হচ্ছে। অথচ বাঁশ একাধিকবার ব্যবহারযোগ্য, সহজে মাটিতে মিশে যায় এবং শেষে জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। এক মণ জ্বালানি বাঁশের দাম প্রায় ৩০০ টাকা।
বিপ্লব হোসেনের বয়স এখন আটচল্লিশ। বাঁশ ব্যবসায় জড়িয়েছেন নবম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে। ঘটনাটা ঘটেছিল বাবা তার পড়ার বই নদীতে ছুড়ে ফেলার পর।
বাবার আর কী দোষ! পড়াশোনায় বিপ্লবের মন নেই। সে যাত্রা করে বেড়ায়।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে বিপ্লবদের বাড়ি—যাত্রাগান, সঙগানের বিখ্যাত জায়গা। বিপ্লব বই তাকে তুলে যাত্রায় বেরিয়ে যায় সুযোগ পেলেই। বাবা তাই রাগ করে একদিন বইগুলো এলানজানি নদীতে ছুড়ে ফেললেন। বিপ্লব ভাবল এই তো সুযোগ মন মিটিয়ে গান বাজনা করে নিই। কিন্তু কিছুদিন পর আর ঘোরাঘুরি তার ভালো লাগে না।
এক চাচাতো ভাই, যিনি চট্টগ্রামে ব্যবসা করতেন তিনি বিপ্লবকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। পতেঙ্গায় এক বাঁশের দোকানে বিপ্লব কাজ পেল শিক্ষানবীশ কারিগর হিসেবে। দা, করাত, গুনা, পেরেক, হাতুড়ি-বাটাল এগিয়ে দিত সিনিয়রদের।
তারপর এক চাচার মাধ্যমে গেল ফটিকছড়ির আরেক বাঁশের দোকানে। সেখানে চাটাই বানানো, মই বানানো, মাচা বানানোর কাজ শিখল। পরে কিছুকাল ছিল কুমিল্লায়। এর মধ্যে তিনি দক্ষ কারিগর হয়ে উঠেছেন।
বিয়ের পয়গাম এলো খুলনা থেকে। স্ত্রীর পরিবারের বসতি অবশ্য ঢাকার নবাবেরবাগে। বিয়ের পর স্ত্রীর হাত ধরেই ঢাকায় আসা। ঢাকায় এসে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের ব্যবসা দাঁড় করাবেন। ব্যবসা শিখতে যাওয়া-আসা করতে থাকেন এক বন্ধুর দোকানে। সেখানে পরিচয় হয় এক বাঁশ জোগানদারের সঙ্গে।
দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বাঁশ জোগাড় করে এনে তিনি বিভিন্ন দোকানে সরবরাহ করেন। দিনে দিনে বিপ্লবের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। বিপ্লব তাকে মনের বাসনা খুলে বলেন।
নিজের ব্যবসা দাঁড় করাতে চাইলেও পুঁজির সংকট তার। স্ত্রীর পরিবারের সূত্রে এলাকায় কিছু প্রভাব তৈরি করেছেন। তুরাগ পাড়ে ছোট এক খুপড়ি ঘর দিয়ে বসেছেন। এক ঘরের বাঁশ অন্য ঘরে পৌঁছে দিয়ে মাঝখান থেকে যৎসামান্য আয় হয়। খরচ বাদ দিয়ে পুঁজি দাঁড়িয়েছে ১,৩০০ টাকা। একদিন ওই জোগানদার বললেন, 'আমি তোমাকে কিছু মাল দেব, বেঁচা-বিক্রি হলে পরে টাকা শোধ দিও।'
বিপ্লবের দ্বিধা কাটে না, যদি লোকসান হয় তবে শুরুতেই বদনাম হয়ে যাবে। কিন্তু জোগানদার ভরসা করলেন। একদিন সত্যি সত্যি ৬০,০০০ টাকার বাঁশ এনে বিপ্লবকে খবর পাঠালেন। ভাগ্য ছিল সুপ্রসন্ন, নৌকা থেকে মাল নামাতে নামাতে ২০,০০০-২২,০০০ টাকার বাঁশ বিক্রি হয়ে গেল। এতে নিজের ওপর আস্থা তৈরি হলো আর জোগানদারও সন্তুষ্ট হলেন। তাই বলতে গেলে বিনা পুঁজিতেই কর্মচারী থেকে মহাজন বনে গেলেন বিপ্লব হোসেন।
বাঁশ বিক্রি হয় পিস হিসেবে। বিপ্লব যখন ব্যবসা শুরু করেন, তখন প্রতি পিস বরাক বাঁশের দাম ছিল ১০০ টাকা—যা এখন ৩৫০-৪০০ টাকা। রেঙ্গুনি বাঁশ ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, যার দাম এখন ২০০ টাকা। কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণ কাজে প্রথম পছন্দ বরাক বাঁশ। এটি গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত বেশ পুরো হয়। খুঁটি আর মাচার ভিত হিসেবেও বরাক বাঁশের বেশ চাহিদা।
রেঙ্গুনি বাঁশে ভালো হয় মই ও ছিপ। বাঁশটি ছিপছিপে একহারা গড়নের। তাই মই হিসেবে এর ব্যবহার অনেক আর আগার দিকটা একইসঙ্গে শক্ত ও নমনীয় বলে মৎস্যশিকারিদের বেশ পছন্দ। মইয়ের ব্যবহার এখনো ঢাকায় অনেক। ১২, ১৫, ২০ ফুটের বাঁশের মইয়ের ব্যবহার এই লোহা ও স্টিল যুগেও বেশ দেখা যায়। বিশেষ করে বিদ্যুতের লাইন যারা সারাই করেন ও ইন্টারনেট লাইন সংযোগ দেন, তারা বাঁশের মই পছন্দ করেন বেশি।
এক ফুট মই বিক্রি হয় নব্বই থেকে ১০০ টাকা দামে, সে হিসেবে ২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে একটি মইয়ের দাম প্রায় ২,০০০ টাকা।
মুলি বাঁশের ব্যবহার বেশি খলফা বা চাটাই তৈরিতে এবং ঘরের বেড়া দিতে। এক হাত চাটাই ২০০০ সালে ছিল ১৫ টাকা, এখন তা ১২০ টাকা। জাওয়া আর বড়া বাঁশের ব্যবহার বেশি কুটির শিল্পে।
জাতীয় ঈদগাহে প্যান্ডেল তৈরিতে ৪০,০০০ এর বেশি বাঁশ লাগে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এর ব্যবস্থাপনা তদারকী করে। বিপ্লব একবার ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসের আয়োজনে বাঁশ দিয়ে একটি স্টিমার তৈরি করে দেওয়ার কাজ পেয়েছিলেন। ১০০ ফুট দীর্ঘ ও ২০ ফুট প্রস্থের সেই স্টিমারটি তৈরিতে ১০-১২ দিন সময় লেগেছিল। ১৫ জন কারিগর তিনি নিযুক্ত করেছিলেন। বাজেট ছিল প্রায় ৫ লাখ টাকা।
আবার একবার ১০,০০০ বাঁশের খাঁচি তৈরির কাজ পেয়েছিলেন। ইসিবি চত্বর থেকে মিরপুর-১ পর্যন্ত রাস্তায় গাছের চারা রক্ষাকাজে সেগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। সিলেটের চুনারুঘাটেও ৭,০০০ খাঁচি সরবরাহ করেছিলেন।
বিপ্লব বললেন, "কুলা, ডুলা, চালুনি হিসেবে বাঁশের বিকল্প ছিল না ২৫-৩০ বছর আগেও। এখন এ সবই তৈরি হয় প্লাস্টিক দিয়ে। এখন জীবনটাই প্লাস্টিকের জীবন। তবে কিছু মানুষ আছেন যারা সৌখিন তারা বাঁশের শোপিস, সোফাও পছন্দ করেন।"
তবে দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকের আবার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাঁশের জিনিসপত্র ব্যবহার করতে পারছেন না বলে জানালেন বিপ্লব। দাম বেড়ে যাওয়ার পিছনের বড় কারণ সরবরাহ কম ও পরিবহন খরচ বেশি।
"শহরে কনস্ট্রাকশন কাজের সেন্টারিংয়ে (অস্থায়ী সাপোর্ট সিস্টেম) বেশি বাঁশ লাগে। আগে ঘর-বাড়িই তৈরি হতো বাঁশ দিয়ে, আমরা বাঁশের খুঁটিতে পকেট বানিয়ে পয়সা জমাতাম, বাজার-সদাই আনতে ডুলা ছিল ভরসা, মা-খালারা চাল ঝাড়তেন বাঁশের তৈরি কুলায়। বাঁশ-কোড়ল ভালো করে রাঁধলে ফুলকপির চেয়ে টেস্টি (সুস্বাদু) হয়। মুর্দ্দার দাফনে বাঁশের চাটাই ছাড়া অন্য কিছুর কথা এখনো ভাবা যায় না," যোগ করেন বিপ্লব।
আরও বললেন, "জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বাঁশের ব্যবহার ছিল। এখন প্লাস্টিক, পলিথিন সব কিছুর দখল নিচ্ছে। গত ২৫-৩০ বছরে বাঁশের ব্যবহার কমেছে ৫০ ভাগের বেশি। পাটের মতো বাঁশকেও আমরা দূরে ঠেলে দিচ্ছি।"
ঘাস গোত্রের ভেষজ উদ্ভিদ হলো বাঁশ। কিছু প্রজাতির বাঁশ একদিনে সাড়ে সাতাশ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হয়। বাঁশ অন্যান্য উদ্ভিদের তুলনায় তিন থেকে চারগুণ বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে। বাঁশ একটি আদর্শ শব্দ শোষক। শব্দ নিরোধী পর্দা হিসেবে বাঁশের উপযোগিতা গবেষণায় প্রমাণিত। এটি কীটপ্রতিরোধী, ছায়াময়, সবুজ স্থান তৈরি করে।
এমনকি, বাঁশের ঘর ভূমিকম্প সহনীয়। ফলে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ জাপানে প্রচুর বাঁশের ঘর দেখা যায়। এখনো পৃথিবীর প্রায় ১০০ কোটি লোক বাঁশের ঘরে বসবাস করেন।
অথচ আমরা বাঁশের বদলে প্লাস্টিককে জায়গা করে দিচ্ছি। এতে শরীর যেমন খারাপ হচ্ছে, মনেও পড়ছে বিরূপ প্রভাব। বাঁশ বাগানের মাথায় চাঁদ দেখার সুযোগ আর বাঙালির থাকছে না, বরং জীবন ঝুলে পড়ছে প্লাস্টিকের ডগায়।
ছবি: সালেহ শফিক