ঢাকায় ইংলিশ মিডিয়ামের টিউশনিতে মাসে ১২ লাখ টাকা আয় করাও সম্ভব!
কাজী ফারহান মাহির বয়স যখন মাত্র ১৯ বছর, তখনই তার মাসিক আয় ছিল ঢাকার অনেক পেশাজীবীর পাওয়া প্রাথমিক বেতনের চেয়েও বেশি। তবে এমনটা হবে, তা তার পরিকল্পনাতে ছিল না। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার কথা তিনি কখনো ভাবেননি, এমনকি সে সময় এটাকে দীর্ঘমেয়াদী কোনো ক্যারিয়ার হিসেবেও কল্পনা করেননি। সতেরো বছর বয়সে অনেকটা বাধ্য হয়েই তিনি টিউশন করা শুরু করেন। নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার খরচ জোগাতে তখন স্বাবলম্বী হওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ ছিল না।
বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা বেশ ব্যয়বহুল। সেই সময় মাহির পরিবার এক চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। কোনো কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় এবং নিজে শিক্ষার্থী হওয়ায় টিউশনিই ছিল তার একমাত্র ভরসা। দেশের অন্য সব মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের মতো তিনিও অনেকটা আর্থিক প্রয়োজনেই গৃহশিক্ষক হিসেবে হাতেখড়ি দেন।
যা শুরু হয়েছিল সাময়িক সমাধান হিসেবে, তা-ই ধীরে ধীরে স্থায়ী পেশায় রূপ নিল। শুরুতে মাহি বাসায় গিয়ে পড়াতেন এবং বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। বহু বছর পর আজ তিনি 'রেভারি স্কুল'-এর মিডল ইয়ারস থেকে এ লেভেল-এর শাখা প্রধান (হেড অব সেকশন)। এই দীর্ঘ পথচলার গল্পটি শুনতে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবতা ততটা মসৃণ ছিল না।
এ লেভেল শেষ করার পর মাহির স্বপ্ন ছিল বিদেশে পড়তে যাওয়ার। কিন্তু বৃত্তির ব্যবস্থা না হওয়ায় তাকে বাংলাদেশেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়। আর এখানেই দেখা দেয় নতুন বিপত্তি। মাহি বলেন, 'ইংলিশ মিডিয়াম ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বেশ কঠিন। তাই আমাকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হতে হয়। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ অনেক বেশি হওয়ায় পড়াশোনার খরচ জোগাতে আবার সেই টাকারই প্রয়োজন পড়ল।'
তত দিনে টিউশনিটা তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারই একজন শিক্ষক পরামর্শ দিলেন স্কুলে চাকরির জন্য আবেদন করতে। মাহি বলেন, 'আমি ভাবলাম, স্কুলে যোগ দিলে আরও বেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।'
এর পর একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। সেই থেকে তার জীবন স্কুল, কোচিং আর প্রাইভেট টিউশনের ত্রিমুখী ব্যস্ততায় বন্দি। তবে এই পথ বেছে নেওয়ায় তার কোনো অনুশোচনায় ভুগতে হচ্ছেনা। মাহির ভাষায়, 'আমি পড়ানোটা খুব উপভোগ করি। যখন আমার শিক্ষার্থীদের কোনো অর্জন দেখি, তখন এক অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করে।' মাহির কাছে এই কাজ এখনো অর্থবহ, তবে সবার ক্ষেত্রে চিত্রটা এমন থাকে না।
প্রায় একই কারণে শিক্ষকতায় এসেছিলেন ও/এ লেভেলের ইংরেজির সাবেক শিক্ষক নায়লা শাহ। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি টিউশনি শুরু করেন। তিনি বলেন, 'আমি যখন টিউশনি শুরু করি, তখন আমি নিজেরই বয়স অনেক কম।' কয়েক বছর পর তিনি একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন।
২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নায়লা চারটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। এর পাশাপাশি ধানমন্ডি ও গুলশানের বিভিন্ন কোচিং সেন্টার এবং বাসায় গিয়েও তিনি শিক্ষার্থীদের পড়াতেন।
নায়লা বলেন, 'এত বছর ধরে যা অপরিবর্তিত ছিল, তা হলো কোচিং। স্কুলে পড়ালে শিক্ষার্থীরা আপনাকে চেনে, আপনার ওপর ভরসা করে। সেই বিশ্বাস খুব সহজেই শ্রেণিকক্ষ থেকে কোচিং সেন্টার হয়ে শিক্ষার্থীদের বাসায় পৌঁছে যায়।' ২০২০ সালের পর নায়লা অনলাইনে পড়ানো শুরু করেন। কিন্তু ভালো আয় হওয়া সত্ত্বেও ২০২৫ সালের শুরুতে তিনি এই পেশা ছেড়ে দেন।
মাহি এবং নায়লার মতো এমন অসংখ্য গল্প আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে গড়ে ওঠা এক বিশাল অনানুষ্ঠানিক কাঠামোর দিকে ইঙ্গিত দেয়। পরীক্ষার চাপ, অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা আর স্কুলের সীমাবদ্ধতার কারণে ইংরেজি মাধ্যমকে কেন্দ্র করে এক বিশাল কোচিং ও প্রাইভেট টিউশন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বাইরে থেকে এর গভীরতা বোঝা কঠিন; কারণ এর কোনো সরকারি পরিসংখ্যান বা নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আর টিউশন ফির অঙ্ক দেখলে এই ব্যবসার ব্যাপ্তি বোঝা যায়।
মাহির মতে, এই খাতে আয় নির্ভর করে একজন শিক্ষক কতটা শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করতে পারবেন তার ওপর। তিনি বলেন, 'একজন শিক্ষক প্রতি মাসে ৯০ হাজার থেকে শুরু করে ১০-১২ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। এমনকি আমি এমন শিক্ষককেও চিনি যারা কোচিং পরিচালনা করে মাসে ৩০ থেকে ৩২ লাখ টাকা আয় করেন।' যেহেতু এটি কোনো নির্দিষ্ট বেতন কাঠামোর পেশা নয়, তাই এখানে সময়, শ্রম আর পরিচিতি সরাসরি টাকায় রূপান্তরিত হয়।
এই ব্যবস্থা ফুলেফেঁপে ওঠার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। অন্যতম একটি কারণ হলো পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ার নমনীয়তা। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা স্কুল বা প্রাইভেট—উভয় পদ্ধতিতেই ও/এ লেভেল পরীক্ষার জন্য নিবন্ধন করতে পারে। অনেকের কাছেই এটি একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত।
এ লেভেলের শিক্ষার্থী ধ্রুপদী অদিতি এই ব্যবস্থার স্বরূপ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, 'ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটা বাদ দিলে, একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর পড়াশোনা আর অতটা জোরালো থাকে না।' তবে স্কুলের মাধ্যমে নিবন্ধিত হওয়া এখনো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রাতিষ্ঠানিক প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়। কিন্তু খরচ আর নমনীয়তার কারণে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা ভিন্ন পথ বেছে নেয়।
অদিতি বলেন, 'অনেকে প্রাইভেটভাবে পরীক্ষা দিতে পছন্দ করে। যারা নিয়মিত স্কুলে যায় তারাও কোচিং করে, তবে প্রাইভেট পরীক্ষার্থীরা পুরোপুরি কোচিং সেন্টার ও গৃহশিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল। আমি নিজেও 'ও লেভেল' পরীক্ষার জন্য কোনো স্কুলে ভর্তি হইনি, যদিও একাডেমিয়া স্কুলের অধীনে রেজিস্ট্রেশন করেছিলাম।'
পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ফি এমনিতেই অনেক বেশি। তার ওপর স্কুলের বেতন, কোচিং আর প্রাইভেট টিউটরের খরচ যোগ করলে অনেক পরিবারের জন্যই তা বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ধ্রুপদী প্রশ্ন তোলেন, 'যদি স্কুল শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরণ করতে না পারে, তবে কেন তারা প্রাইভেট টিউশন খুঁজবে না? এত টাকা খরচ করে কেউ তো বারবার পরীক্ষা দিতে চায় না।'
শিক্ষার্থীদের এই চাহিদা একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা তৈরি করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষকেরা এই পেশায় আসেন আর্থিক প্রয়োজনে—নিজের পড়াশোনার খরচ চালানো, স্বাবলম্বী হওয়া বা পরিবারকে সাহায্য করতে। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। মাহি বলেন, 'আমার এমন কিছু শিক্ষার্থী আছে যারা শুধু শেখানোর আনন্দ থেকে পড়ায়।' তবে কেবল আনন্দ দিয়ে এই হাড়ভাঙা খাটুনি দীর্ঘকাল চালিয়ে নেওয়া কঠিন।
সাধারণত একজন-দুজন শিক্ষার্থী দিয়ে শুরু হলেও চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকেরা কোচিংয়ের দিকে ঝোঁকেন। প্রায়ই কয়েকজন শিক্ষক মিলে একটি বা দুটি কক্ষ, এমনকি পুরো একটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে কোচিং সেন্টার শুরু করেন। এই চক্র বজায় রাখতে শিক্ষকেরা স্কুলেও কাজ করার চেষ্টা করেন। স্কুলের মাধ্যমে পরিচিতি বাড়ে, কোচিংয়ে বাড়ে আয়ের পরিধি, আর হোম টিউশনিতে থাকে সময়ের স্বাধীনতা। বেশির ভাগ শিক্ষকই এই তিনের সমন্বয় করে চলেন।
এলাকাভেদে টিউশন ফি-তে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যায়। আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রম এবং বিশেষায়িত শিক্ষা ব্যবস্থা হওয়ায় ইংলিশ মিডিয়ামের টিউশন ফি অন্য মাধ্যমের তুলনায় সব সময়ই বেশি। মাহি জানান, ধানমন্ডিতে যে টিউশনির ফি আট থেকে দশ হাজার টাকা, গুলশানে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকায়। এলাকা এবং পরিবারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে কোচিংয়ের ফি-ও একইভাবে পরিবর্তিত হয়।
নিঃসন্দেহে এখানে টাকার অংকটা বড়। তবে এর বিনিময়ে যে শ্রম দিতে হয় তা ভয়াবহ। স্কুল, কোচিং, হোম টিউশনি আর নিজের পড়াশোনার ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে মানুষ খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে; বিশেষ করে যারা অল্প বয়সে শুরু করেন।
নায়লা বলেন, 'দীর্ঘ সময় ধরে আমি একইসঙ্গে সব করেছি। স্কুলে পড়িয়েছি, কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিয়েছি, আবার নিজেও তখন একজন শিক্ষার্থী ছিলাম। একটা সময় মনে হলো, আর নয়। আমার বিশ্রাম প্রয়োজন।'
এই ক্লান্তির পাশাপাশি পেশাগত স্থবিরতাও কাজ করে। নায়লার মতে, 'শুরুতে অনেক কিছু শেখার থাকলেও কয়েক বছর পর মনে হয় আর কোনো উন্নতির সুযোগ নেই। একই কাজ বারবার করা হচ্ছে। আয় ভালো হলেও মনে হচ্ছিল আমি স্থবির হয়ে গেছি। এখানে নতুন কিছু শেখার প্রয়োজন পড়ে না। একই পড়া বারবার না পড়িয়ে আমার কাজ দিয়ে আরও ভালো কিছু দেওয়ার সুযোগ ছিল।'
মাহি ও এই পেশার সীমাবদ্ধতাগুলো বোঝেন। তিনি বলেন, 'আপনার আয় নির্ভর করে আপনার শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার ওপর। ৩৫ বা ৪০ বছরের পর আপনি সেই উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করতে পারবেন না যা ২০ বছর বয়সে পারতেন। এ কারণেই অনেকে শেষ পর্যন্ত পেশা পরিবর্তন করেন।'
এ ছাড়া সামাজিক মর্যাদা বা স্বীকৃতির বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত চাকরিগুলোতে বেতন কম হলেও সেখানে এক ধরনের সামাজিক নিশ্চয়তা ও মর্যাদা পাওয়া যায়।
তবে এই পরিবর্তন সহজ নয়। প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির শুরুতে সাধারণত বেতন অনেক কম থাকে। মাসে তিন-চার লাখ টাকা আয়ে অভ্যস্ত একজনের জন্য হঠাৎ করে লাখ টাকার কম বেতনের চাকরিতে ঢোকাটা বড় এক ত্যাগ। জীবনযাত্রা, পারিবারিক দায়িত্ব আর প্রত্যাশার সঙ্গে তখন আপস করতেই হয়।
পরিশেষে, সবকিছুই নির্ভর করে ব্যক্তিগত অগ্রাধিকারের ওপর। মাহির মতো যারা এই কাজটিকে ভালোবাসেন এবং চালিয়ে নিতে চান, তারা থেকে যান। আর নায়লার মতো যারা মনে করেন অর্জনের চেয়ে বিসর্জনই বেশি হয়ে যাচ্ছে, তারা এই গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসেন।
