‘এখন তো মনে হয় আর খাওনই লাগবো না’: জ্বালানির দাম বাড়ায় নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা
জ্বালানি তেলের 'বড় অঙ্কের' মূল্যবৃদ্ধির খবরটা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রভাব বাজারে পড়বে বলে আগে থেকেই শঙ্কা ছিল। ফলে একদিকে বেতন বৃদ্ধির চাপ, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধি—দুইয়ে মিলে মানুষের জীবনযাত্রার খরচ যেন বেড়ে চলেছে সবদিক থেকেই। নিত্যপণ্যের বাজারেও ইতোমধ্যে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অস্থিরতা। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাত তুলে অনেক ব্যবসায়ী ইতোমধ্যেই বাড়িয়ে দিয়েছেন পণ্যের দাম। এমনকি যেসব পণ্যের দাম এখনো স্থিতিশীল আছে, সেগুলোও শিগগির বাড়তে পারে বলে আগেভাগেই জানিয়ে রাখছেন তারা।
হাতিরপুলে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মনির বলেন, 'এখন তো মনে হয় আর খাওনই লাগবো না। প্রত্যেকদিন বাজারে এসে শুনি কোনো না কোনো জিনিসের দাম বাড়ছে। একদিন তেলের দাম বাড়ে, আরেকদিন সবজি-মাছ-মাংসের দাম বাড়ে। আয় তো সেইভাবে বাড়ে না, কিন্তু বাজারে আসলেই খরচ বাড়তেছে। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে যাবে।'
রাজধানীর নিউমার্কেট, হাতিরপুল এবং কারওয়ান বাজারে পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সবজি, মাছ, মাংস, দুধ, ফল, আটা-ময়দা, চাল, তেল, ডিমের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগেও নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এখন বাড়তি পরিবহন ব্যয় যুক্ত হওয়ায় সেই চাপ আরও বাড়ছে।
২১ সেপ্টেম্বর ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দরে ডিজেল ১৩৫, পেট্রল ১৬০, অকটেন ১৬৫ এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। দুই দিনের মধ্যে সারা দেশে বাস ও লঞ্চভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক বা পিকআপের ভাড়াও বেড়ে গেছে অঘোষিতভাবে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ১৭০-২০০ টাকায়, যা গত সপ্তাহে ছিল ১৬০-১৮০ টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে শিমের দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা বেড়েছে। টমেটোর দাম ৮০-১০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১০০-১২০ টাকা। দেশি শসা ৫০-৬০ থেকে বেড়ে ৮০ ও করলা ৬০ থেকে বেড়ে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেগুনের দামও ৮০-১০০ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০-১২০ টাকায়। এছাড়া প্রতি পিস লাউ ৭০-৮০ টাকা, কচুরলতি কেজি ৮০ ও গাজর ১২০-১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে পটোলের দাম কেজিতে ৫০ থেকে বেড়ে ৬০ টাকা হয়েছে। ধুন্দলের দাম ১০ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০-৮০ টাকায়। বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকা কেজি এবং ঝিঙার দাম ৬০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০ টাকা। বেড়েছে কাঁচামরিচের দামও। গত সপ্তাহে কেজিপ্রতি ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হলেও গতকাল কারওয়ান বাজারে তা ১০০-১২০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। অন্যদিকে পেঁয়াজ ৪৫, দেশি রসুন ১২০, ভারতীয় রসুন ১৮০ এবং আদা ১৪০ টাকা কেজি।
মানিকগঞ্জ থেকে পিকআপে করে সবজি আনেন কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী রহমত মিয়া। তিনি টিবিএসকে বলেন, 'দাম আগেও বাড়তিই ছিল। এখন জ্বালানি তেলের দামের কারণে আরেকটু বাড়ছে। পিকআপ ভাড়া আজ ৪০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে।'
মুরগির সরবরাহ কম, পরিবহনে বাড়তি ভাড়া
সবজির পাশাপাশি মাছ-মুরগির বাজারেও বাড়তি দাম দেখা যাচ্ছে। হাতিরপুল বাজারে সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ টাকা কেজি দরে। ব্রয়লার বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকা কেজি দরে।
হাতিরপুল কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী শাহীন অভিযোগ করে বলেন, 'মুরগির উৎপাদন কম, খরচ বেশি। কাপ্তান বাজারে মুরগি আসে, সেখান থেকে পিকআপে করে নিয়ে আসি। গাড়িভাড়া বাড়ছে, তাই আমাদেরও বেশি দামে কিনতে হয়।'
মুরগির সরবরাহ কমে গেছে জানিয়ে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী সুমন ব্যাপারী বলেন, 'এক হাজার মুরগি চাইলে ৩০০ দিচ্ছে।' দামের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আজকে প্রতি মুরগিতে ৪ টাকা বেশি পড়েছে।'
মুরগির মতোই মাছের বাজারেও দাম ঊর্ধ্বমুখী। হাতিরপুল বাজারে ইলিশের দাম আকারভেদে কেজিতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা। দাম বেড়ে দুই কেজি ওজনের রুই মাছ ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা, বড় রুই ৪৫০, মাঝারি কাতল ৪০০ এবং বড় কাতল ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বড় তেলাপিয়া ২৮০ টাকা, ছোট তেলাপিয়া ২৪০ এবং পাঙ্গাশ ২০০ থেকে ২২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। চাষের চিংড়ি আকারভেদে ৭০০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন খরচ বাড়ায় পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়েছে।
হাতিরপুল মাছ ব্যবসায়ী জসিম শিকদার বলেন, 'কারওয়ান বাজার থেকে মাছ আনি। আমাদের আনার তেমন খরচ বাড়েনি। কিন্তু পাইকারদের মাছ আনার দাম বাড়ছে। তাই আমাদেরও কিছুটা বেশি দামে কিনতে হইতেছে।'
কারওয়ান বাজারের মাছ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ট্রাকভাড়া বেড়েছে। এতে মাছভেদে কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা দাম বেড়েছে।
বেড়েছে আটা-ময়দার দাম
টিসিবি জানিয়েছে, এক মাসের ব্যবধানে প্যাকেটজাত আটার দাম ৪ শতাংশ ও ময়দার দাম ১৭ শতাংশ বেড়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি প্যাকেটজাত আটা বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায় এবং ময়দা ৮০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সপ্তাহখানেক আগেও প্যাকেটজাত আটা ও ময়দার দাম ছিল যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ টাকা।
নিউমার্কেট ব্যবসায়ী মিরাজ টিবিএসকে বলেন, 'গত মাসেই আটা-ময়দার দাম কেজিতে ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এখন পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির ফলে আবার মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে ডিলাররা।'
ট্রাকভাড়া বৃদ্ধির ফলে চালের দামেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটে চাল ব্যবসায়ী সিকদার আহমেদ টিবিএসকে বলেন, 'বুধবার থেকেই বাড়তি দামে চাল আনতে হচ্ছে। ট্রাকপ্রতি প্রায় ৪ হাজার টাকা বেড়েছে।'
রাজধানীর একেক এলাকায় একেক দামে বিক্রি হচ্ছে ডিম। অধিকাংশ বাজারেই ডিমের দাম গত সপ্তাহে ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। তবে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির পর তা প্রতি ডজনে ১০ টাকা বেড়ে গেছে।
দুধের দাম একলাফে ১০ টাকা বৃদ্ধি
প্যাকেটজাত তরল দুধের দাম গত দেড় মাসে দুই দফায় লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। মিল্কভিটার পর আড়ং, প্রাণ, ফার্মফ্রেশসহ বেসরকারি কোম্পানিগুলোর দুধ এখন লিটারপ্রতি ১২০ টাকা, আধা লিটার ৬০ টাকা বিক্রি করছে। উৎপাদনকারীরা পরিবহন, সংগ্রহ, প্যাকেজিং, গোখাদ্য, গ্যাস ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট
বাজারে এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। পাঁচ লিটরের বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহও কমেছে কিছুটা।
চলতি মাসের শুরুর দিকেই ভোজ্যতেল পরিশোধন ও উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়িয়েছিল। এর ফলে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম দাঁড়ায় ২০৪ টাকায়। এর আগে টানা প্রায় দুই মাস ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কম ছিল। দাম বাড়ানোর পর কিছুদিনের জন্য সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এখন আবার তা কমে গেছে।
বিক্রেতাদের ভাষ্য, কোম্পানিগুলো এখন বাজারে তুলনামূলক কম পরিমাণে তেল ছাড়ছে। কোম্পানিগুলো সয়াবিন তেলের দাম আরেক দফা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। তবে সব বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ একই হারে কমেনি।
