মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ: বাংলাদেশের ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু ডেঙ্গুর প্রকোপ কমছে না
একসময় ঢাকায় মশা নিধনের অভিযান এতটাই জোরদার ছিল যে শহরজুড়ে কীটনাশক ছিটানোর জন্য হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরীর নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানের সুবাদে ঢাকার মশা-উপদ্রুত রাতগুলো অনেক বছরের জন্য সহনীয় হয়ে উঠেছিল।
ছয় দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, মশার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ এখনো চলছে—তবে এর কার্যকারিতা ক্রমেই কমে আসছে। কীটনাশক, ফগিং ও মশা নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য পদক্ষেপে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে নগর কর্তৃপক্ষ, তারপরও ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগের বিস্তার বেড়েই চলেছে।
বিগত এক দশকে মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন একাই ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তাদের সম্মিলিত বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ২৪২ কোটি টাকা। তারপরও বর্ষা মৌসুমের আগে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৭৫ ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টি ওয়ার্ডেই এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে।
সমস্যাটি এখন আর শুধু ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।
ডেঙ্গু এখন জাতীয় স্বাস্থ্য-বোঝায় পরিণত হয়েছে। এদিকে স্থানীয় এডিস মশার মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্রমশ বাড়তে থাকলেও, দেশের মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো রাসায়নিক কীটনাশকের ওপরই ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য ব্যবহৃত প্রচলিত বেশিরভাগ রাসায়নিকের বিরুদ্ধেই মশা প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
ম্যালেরিয়া বা ডেঙ্গু মোকাবিলা করা প্রায় সব দেশই এখনো মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ব্যবহার করে। বিশ্বব্যাপী সামগ্রিকভাবে কীটনাশক ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিল শীর্ষে রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ভেক্টর-নিয়ন্ত্রণ বাজেটের প্রায় ৭২ শতাংশ থেকে ৯৪ শতাংশ রাসায়নিক ও কীটনাশকের পেছনে ব্যয় করা হয়।
ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে প্রকাশিত ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রমণাত্মক এডিস ইজিপ্টি ও এডিস অ্যালবোপিকটাস মশা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা সৃষ্টিকারী ভাইরাস ছড়ায়। এর ফলে জনস্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক চাপ পড়ছে, যার আনুমানিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৯৪.৭ বিলিয়ন ডলার।
ভেক্টর নিয়ন্ত্রণের বাজার দ্রুত বড় হচ্ছে। ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ হলো জনস্বাস্থ্যের এমন একটি কৌশল এবং পদ্ধতিগত কাঠামো, যেখানে জৈবিক নিয়ন্ত্রণ (শিকারী প্রাণী), রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ (কীটনাশক) ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার (রিপেলেন্ট/মশারি) সমন্বয় করা হয়।
বিস্তৃত পরিসরে ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ বাজারের মূল্য প্রায় ২৩.৪২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনা খাতের প্রায় ৬০ শতাংশই রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণের দখলে রয়েছে।
২০২০ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, সরকার ও পরিবারগুলোর মোট ব্যয়ের হিসাবে বাংলাদেশ মশা নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা খরচ করে। এর মধ্যে মশা প্রতিরোধক (রিপেলেন্ট), বৈদ্যুতিক ব্যাট, নেট ও সিটি কর্পোরেশনগুলোর ছিটানো কীটনাশকের খরচও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে মশা প্রতিরোধক পণ্যের বাজার বার্ষিক ১৮ থেকে ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে।
২০২০ সালের একটি বাণিজ্যিক হিসাব অনুযায়ী, মশার কয়েলের বার্ষিক বাজার ছিল প্রায় ১ হাজার ৪৮০ কোটি টাকার। এছাড়া অ্যারোসল ২০০ কোটি টাকা, ভ্যাপোরাইজার ১৪ কোটি টাকা ও মাস্কিটো ব্যাটের বাজার ছিল ৫০ কোটি টাকার। গ্রামাঞ্চলে বহুল ব্যবহৃত নন-ব্র্যান্ডের মশার কয়েল এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
দেশের প্রধান দুই শহর—ঢাকা ও চট্টগ্রামের কর্তৃপক্ষ মশা নিয়ন্ত্রণ অভিযানের জন্য বার্ষিক বাজেটে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখে। এ কার্যক্রমের মধ্যে কীটনাশক কেনা ও তা ছিটানোর খরচও রয়েছে।
ফগিং মেশিনের সঠিক ব্যবহার শিখতে ২০২৩ সালে জার্মানি ও ফ্রান্সে প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিল ঢাকা নগর কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেরও একই ধরনের একটি উদ্যোগ চলতি বছরের শুরুর দিকে বাতিল হয়ে যায়। মশা নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ও জৈব লার্ভিসাইড উৎপাদন সম্পর্কে জানতে যুক্তরাষ্ট্রে দল পাঠানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেননি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তবে নানা ধরনের উদ্যোগ সত্ত্বেও নগরবাসী এখন পর্যন্ত মশার উপদ্রব থেকে তেমন কোনো স্বস্তি পায়নি। মশার বংশবৃদ্ধি ও মশাবাহিত রোগের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে।
মে মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিচালিত বর্ষা-পূর্ব জরিপে দেখা গেছে, তাদের ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিসের লার্ভার ঘনত্ব গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বন্দরনগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের অধিকাংশ বাসিন্দার অভিযোগ, ফগিং মেশিন পরিচালনাকারীদের দেখাই মেলে না বললেই চলে। ফলে মশার কামড় থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় দেখছেন না তারা।
পরিবারগুলোর ওপর ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের বোঝা
ডেঙ্গু এখন আর কেবল শহরের স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; ঢাকার বাইরেও রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ায় এটি এখন বড় জাতীয় স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। চলতি বছর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৪ জন। এছাড়া গত সপ্তাহে সারা দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৯০০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
রাজধানীর বাইরে এডিস মশার বিস্তারের কারণে সংক্রমণ বাড়লেও চিকিৎসার সক্ষমতা ও অভিজ্ঞ চিকিৎসাকর্মীরা এখনো মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে সংকটাপন্ন রোগীদের, বিশেষ করে শিশুদের ঢাকায় পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসকরা। এতে রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
ফারুক আহমেদের সাড়ে চার বছর বয়সি সন্তানের পরীক্ষায় ডেঙ্গু নেগেটিভ এলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ফেনী থেকে ঢাকার শিশু হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি জানান, বুধবার সকালে ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছেন।
হাসপাতালে দীর্ঘদিন থাকার কারণে চিকিৎসার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে, যা অধিকাংশ পরিবারের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ঢাকার চা-দোকানি মোহাম্মদ লিটন তার তিন বছর বয়সি মেয়ে লিজাকে একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। তবে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে তার খরচ হয়েছে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। হাসপাতালে ভর্তি ও বারবার রক্ত পরীক্ষায় তার মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার টাকায়। তার ওপরে এই সময়ে তার ছোট দোকানটিও বন্ধ রাখতে হয়েছে।
১৩ বছর বয়সি আরহান সাফওয়াতের জন্য খরচটা ছিল আরও অনেক বেশি। তার আইসিইউ সুবিধার প্রয়োজন হয়েছিল। সাফওয়াতের মা সালমা আফরোজ জানান, একটি বেসরকারি হাসপাতালে চার দিন থাকার জন্য তাদের পরিবারের ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ টিবিএসকে ২০২৩ সালের এক গবেষণার কথা উল্লেখ করে বলেন, সরকারি হাসপাতালে একজন ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় একটি পরিবারের ৭ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। তবে বেসরকারি হাসপাতালে এই খরচ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়াতে পারে।
রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ, স্যালাইন ও পরীক্ষার সুবিধা দেওয়ার জন্য হাসপাতালগুলোকে সহায়তা করতে তিনি একটি জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল গঠনের পরামর্শ দেন।
কীটনাশক থেকে কি সরে আসা হচ্ছে?
মশা নিয়ন্ত্রণ অভিযানে ব্যর্থতার দায় নগর কর্তৃপক্ষের ওপর চাপানো হলেও, কীটতত্ত্ববিদরা এই কর্মসূচির বাজে ফলাফলের জন্য অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, অনিয়মিত কীটনাশক ছিটানো ও কীটতত্ত্বভিত্তিক কৌশলের অভাবকে দায়ী করছেন।
এটি এখন বিশ্বব্যাপী সাধারণ চিত্র। কীটনাশক, লার্ভিসাইড (লার্ভা ধ্বংসকারী রাসায়নিক) ও বাড়িতে ব্যবহার্য মশা প্রতিরোধক পণ্যের পেছনে সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। তারপরও গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে মশা নিয়ন্ত্রণের এই বিনিয়োগের চেয়ে মশাবাহিত রোগের কারণে সৃষ্ট প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেশি।
মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ব এখন ধীরে ধীরে কেবল কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনছে। এর বদলে মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্ভাবনী উপায় খতিয়ে করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে, কারণ মশা খুব দ্রুত এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলছে। এর ফলে ব্যয়বহুল 'পেস্টিসাইড ট্রেডমিল' তৈরি হচ্ছে, যা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
কীটনাশকের বিরুদ্ধে মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠা ছাড়াও একই প্রচলিত পদ্ধতির বারবার ব্যবহার ক্রমশ ব্যয়বহুল ও অকার্যকর হয়ে উঠছে। এসব রাসায়নিক পদার্থ মৌমাছির মতো নিরীহ প্রাণী ও পতঙ্গের ক্ষতি করছে, সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করছে জনস্বাস্থ্যের জন্য। রাসায়নিকের এসব ক্ষতিকর প্রভাবের কারণেই বিভিন্ন দেশ মশার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিরাপদ এবং আরও কার্যকর বিকল্প পদ্ধতির খোঁজ করছে।
উলবাকিয়া যেভাবে কাজ করে
কিছু দেশ পরিবেশবান্ধব জৈবিক সমাধানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াবাহিত পুরুষ মশা প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া কিংবা বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত স্টেরাইল ইনসেক্ট টেকনিক (এসআইটি) ব্যবহার করা।
ওয়ার্ল্ড মাস্কিটো প্রোগ্রাম এক ডজনেরও বেশি দেশে উলবাকিয়া পদ্ধতি নিয়ে প্রচারণা ও কাজ করছে। তারা বলছে, এই পদ্ধতি মানুষ ও পরিবেশের জন্য নিরাপদ। তথ্য-প্রমাণ বলছে, যেসব এলাকায় উলবাকিয়ার উচ্চ মাত্রা বজায় রাখা হয়, সেখানে ভাইরাসের বিস্তার অনেকটাই কমে যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনস্বাস্থ্যের জন্য উলবাকিয়া পদ্ধতির কার্যকারিতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এ পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত এডিস ইজিপ্টি মশা প্রকৃতিতে ছেড়ে দেন। মশার ভেতরে থাকা এই ব্যাকটেরিয়া ডেঙ্গু ভাইরাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি রোধ করে। ফলে ভাইরাসটি আর মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে না।
ডব্লিউএইচও বলছে, 'স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর' এই পদ্ধতি ব্রাজিল, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও কলম্বিয়ার মতো দেশগুলোতে চালু রয়েছে। এর মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে এবং ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৭৫ শতাংশেরও বেশি কমিয়ে আনা গেছে। সিঙ্গাপুরে এর সাফল্য আরও বেশি। দেশটিতে গবেষণাগারে প্রজনন ঘটানো উলবাকিয়াবাহিত পুরুষ মশা সার্বিক মশার সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সাহায্য করেছে।
এর মূল উদ্দেশ্য মশাকে পুরোপুরি নির্মূল করা নয়, বরং রোগ ছড়ানোর ক্ষেত্রে এদের সক্ষমতা কমিয়ে আনা।
সবার জন্য টিকা এখনো সহজলভ্য নয়
জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। মূলত চারটি ভাইরাসের কারণে এই রোগ হয়, যেগুলোকে 'সেরোটাইপ ১-৪' বলা হয়ে থাকে।
বর্তমানে ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য মাত্র একটি টিকা পাওয়া যাচ্ছে। যেসব এলাকায় ডেঙ্গু সংক্রমণের হার অনেক বেশি, সেখানে ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সি শিশুদের জন্য কিউ-ডেঙ্গা (Q-denga® বা TAK-003) নামক টিকা ব্যবহারের সুপারিশ করেছে ডব্লিউএইচও। এই টিকার কোর্সে তিন মাসের ব্যবধান রেখে দুটি ইনজেকশন দেওয়া হয়।
জাপানের তাকেদা ফার্মা-র তৈরি কিউ-ডেঙ্গা টিকা আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ ৪০টিরও বেশি দেশে ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে এটি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়নি।
ডেঙ্গুর আরও কয়েকটি টিকা বা টিকার মডেল বর্তমানে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও চলমান গবেষণায় মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের ২০ জুলাই ভারত তাদের প্রথম ডেঙ্গু টিকা হিসেবে কিউ-ডেঙ্গাকে অনুমোদন দেয়। ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে এটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসার কথা রয়েছে। তখন এর দুই ডোজের কোর্সের সম্ভাব্য মূল্য হতে পারে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার রুপি।
তবে বাংলাদেশ এখনো ডেঙ্গুর টিকার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
উলবাকিয়া নাকি টিকা: বাংলাদেশের কোন দিকে যাওয়া উচিত?
কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, অনিয়মিত ওষুধ ছিটানো, অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও কীটতত্ত্বভিত্তিক কোনো কৌশল না থাকার কারণেই মশা নিয়ন্ত্রণ অভিযানগুলো ক্রমশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে এবং ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে।
এ কারণেই অন্যান্য দেশ বিকল্প পদ্ধতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। এর মধ্যে উলবাকিয়া ও নির্বীজ কীটপতঙ্গ প্রযুক্তির মতো জৈবিক পদ্ধতিও রয়েছে।
তবে বাংলাদেশকে হয়তো কীটনাশক, উলবাকিয়া ও টিকার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে না। মেডিকেল কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, এই পদ্ধতিগুলোকে একক কোনো সমাধান হিসেবে বিবেচনা না করে, বরং একটি সমন্বিত ভেক্টর-ব্যবস্থাপনা কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
তিনি কলকাতার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। সেখানে উলবাকিয়ার ওপর নির্ভর না করে ধারাবাহিকভাবে 'সার্চ অ্যান্ড ডেস্ট্রয়', মশার প্রজননস্থল ব্যবস্থাপনা, লার্ভিসাইডের ব্যবহার ও স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই মশা নিয়ন্ত্রণে সফলতা মিলেছে।
এটি প্রমাণ করে, মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতে কেবল নতুন প্রযুক্তিই যথেষ্ট নয়। মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও বেশি বিজ্ঞানসম্মত, সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত হতে হবে। এর মধ্যে নজরদারি, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, সঠিক মাত্রায় রাসায়নিকের ব্যবহার, জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা এবং যেখানে উপযুক্ত প্রমাণ রয়েছে, সেখানে নতুন জৈবিক পদ্ধতির সমন্বয় ঘটাতে হবে। মশার অস্তিত্ব পৃথিবীতে থেকেই যাবে। তাই বিশ্বজুড়ে গবেষকরা এখন এদেরকে অপেক্ষাকৃত কম বিপজ্জনক করে তোলার চেষ্টা করছেন।
ফগিং ও কীটনাশকের পেছনে কয়েক দশক ধরে প্রচুর অর্থ ব্যয়ের পর, বাংলাদেশ কতটুকু রাসায়নিক ছিটিয়েছে তার ভিত্তিতে সাফল্যের পরিমাপ করার বিলাসিতা আর দেখাতে পারে না। সফলতার আসল পরীক্ষা হলো—মশার বংশবৃদ্ধি কমেছে কি না, কম মানুষ অসুস্থ হচ্ছে কি না এবং প্রতিরোধযোগ্য এই রোগের চিকিৎসায় পরিবারগুলোর ব্যয় কমেছে কি না।
