৩৭ লাখ ডলারের বেশি ঋণ, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান অবসায়নের নির্দেশ দিলেন হাইকোর্ট
উড়োজাহাজ ইজারার ৩৭ লাখ ডলারের বেশি বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থতা, পাওনাদারের বারবার তাগাদা এবং ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ—সব মিলিয়ে হাবিব গ্রুপের বিমান পরিবহন ব্যবসা পরিচালনাকারী একটি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
হাবিব গ্রুপের রিজেন্ট এয়ারওয়েজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এইচজি এভিয়েশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে পাওনাদার মার্কিন প্রতিষ্ঠান উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানির করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বলেছেন, ভবিষ্যতে বিনিয়োগ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়ে স্বীকৃত ও পরিশোধযোগ্য ঋণের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
আদালত এইচজি এভিয়েশন লিমিটেড অবসায়নের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য একজন লিকুইডেটর (অবসায়ক) নিয়োগ দিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক সেবাদাতা উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানির ৩৭ লাখ ৯ হাজার ৮২৭ দশমিক ৩৮ মার্কিন ডলার পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এইচজি এভিয়েশনের অবসায়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আসিফ বিন আনোয়ারকে লিকুইডেটর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন হাইকোর্ট। তাকে এক সপ্তাহের মধ্যে অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করে দুই মাসের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন আদালতে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি মো. তৌফিক ইনামের একক কোম্পানি বেঞ্চ গত ১৯ আগস্ট এ রায় দেন। শনিবার (১৭ অক্টোবর) ১৫ পৃষ্ঠার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।
আদালতে উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানির পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মো. মুক্তাদির রহমান। তবে এইচজি এভিয়েশনের পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না।
ব্যারিস্টার মো. মুক্তাদির রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, হাবিব গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রিজেন্ট এয়ারওয়েজ বিভিন্ন সময়ে উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানির কাছ থেকে উড়োজাহাজ ইজারা নিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে ইজারার অর্থ পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানটি খেলাপি হয়ে পড়ে। উড়োজাহাজ ইজারা নেওয়ার সময় হাবিব গ্রুপের আরও ১০টি প্রতিষ্ঠান এ চুক্তির জামিনদার ছিল।
তিনি আরও জানান, উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানির পাওনা ৩৭ লাখ ৯ হাজার ৮২৭ দশমিক ৩৮ মার্কিন ডলার। রিজেন্ট এয়ারওয়েজ এই দেনা স্বীকারও করেছে। বিভিন্নভাবে পাওনা আদায়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর ২০২৩ সালে হাবিব গ্রুপের ১১টি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের আবেদন করে উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানি।
এই আইনজীবী বলেন, "হাইকোর্ট আপাতত একটি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালত জানিয়েছেন, একটি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের মাধ্যমে পাওনা আদায় সম্ভব না হলে হাবিব গ্রুপের অন্য ১০টি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
আদালতের চলতি মাসের ছুটি শেষে অন্য ১০টি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের আবেদনের ওপর শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান ব্যারিস্টার মো. মুক্তাদির রহমান।
অবসায়নের আবেদনের মুখে থাকা হাবিব গ্রুপের অন্য ১০টি প্রতিষ্ঠান হলো—হাবিব স্টিলস লিমিটেড, ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেড, লিগ্যাসি ফ্যাশন লিমিটেড, রিজেন্ট স্পিনিং মিলস লিমিটেড, রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, সিয়াম সুপেরিয়র লিমিটেড, এমটিএস রি-রোলিং মিলস লিমিটেড, আনোয়ারা পেপার মিলস লিমিটেড, রিজেন্ট পাওয়ার লিমিটেড ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজ লিমিটেড।
জানা গেছে, হাবিব গ্রুপের এই ১১টি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন পাওনাদারের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
গ্রুপটির ব্যবসায়িক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার পর এর পাঁচ শীর্ষ কর্ণধার দেশ ছেড়েছেন বলে জানা গেছে। তারা হলেন হাবিব গ্রুপের চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াসিন আলী এবং পরিচালক মাশরুফ হাবিব, সালমান হাবিব ও তানভীর হাবিব।
মামলার পটভূমি
প্রকাশিত রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানি ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর 'ওনার ট্রাস্টি' হিসেবে এইচজি এভিয়েশন লিমিটেডের সঙ্গে একটি উড়োজাহাজ ইজারা চুক্তি করে। এইচজি এভিয়েশন 'রিজেন্ট এয়ারওয়েজ' নামে বিমান পরিবহন ব্যবসা পরিচালনা করত।
চুক্তির আওতায় একটি ব্যবহৃত বোয়িং ৭৩৭-৭০০ উড়োজাহাজ এইচজি এভিয়েশনকে ইজারা দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উড়োজাহাজের ইজারার অর্থসহ বিভিন্ন বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হয় এইচজি এভিয়েশন। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাওনা আদায়ে আইনি পদক্ষেপ নেয় উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানি।
আবেদনকারীর দাবি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত উড়োজাহাজ ইজারা চুক্তির আওতায় ৩৭ লাখ ৯ হাজার ৮২৭ দশমিক ৩৮ মার্কিন ডলার বকেয়া ছিল। এর বাইরে চুক্তি অনুযায়ী প্রযোজ্য সুদ ও অন্যান্য পাওনাও দাবি করা হয়।
বকেয়া পরিশোধের জন্য ২০২০ সালের ২৮ জানুয়ারি, ৩ ফেব্রুয়ারি ও ১৮ ফেব্রুয়ারি এইচজি এভিয়েশনকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল।
বারবার তাগাদা ও আইনি নোটিশের পর প্রতিষ্ঠানটি আইনজীবীদের মাধ্যমে বকেয়া অর্থের দায় স্বীকার করে এবং তা পরিশোধের জন্য নতুন কিস্তির সময়সূচিতে সম্মত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই সময়সূচি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করতেও ব্যর্থ হয়।
এরপর কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৪১(৫) ও ২৪৫ ধারার অধীনে এইচজি এভিয়েশন লিমিটেড অবসায়নের আবেদন জানিয়ে হাইকোর্টে মামলা করে উইলমিংটন ট্রাস্ট কোম্পানি।
রায়ে আদালত বলেন, আবেদনকারীর দাবির জবাবে বিবাদী প্রতিষ্ঠান মূল দায় অস্বীকার করেনি। বরং পাওনা স্বীকার করে নির্দিষ্ট কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি নিজেই সম্মত হওয়া সেই পরিশোধের সময়সূচি অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
হাবিব গ্রুপের উত্থান-পতন
১৯৪৭ সালে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী হাবিব উল্লাহ মিয়া 'হাবিব ট্রেডিং' নামে ভোগ্যপণ্য আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তার তিন ছেলে ইয়াকুব আলী, মাহবুব আলী ও ইয়াসিন আলী ব্যবসায় যুক্ত হন।
তাদের হাত ধরে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, জাহাজভাঙা, ইস্পাত, সিমেন্ট ও কাগজশিল্পে ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে গড়ে ওঠে হাবিব গ্রুপ। প্রায় সাত দশক ধরে বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে গত এক দশকে সার, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিমান পরিবহন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণের পর গ্রুপটি লোকসানের মুখে পড়ে। একপর্যায়ে এর ৩১টি প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কিছু প্রতিষ্ঠান অন্য ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়।
২০১৯ সাল থেকে গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হতে শুরু করে। এর পরের বছর, ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি শুরু হলে রিজেন্ট এয়ারওয়েজ তাদের ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ ঘোষণা করে।
বর্তমানে গ্রুপটির ৩১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র চারটির কার্যক্রম চালু রয়েছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
একসময় হাবিব গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ১৬ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করতেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে এক হাজারের নিচে নেমে এসেছে।
