সাশ্রয়ী, শব্দহীন ও পরিবেশবান্ধব: ঢাকার আবাসিক এলাকায় বৈদ্যুতিক শাটল বাসের সাফল্য
হাসান শাহেদ বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ৩০০ ফিট প্রবেশপথের কাছে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখেন একটি লাল রঙের শাটল বাস ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। দীর্ঘদিনের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও এর আগে কখনও এমন বাস দেখেননি তিনি। তাই সকসময় রিকশায়ই যাতায়াত করতে তিনি।
তার দাঁড়ানোর জায়গা থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে এসে থামল বাসটি।
প্রথমে একটু দ্বিধায় ভুগলেও শেষ পর্যন্ত তিনি বাসটিতে ওঠার সিদ্ধান্ত নেন। আর আশ্চর্যজনকভাবে হিসেবে সেটা হয়ে ওঠে এক আরামদায়ক অভিজ্ঞতা, যা ধীরে ধীরে তার প্রাত্যাহিক যাতায়াতের অংশ হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, 'বাসটা চলতে শুরু করলে বুঝতে পারলাম এই যাত্রা কেবল স্বচ্ছন্দই নয়, সাশ্রয়ীও।'
বসুন্ধরা এলাকায় যানজট এবং অতিরিক্ত রিকশাভাড়া কমাতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে বৈদ্যুতিক শাটল বাস পরিষেবা। এর সর্বনিম্ন ভাড়া মাত্র ১০ টাকা। পরিবেশবান্ধব এই বাসগুলো ৩০০ ফিট প্রবেশপথ থেকে শুরু করে এভারকেয়ার হাসপাতালের পকেট গেট পর্যন্ত চলাচল করছে।
অন্য একটি রুটের বাসগুলো যাতায়াত করছে আই ও কে ব্লকের মতো দূরবর্তী এলাকায়।
শাটল বাস চালুর ফলে বাসিন্দা ও নিয়মিত যাত্রী—দুই পক্ষের জীবনেই ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
হাসান বলেন, 'এটি একেবারে সময়োপযোগী পদক্ষেপ।'
তিনি প্রতিদিনই এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেন, কারণ তার দুই সন্তান বসুন্ধরার দুটি স্কুলে পড়ে।
তিনি বলেন, 'ব্যস্ত সময়ে রিকশা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, আর চালকেরা তখন ভাড়াও বাড়িয়ে দেন। কিন্তু শাটল বাস চালুর পর থেকে রিকশার ওপর চাপ অনেকটাই কমে গেছে, ফলে আমাদের মতো নিয়মিত যাত্রীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে।'
বসুন্ধরার এক শাটল বাসচালক সোহেল রানা জানান, সেবা চালুর এক মাসের মধ্যেই যাত্রীদের চাহিদা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। বর্তমানে ৩০০ ফিট থেকে এভারকেয়ার পর্যন্ত তিনটি বাস চলছে, অন্যদিকে আই ও কে ব্লকে চালু আছে আরও ১০টি বাস। শিগগিরই আরও নতুন বাস সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, 'মানুষ এই সেবাকে দারুণভাবে গ্রহণ করেছে এবং যাত্রীরাও খুব সন্তুষ্ট। যেমন-৩০০ ফিট থেকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত ভাড়া ১০ টাকা, আর এভারকেয়ারে গেলে ২০ টাকা। যেখানে রিকশাভাড়া ৫০ টাকার মতো পড়ে।'
আবাসিক কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই শাটল বাসগুলোতে যাত্রীরা উভয় দিক থেকেই উঠতে পারেন এবং প্রতিটি বাসে একসঙ্গে ১০ জন যাত্রী পরিবহন করা যায়। সকাল ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এই সেবা চালু থাকে, তবে দুপুর ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত এক ঘণ্টা বিরতি রাখা হয়।
ঢাকার আবাসিক এলাকায় বৈদ্যুতিক শাটল বাসের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা।
বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, 'এর বেশ কিছু ইতিবাচক দিক আছে। প্রথমত, এটি ইজিবাইকের মতো শব্দদূষণ করে না, যা আবাসিক এলাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, এটি একসঙ্গে অনেক যাত্রী পরিবহন করতে পারে, ফলে জায়গা বাঁচে—এটি একটি বড় সুবিধা।'
তার মতে, রিকশার মতো ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিবহনের বিপরীতে এই বাসগুলো প্যারাট্রানজিট সেবার আওতায় পড়ে, এখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে এর যাত্রী তুলতে হয় না; বরং একটি ধারাবাহিক গতি বজায় রেখে চলে।
অপরদিকে, ই-রিকশার জন্য যেমন চালানোর জায়গা লাগে, তেমনি পার্কিংয়ের জন্যও আলাদা জায়গা প্রয়োজন হয়।
তিনি বলেন, 'এই শাটল বাস প্রতিটিতে ১০ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারে। অর্থাৎ কার্যত এটি ৫ থেকে ১০টি রিকশার বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে, তাও অনেক বেশি দক্ষ উপায়ে।'
এটি যানজট কমাতে সহায়ক এবং পরিষেবাটি যদি ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হয়, তবে পার্কিংয়ের প্রয়োজনও থাকে খুবই কম। আবাসিক এলাকায়, যেখানে নিরবতা গুরুত্বপূর্ণ, শব্দহীন এই বাসগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এই বাসগুলোর জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়বে। কারণ ব্যবহারকারীরা এখন আর ব্যয়বহুল রিকশার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য নন। এটি একেবারে স্পষ্ট, সাশ্রয়ী বিকল্প।
অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, 'এই মডেলটি ইতোমধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অনেক আবাসিক এলাকা এই ব্যবস্থা চালুর কথা ভাবছে।'
তিনি বলেন, 'উদাহরণস্বরূপ উত্তরায় বাসিন্দারা অটোরিকশার শব্দদূষণে বিরক্ত। এসব অটোরিকশা শুধু শব্দই করে না, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ায়। তার বিপরীতে বৈদ্যুতিক শাটল বাসগুলো শান্ত এবং এগুলোর গতি কম, ফলে নিয়ন্ত্রণ সহজ। বড় আকারের কারণে এগুলো মোটরগাড়ির মতো চলাচল করে, যা নিরাপত্তার দিক থেকেও ইতিবাচক।'
তিনি আরও বলেন, 'নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব এবং ব্যয় সাশ্রয়ের দিক বিবেচনা করলে এই ব্যবস্থা টেকসই হবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এর সুফলগুলো একেবারে চোখে পড়ার মতো।'
সাশ্রয়ী ভাড়ার কারণে এই শাটল বাস শুধু বাসিন্দাদের জন্যই নয়, বরং আবাসিক এলাকায় কাজ করা নিম্ন আয়ের পেশাজীবীদের জন্যও বিশেষভাবে উপকারী। যেমন: গৃহকর্মীদের প্রতিদিন একাধিক স্থানে যেতে হয়।
বসুন্ধরার একটি ফ্ল্যাটে কর্মরত গৃহকর্মী রেহানা খাতুন বলেন, 'আমার কাজের জন্য বিভিন্ন ব্লকের একাধিক বাড়িতে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু রিকশাভাড়া আমাদের জন্য খুব কষ্টসাধ্য। এখন এই শাটল বাসের কারণে অনেক সহজ হয়ে গেছে যাতায়াত।'
তিনি আরও জানান, '৩০০ ফিট প্রবেশপথ থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালের পকেট গেট পর্যন্ত এই বাসে যেতে ২০ টাকা লাগে, আর তার মাঝের ছোট ছোট দূরত্বের জন্য ভাড়া মাত্র ১০ টাকা। আমাদের মতো লোকজনের পক্ষে এর মাধ্যমে কর্মস্থলে পৌঁছানো অনেক সহজ হয়ে গেছে।'
এই পরিবহন সেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে শাটল বাসচালক সোহেল রানা আশাবাদী।
তিনি বলেন, 'আমি বিশ্বাস করি এই পরিষেবা দিনে দিনে আরও জনপ্রিয় হবে। কারণ আমাদের যাত্রীরা এই পরিষেবা নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট।'
