দেনমোহর স্ত্রীর অধিকার, আর্থিক সংকট দেখিয়ে স্বামী দায় এড়াতে পারবেন না: হাইকোর্ট
দেনমোহর স্ত্রীর স্বতন্ত্র আর্থিক অধিকার এবং এটি স্বামীর ওপর বিয়ের মাধ্যমে সৃষ্ট একটি আইনগত দায়—এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, নিকাহনামায় দেনমোহরের অঙ্ক নির্ধারিত থাকলে স্বামী শুধু আর্থিক অসচ্ছলতার অজুহাতে তা পরিশোধের দায় থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন না। তবে প্রকৃত আর্থিক সংকট প্রমাণিত হলে পাওনা অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিতে পারেন নির্বাহী আদালত।
আদালত এও বলেছেন, স্ত্রী স্বেচ্ছায়, সচেতনভাবে ও কোনো ধরনের চাপ বা প্রভাব ছাড়া দেনমোহরের পুরো বা আংশিক অংশ মওকুফ করলে, সেটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু জোরপূর্বক, প্রতারণা বা অন্যায় প্রভাবের মাধ্যমে নেওয়া কোনো মওকুফ বৈধ বলে গণ্য হবে না।
গত শনিবার (৩ সেপ্টেম্বর) এ সংক্রান্ত রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ। পূর্ণাঙ্গ রায়টি আজ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ে দেওয়া পর্যবেক্ষণে এসব বিষয় তুলে ধরেছেন আদালত।
মামলাটিতে ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন পক্ষ ছিলেন। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর ২২ লাখ টাকা দেনমোহরে তাদের বিয়ে হয়। তাদের একটি মেয়ে রয়েছে।
স্ত্রীর অভিযোগ- বিয়ের পর স্বামী তার কাছে ২০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন এবং একপর্যায়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। পরে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। ২০১৭ সালের পর থেকে তার স্বামী মেয়ের ভরণপোষণও যথাযথভাবে দেননি।
এরপর স্ত্রী দেনমোহর, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ এবং মেয়ের ভরণপোষণের বকেয়া আদায়ের জন্য চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। স্বামী আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় ২০২২ সালের ৫ মে একতরফা ডিক্রি দেওয়া হয়।
ওই ডিক্রিতে স্বামীকে ১৮ লাখ টাকা দেনমোহর, ইদ্দতকালীন তিন মাসের ভরণপোষণ বাবদ ৩০ হাজার টাকা এবং মেয়ের অতীতের ভরণপোষণ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকাসহ মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি মেয়ের বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা করে ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতি বছর এ অর্থের ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধির কথাও রায়ে উল্লেখ রয়েছে।
ডিক্রি কার্যকরের জন্য স্ত্রী ওই বছরই চট্টগ্রামের আদালতে মামলা করেন। পরে স্বামী মামলার খবর পেয়ে একতরফা ডিক্রি বাতিলের আবেদন করেন এবং ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে ওই এক্সিকিউশন মামলায় জামিন নেন। কিন্তু তার আবেদন নিষ্পত্তির আগেই তিনি একটি আপিল দায়ের করেন। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা জজের পঞ্চম আদালত ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট ওই আপিল খারিজ করে পারিবারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। এরপর তিনি হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন।
হাইকোর্টে স্বামীর পক্ষ থেকে বলা হয়, নিম্ন আদালতগুলো সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি এবং তিনি মামলার সমনও পাননি। তার আইনজীবী আরও জানান, ইতোমধ্যে তিনি ডিক্রির ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকার মধ্যে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। ব্যবসা হারিয়ে আর্থিকভাবে সংকটে পড়ায় বাকি টাকা একসঙ্গে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তাকে মাসিক কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার আবেদন করা হয়।
অন্যদিকে স্ত্রীর পক্ষের আইনজীবী যুক্তি দেন, নিম্ন আদালতই সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। স্বামী মূলত পুনরায় একই বিষয় তুলে ধরে মামলাটি দীর্ঘায়িত করতে চাইছেন। তার আর্থিক অক্ষমতার দাবিও বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং স্ত্রী ও সন্তানের আইনগত অধিকার বাস্তবায়নে বিলম্ব করা উচিত নয় বলে আদালতে দাবি করা হয়।
হাইকোর্ট রায়ে বলেন, নিম্ন আদালতগুলোর নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্ত্রী বিয়ে, সন্তান জন্ম এবং বিবাহবিচ্ছেদের বিষয়টি সাক্ষ্য ও নথিপত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। আদালতগুলো একমতভাবে দেনমোহর ও ভরণপোষণের অধিকার স্বীকার করেছে।
রায়ে দেনমোহর বিষয়ে ইসলামী শরিয়াহর বিধানও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়। আদালত কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের আলোকে বলেন, দেনমোহর কোনো সাধারণ বা ঐচ্ছিক উপহার নয়; এটি স্ত্রীর একটি আর্থিক অধিকার এবং বিয়ের মাধ্যমে স্বামীর ওপর সৃষ্টি হওয়া দায়। স্ত্রী স্বেচ্ছায় কোনো অংশ ছেড়ে না দিলে স্বামী তা ফেরত নেওয়ার অধিকার রাখেন না।
আদালত আরও বলেন, মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯-এর নিকাহনামায় দেনমোহর, তাৎক্ষণিক ও বিলম্বিত দেনমোহর এবং পরিশোধিত অর্থের জন্য পৃথক ঘর রয়েছে। তবে স্ত্রী সম্মতি না দিলে শুধু নিকাহনামায় বিলম্বিত দেনমোহর লেখা থাকার কারণে সেটিকে অনির্দিষ্টকাল পরিশোধ না করার সুযোগ নেই। স্ত্রী দাবি করলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তা তাৎক্ষণিক দেনমোহর হিসেবে পরিশোধযোগ্য হতে পারে।
বিচারপতি আবদুর রহমান রায়ে বলেন, বিয়ের সময নির্ধারিত দেনমোহর স্বামীর কাছে স্ত্রীর পাওনা ঋণের মতো। স্ত্রীকে দেনমোহর আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে হলে এবং স্বামীর অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা আটকে রাখলে, মামলার পরিস্থিতি বিবেচনায় ট্রায়াল কোর্ট ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করতে পারেন।
আদালত স্পষ্ট করে বলেন, হাইকোর্ট বা কোনো আদালত কোনো স্ত্রীর দেনমোহর মওকুফ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। তবে স্ত্রী নিজ ইচ্ছায়, কোনো চাপ বা প্রতারণা ছাড়া দেনমোহরের পুরো বা আংশিক অংশ মওকুফ করতে পারেন। এমন মওকুফের দাবি করলে সেটি যে স্বাধীন ও স্বেচ্ছাপ্রসূত ছিল, তার প্রমাণ থাকতে হবে।
মামলার ভরণপোষণের অংশেও হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। আদালত বলেন, স্কুলপড়ুয়া একটি শিশুর খাবার, বাসস্থান, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজন বিবেচনায় ভরণপোষণ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, আবাসন ব্যয় এবং উৎসবসহ শিশুর প্রয়োজন বিবেচনায় মাসিক ভরণপোষণের বিষয়টি নির্ধারণ করা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত হাইকোর্ট স্বামীর রিভিশন আবেদন খারিজ করে দেন এবং নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রিতে হস্তক্ষেপের কোনো আইনগত বা এখতিয়ারগত ত্রুটি পাননি। ফলে ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকার ডিক্রি বহাল থাকে।
