ক্যান্সারের কাছে হার মানলেন মার্কিন কান্ট্রি মিউজিকের কিংবদন্তি ডলি পার্টন
কান্ট্রি মিউজিকের সর্বকালের অন্যতম সেরা গায়িকা, গীতিকার এবং সমাজসেবী ডলি পার্টন মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
ইনস্টাগ্রামে তাঁর ভাগ্নে ব্রায়ান সিভার ডলি পার্টনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে লিখেছেন, 'আমি এই মুহূর্তের ভয়াবহতা কল্পনা করেছিলাম, কিন্তু এখন তা বাস্তবে অনুভব করছি। তাঁর পাশে থাকাটা ছিল আমার জন্য এক পরম সম্মান—যে সম্মান আজ মিশ্রিত হয়েছে গভীর গর্ব এবং তীব্র বিষাদে।'
ডলি পার্টনের অফিশিয়াল টিম নিশ্চিত করেছে যে, ক্যান্সারের সঙ্গে স্বল্পকালীন লড়াইয়ের পর গত মঙ্গলবার তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'ডলি আজ ভ্যান্ডারবিল্ট-ইঙ্গরাম ক্যান্সার সেন্টারে তাঁর প্রিয়জনদের পরিবেষ্টিত অবস্থায় ইহলোক ত্যাগ করেছেন।'
ডলি পার্টন কতটা প্রতিভাবান ছিলেন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা দুটি গান 'জোলিন' এবং 'আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ' তিনি মাত্র একদিনে লিখেছিলেন। তাঁর গান লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সাবলীল গল্প বলা, গভীর আবেগ এবং সুরের মেলবন্ধন। কয়েকশ গানের অসামান্য ভাণ্ডার থেকে তিনি রেকর্ড ২৫টি মার্কিন কান্ট্রি 'নম্বর ওয়ান' সিঙ্গেল এবং কান্ট্রি টপ টেন চার্টে ৪৭টি অ্যালবাম উপহার দিয়েছেন।
১৯৮০ সালে তাঁর 'নাইন টু ফাইভ' গানটি দিয়ে তিনি পপ চার্টের শীর্ষে উঠে আসেন। গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি অভিনয়েও তাঁর মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন এবং দুইবার গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। এছাড়া তাঁর সমাজসেবামূলক প্রজেক্ট 'ইমাজিনেশন লাইব্রেরি'-র মাধ্যমে তিনি শিশুদের জন্য ৩০ কোটিরও বেশি বই দান করেছেন।
তীব্র রসবোধ ও চমৎকার ব্যক্তিত্বের জন্য পরিচিত ডলি পার্টনের তাঁর নিজের সাজগোজ ও চটকদার চেহারা নিয়ে একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল—"এই সস্তা লুকটি ধরে রাখতেও অনেক টাকা খরচ করতে হয়।"
টেনেসি অঙ্গরাজ্যের একটি জরাজীর্ণ এক কামরার ঘরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন ডলি পার্টন। ১২ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় গান 'কোট অব মেনি কালার্স' ছিল তাঁর মায়ের জোড়াতালি দিয়ে সেলাই করা পোশাক পরিধানের দিনগুলোকে নিয়ে।
ডলির প্রথম গিটারটি তৈরি হয়েছিল ম্যান্ডোলিন বডির সঙ্গে বেস গিটারের তার জোড়াতালি দিয়ে। পরবর্তীতে মাত্র আট বছর বয়সে তাঁর চাচা তাঁকে একটি আসল গিটার উপহার দেন। এরপর মাত্র ১০ বছর বয়সে চার্চের গায়িকা থেকে স্থানীয় টেলিভিশনে এবং ১৩ বছর বয়সে প্রথম গানের রেকর্ড প্রকাশ করেন তিনি। ওই বছরই কান্ট্রি মিউজিকের প্রাণকেন্দ্র ন্যাশভিলের 'গ্র্যান্ড ওল অপরে'-তে গান গাওয়ার সময় কিংবদন্তি জনি ক্যাশ ডলিকে মঞ্চে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
১৯৬৪ সালে হাইস্কুল পাসের পর তিনি ন্যাশভিলে চলে আসেন এবং শুরুতে গায়িকার চেয়ে একজন গীতিকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি কার্ল ডিনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন—যিনি ২০২৫ সালে মারা যান। ২০১৬ সালে এই দম্পতি তাঁদের বিয়ের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করেছিলেন।
১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় 'জোলিন' গানটি, যা যুক্তরাজ্যে দারুণ সাফল্য পায়। আর 'আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ' গানটি ছিল তাঁর দীর্ঘদিনের মিউজিক পার্টনার পোর্টার ওয়াগোনারকে বিদায় জানানোর গান। ১৯৭৪ সালের এই গানটি ১৯৯২ সালে বিশ্বখ্যাত গায়িকা হুইটনি হিউস্টন তাঁর 'দ্য বডিগার্ড' চলচ্চিত্রের জন্য নতুন করে গাইলে তা বিশ্বজুড়ে ইতিহাস সৃষ্টি করে। প্রায় ২ কোটি কপি বিক্রি হওয়া এই গানটি এখনও পর্যন্ত কোনো নারী গায়িকার গাওয়া সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া একক গানের রেকর্ড ধরে রেখেছে।
ডলি পার্টনের গান ও অভিনয়ের সাফল্য ১৯৮০-এর দশকে তুঙ্গে পৌঁছায়। ১৯৮৩ সালে কেনি রজার্সের সঙ্গে তাঁর গাওয়া দ্বৈত গান 'আইল্যান্ডস ইন দ্য স্ট্রিম' মার্কিন পপ চার্টের শীর্ষে জায়গা করে নেয়। এই দশকে তিনি সিলভেস্টার স্ট্যালোনসহ বড় বড় তারকাদের বিপরীতে একাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
নতুন শতাব্দীতেও তিনি ব্লুগ্রাস ধারার চমৎকার সব অ্যালবাম উপহার দেন। ২০২৩ সালে তাঁর সর্বশেষ অ্যালবাম 'রকস্টার' মুক্তি পায়। কনিষ্ঠ প্রজন্মের তারকাদের মধ্যে তাঁর নাতনি মাইলি সাইরাসের সঙ্গেও তিনি পারফর্ম করেছেন।
গানের পাশাপাশি ডলি পার্টন একজন অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৯৮৬ সালে তিনি টেনেসি রাজ্যে অবস্থিত একটি থিম পার্কের মালিকানা কিনে নেন এবং এর নাম পরিবর্তন করে 'ডলিবুড' রাখেন। তাঁর এই সফল উদ্যোগের মাধ্যমে পরবর্তীতে ডলিবুড ওয়াটারপার্ক, স্পা এবং রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়।
ডলিবুড ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ১৯৯৫ সালে তিনি 'ইমাজিনেশন লাইব্রেরি' প্রকল্প শুরু করেন, যা প্রতি মাসে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনামূল্যে বই পাঠাত। নিজের বাবার নিরক্ষরতার কষ্ট দেখে তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বর্তমানে এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ বই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের শিশুদের কাছে পাঠানো হয়। ২০২২ সালে অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস এই ফাউন্ডেশনে ১০ কোটি ডলার অনুদান দেন।
এছাড়া ডলি পার্টন ২০১৬ সালের স্মোকি মাউন্টেন দাবানলে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যার্থে কাজ করেছেন, এইচআইভি/এইডস আক্রান্তদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছেন এবং কৃষ্ণাঙ্গ ও ট্রান্সজেন্ডার অধিকারের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কথা বলেছেন। ২০২০ সালে তিনি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন গবেষণার জন্য টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে ১০ লাখ ডলার দান করেন, যা পরবর্তীতে বিখ্যাত 'মডার্না' ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
চলতি বছরের মে মাসে শারীরিক অসুস্থতার কারণে লাস ভেগাসের শো বাতিল করেছিলেন ডলি পার্টন। অবশেষে সুরের ভুবনকে চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দিয়ে চলে গেলেন এই চিরসবুজ তারকা।
