‘প্রাণনাশের শঙ্কা’ প্রকাশ করে জিয়াউল আহসানকে অন্য আসামিদের সঙ্গে প্রিজন ভ্যানে আনার আবেদন
কারাগার থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রিজন ভ্যানে একা আনা-নেওয়ার পথে 'প্রাণনাশের শঙ্কা' প্রকাশ করে অন্য আসামিদের সঙ্গে প্রিজন ভ্যানে আসা-যাওয়ার আবেদন করেছেন আওয়ামী লীগ আমলে শতাধিক গুম ও খুনের অভিযোগের মামলার আসামি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান।
তার এই আবেদনের পর 'অন্য আসামিদের নিরাপত্তার' কথা তুলে ধরে তাকে সশরীরে ট্রাইব্যুনালে হাজির না করে কারাগারে রেখেই ভার্চুয়াল শুনানির আবেদন জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
বুধবার (৯ অক্টোবর) বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ লিখিত আবেদনের পাশাপাশি মৌখিকভাবেও নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করেন জিয়াউল। উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে এ বিষয়ে পরে আদেশ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম সাংবাদিকদের বলেন, 'জিয়াউল আহসানের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালে একটি লিখিত আবেদন করা হয়েছে। অনুমতি নিয়ে তিনি আসামির কাঠগড়া থেকে বিচারকদের সঙ্গে মৌখিকভাবেও কথা বলেছেন।'
আবেদনের সারবস্তু তুলে ধরে তামীম বলেন, জিয়াউল আহসান চেয়েছেন যে, প্রিজন ভ্যানে আনার সময় যেন অন্যান্য আসামিদেরকেও তার সঙ্গে করে আনা হয়।
'কারণ হিসেবে উনি উল্লেখ করেছেন যে, আসা এবং যাওয়ার সময় যেকোনো একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি আবেদনে বলেছেন যে, উনি জীবননাশের আশঙ্কা করছেন।'
তামীম বলেন, জিয়াউল আশঙ্কা করছেন, জেলখানা থেকে ট্রাইব্যুনালে আনার পথে রাস্তায় কেউ কোনো ঘটনা ঘটিয়ে তার ওপর দায় চাপাতে পারে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জিয়াউলকে সশরীরে ট্রাইব্যুনালে না এনে কারাগারে রেখেই অডিও-ভিজ্যুয়াল কনফারেন্সের মাধ্যমে হাজির করার আবেদন জানানো হয়।
প্রসিকিউটর তামীম বলেন, 'প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আবেদন ছিল যে, উনাকে ট্রাইব্যুনালে সশরীরে উপস্থাপন না করে জেলখানাতে রেখে অডিও-ভিজ্যুয়াল কনফারেন্সের মাধ্যমে উনি যেন ট্রাইব্যুনালে হাজির হন।'
সবার সঙ্গে প্রিজন ভ্যানে আনা হলে অন্য আসামিদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এমন যুক্তি দেখিয়ে প্রসিকিউশন এ প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানান তিনি।
জিয়াউল আহসানের আইনজীবী নাজনীন নাহার সাংবাদিকদের বলেন, সাধারণত ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন মামলার আসামিদের একসঙ্গে প্রিজন ভ্যানে করে আদালতে আনা হলেও গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে জিয়াউলকে আলাদা গাড়িতে করে ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হচ্ছে। কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে অন্য আসামিদের এক গাড়িতে এবং জিয়াউলকে অন্য গাড়িতে একা করে আনা হয়।
একা আনা-নেওয়ার বিষয়টি 'গভীর ষড়যন্ত্র' মন্তব্য করে তিনি বলেন, জিয়াউলকে একা না এনে অন্য আসামিদের সঙ্গে একই গাড়িতে আনার আবেদন করা হয়েছে।
এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রসিকিউটর তামীম বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য বৃহস্পতিবার শেষ হচ্ছে। এরপর আসামিপক্ষ তাকে জেরা করবে।
১৫ জন সাক্ষী উপস্থাপনের মাধ্যমে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রত্যেকটি অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য প্রসঙ্গে তামীম বলেন, ২০০৯ সালে তৎকালীন সরকার ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার জন্য 'সিস্টেম্যাটিক ক্রাইম' হিসেবে ভিন্নমতের ব্যক্তিদের গুম, অপহরণ ও হত্যার সংস্কৃতি শুরু করে। এর অন্যতম হোতা ছিলেন জিয়াউল আহসান।
তিনি জানান, এনটিএমসি, এসবি, এনএসআই ও র্যাবের গোয়েন্দা পরিচালক এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি অসংখ্য মানুষকে অবৈধভাবে আটকে রেখে গুম ও হত্যা করেছেন এবং পেট চিরে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন বলে তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষ্যে তুলে ধরেছেন।
ট্রাইব্যুনালে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় বর্তমানে তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য উপস্থাপন শেষ হবে এবং আসামিপক্ষের জেরা শুরু হবে।
এ মামলা ছাড়া গুম, খুন ও নির্যাতনের আরও কয়েকটি মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে।
