‘কষ্ট হচ্ছে, কী আর করার, পরিবারের কাছে তো যেতে হবে’: ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় চাপে যাত্রীরা
সারা সপ্তাহের ব্যস্ততা শেষে সাপ্তাহিক ছুটি কাটাতে প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই ঘরমুখী মানুষের ঢল নামে রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে। হাতে ব্যাগ-লাগেজ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে কেউ ছুটছেন চট্টগ্রাম, কেউ কুমিল্লা, নোয়াখালী কিংবা ফেনীতে। কিন্তু সব যাত্রীই চাপে পড়েছেন বাস ভাড়া বেড়ে যাওয়ায়।
জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পর সরকার গণপরিবহনের ভাড়াও সমন্বয় করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, হানিফ, শ্যামলী, সৌদিয়া, ইমাদ, সাকুরা, স্টার লাইনসহ বিভিন্ন পরিবহন সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার কাছাকাছি ভাড়া নিচ্ছে।
হানিফ পরিবহন খুলনার জন্য ৭৩০ টাকা, সাতক্ষীরা ৮৮০ টাকা, কুয়াকাটা ৯৯০ টাকা, কক্সবাজার ১ হাজার ২০০ টাকা, চট্টগ্রাম ৭০০ টাকা, রাঙামাটি ৯৫০ টাকা, আলীকদম ১ হাজার ২০০ টাকা ও কাপ্তাইয়ের জন্য ৮৮০ টাকা করে নতুন ভাড়ার তালিকা টানিয়ে দিয়েছে।
শান্তি পরিবহন খাগড়াছড়ির জন্য ৮৫০ টাকা, দিঘিনালা ও পানছড়ির জন্য ৯২০ টাকা করে টিকিট বিক্রি করছে। তবে সরকার-নির্ধারিত ভাড়া অনুসারে ৪০ আসনের গাড়ির জন্য দিঘিনালার ভাড়া ৮৬৪ টাকা ও পানছড়ির জন্য ৮৭৬ টাকা। সাথে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার ব্যবহার করলে আরও ৯ টাকা যোগ হবে।
বাড়তি ভাড়ার কারণে যাত্রীদের মধ্যে আক্ষেপ দেখা গেছে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে বাড়ির পথে রওনা হলেও বাড়তি খরচের চাপ নিয়ে স্বস্তিতে নেই যাত্রীরা।
চট্টগ্রামের আমিরাবাদগামী যাত্রী মোহাম্মদ সাজ্জাদ ঢাকার মহাখালীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ছুটি পেয়ে বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন।
ভাড়ার প্রসঙ্গে সাজ্জাদ বললেন, 'কষ্ট হচ্ছে, কী আর করার। পরিবারের কাছে তো যেতে হবে।'
ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন অভি। নিয়মিত ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াত করেন।
তিনি জানান, তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু যাতায়াত খরচেই সীমাবদ্ধ নেই, দৈনন্দিন খরচেও এর চাপ পড়ছে। 'আমাদের ওপর বোঝা হয়ে যাচ্ছে। তেলের দাম বাড়ার কারণে শুধু বাসের ভাড়া না, প্রতিটা হোটেলের খাবারের দামও বেড়ে গেছে।'
এদিকে তেলের দাম বাড়লেও সে অনুযায়ী যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে চাইছেন না বলে দাবি করছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা।
রাস্তায় দাড়িয়ে ডেকে ডেকে বিভিন্ন জায়গার টিকিট বিক্রি করছিলেন সায়েদাবাদের কাউন্টারকর্মী মোহাম্মদ নাছির। এ সময় ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে দর কষাকষি করতেও দেখা যায় তাকে।
জ্বালনির মূল্যবৃদ্ধির পর আশানুরূপ ভাড়া পাচ্ছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিবহনের বিভিন্ন খরচ বাড়লেও যাত্রীদের কাছ থেকে সে অনুযায়ী ভাড়া নেওয়া যাচ্ছে না।
'চাকা, তেল, মবিলের দাম বাড়ছে। কিন্তু যাত্রীদের কাছে ভাড়া চাইলে দেয় না। সাধারণত কক্সবাজারের জন্য একটা বিজনেস ক্লাস সিটের ভাড়া ১ হাজার ২০০ টাকা। আমরা যাত্রীদের কাছে ৮০০ টাকা করে চাই। তাতেও হয় না। যাত্রীরা বলেন ৬০০, ৬৫০, ৭০০,' বলেন তিনি।
নাছির দাবি করেন, 'কক্সবাজার থেকে একটা গাড়ি ঘুরে আসলে আমাদের আরও ৭-৮ হাজার টাকা লোকসান হয়।'
তার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম, নেয়াখালী, ফেনী ও কক্সবাজারের টিকিট বিক্রি করছিলেন কাউসার। তেলের দাম বাড়ার পর ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
'আগে মানুষ ৬০০ টাকায় এসিতে চট্টগ্রাম যাইত। এখন ৮০০ টাকা ভাড়া চাই। আর যাত্রীদের হাজারটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। তেলের দাম বাড়লেও সেই হিসাবে বেশি ভাড়া রাখতে পারছি না,' বলেন কাউসার।
দূর পাল্লার বাসের পাশাপাশি সপ্তাহের শেষদিন ভিড় বেড়েছে লোকাল বাসগুলোতেও। শিক্ষার্থী ভাড়াসহ সাধারণ যাত্রীরাদেরও চালকের সহযোগীদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে বাগবিতণ্ডায় জড়াতে দেখা গেছে।
মৌসুমী নামের এক যাত্রী শাহবাগ থেকে উঠেছিলেন শিকড় পরিবহনে। যাত্রাবাড়ির জন্য চালকের সহযোগী ৩০ টাকা ভাড়া দাবি করলে তিনি বলেন, 'আগে ২০ টাকা দিয়ে যাতায়াত করেছি। এখন সর্বোচ্চ ২৫ টাকা চাইতে পারে।'
উল্লেখ্য, নতুন ভাড়ার চার্ট অনুসারে শাহবাগ থেকে যাত্রাবাড়ির ভাড়া নির্ধারণ হয়েছে ১৭ টাকা।
এ বিষয়ে শিকড় পরিবহনের চালক সহযোগী বোরকান বলেন, 'আমরা এর আগেরবার তেলের দাম বাড়ানোর পর ভাড়া নিয়েছি ২৫ টাকা। এখন ৩০ টাকা করে।'
