সৌদি যেতে দক্ষতা পরীক্ষার ফি বাড়লেও মজুরি বাড়ছে না স্বল্প বেতনের বাংলাদেশি কর্মীদের
বাংলাদেশি কর্মীদের সবচেয়ে বড় গন্তব্য সৌদি আরবে অভিবাসনের খরচ আরও বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে শুরুতে তাকামুল নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত বাধ্যতামূলক 'স্কিল ভেরিফিকেশন প্রোগ্রাম' (এসভিপি) ফি ৫০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮৫ ডলার করা হয়েছে।
পরীক্ষার ফি কমানোর জন্য বাংলাদেশের উদ্যোগের মধ্যেই এই বৃদ্ধি ঘটল। এতে ভিসা, মেডিকেল পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার জন্য অভিবাসী কর্মীদের যে খরচ এমনিতেই বহন করতে হয়, তার সঙ্গে আরও ব্যয় যুক্ত হলো।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুরুতে এসভিপি ফি নিয়োগকর্তাদের দেওয়ার কথা থাকলেও এখন কর্মীরাই তা পরিশোধ করছেন।
এই অতিরিক্ত খরচ বিশেষ করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, মাল ওঠানো-নামানোর কর্মী এবং অন্যান্য স্বল্পদক্ষ কর্মীদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, সৌদিগামী বাংলাদেশি কর্মীদের প্রায় ৮০ শতাংশই এসব কাজে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর টিবিএসকে বলেন, 'সৌদি পক্ষই যেহেতু পরীক্ষা নিচ্ছে, তাই এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ আমাদের সীমিত।'
তিনি আরও বলেন, 'সৌদি আরব সবসময় বাংলাদেশকে বিশেষ বিবেচনায় রেখেছে এবং বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী সেখানে যান। তাই তাদের প্রয়োজনের ভিত্তিতে যদি কিছুটা ফি বাড়ানো হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি আমাদের সেভাবেই দেখা উচিত। বিশেষ করে সৌদি আরব আমাদের কর্মীদের জন্য উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।'
ফি বৃদ্ধির বিষয়ে সৌদি দূতাবাসের বক্তব্য জানতে টিবিএস ঢাকায় অবস্থিত সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং দূতাবাসের নির্দেশনা অনুযায়ী ১৬ সেপ্টেম্বর ই-মেইলও পাঠায়। তবে প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত দূতাবাস কোনো জবাব দেয়নি।
২০২৩ সালের মাঝামাঝি এসভিপি চালু হওয়ার পর থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭২ জন বিদেশগামী কর্মী এই পরীক্ষা দিয়েছেন। এ জন্য তারা তাকামুল কর্তৃপক্ষকে ২৭৩ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করেছেন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ২২ হাজার ৯০৯ জন, অর্থাৎ ২৭ শতাংশের বেশি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে পুনরায় পরীক্ষা দিলে কর্মীদের আবারও ফি দিতে হয়।
শ্রমিক নিয়োগকারীরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান খরচ বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে; কারণ বাধ্যতামূলক এসভিপি চালু থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবে অনেক স্বল্পদক্ষ বাংলাদেশি কর্মীর মজুরি গত তিন বছর ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে।
নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, তাকামুলসহ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্ত হওয়া অতিরিক্ত ফিগুলোর কারণে একজন কর্মীর খরচে আরও ১১ হাজার ৬৪ টাকা থেকে ১৪ হাজার ৪৭০ টাকা যোগ হয়েছে। এর বাইরে অভিবাসনের খরচ এমনিতেই ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
সৌদি আরবে পৌঁছানোর পরও আর্থিক বোঝা কমে না।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কর্মীদের ইকামা-সংক্রান্ত প্রায় ৯ হাজার ৭০০ থেকে ১১ হাজার সৌদি রিয়াল পর্যন্ত খরচও বহন করতে হতে পারে। যদিও এ ধরনের কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত খরচ সাধারণত নিয়োগকর্তার বহন করার কথা। ইকামা হলো বিদেশি নাগরিকদের দেওয়া একটি আবাসিক অনুমতিপত্র, যা একই সঙ্গে ওয়ার্ক পারমিট ও পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করে।
এই খরচ বহন করতে না পারা কর্মীরা অনিবন্ধিত অবস্থায় পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
সৌদি শ্রমবাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা কর্মীদের রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে তাকামুল চালু করা হলেও পরিচ্ছন্নতা এবং মাল ওঠানো-নামানোর মতো কাজের জন্য বাধ্যতামূলক সনদ নেওয়া কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা।
গতকাল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক কয়েকজন নেতা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে চার দফা স্মারকলিপি দিয়েছেন।
তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও সাধারণ শ্রমিক শ্রেণির কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক দক্ষতা পরীক্ষা বাতিল করা।
এ ছাড়া তারা কর্মীপ্রতি ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের ফি সম্প্রতি ২ হাজার টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। ২০ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় এই ফি ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৫০০ টাকা করেছে, ফলে অভিবাসনের খরচ আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার পরও ফি বাড়ল
গত বছরের ২৪ নভেম্বর সাবেক প্রবাসী কল্যাণসচিব নেয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়া রিয়াদে তাকামুল হোল্ডিংয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
তিনি তাদের বলেন, ৫০ ডলারের পরীক্ষা ফি এবং পুনরায় পরীক্ষার ৫০ ডলারের ফি আর্থিকভাবে সংকটে থাকা বাংলাদেশি কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা তৈরি করছে। তিনি এই ফি কমানো বা মওকুফের অনুরোধ জানান।
তাকামুলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আদেল আল-ফুরাইদি জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি বিবেচনা করা হবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সনদটি বাধ্যতামূলক। এর প্রায় এক বছর পর ফি ৭০ শতাংশ বেড়ে ৮৫ ডলারে দাঁড়ায়।
কাদের অ্যাসোসিয়েটসের স্বত্বাধিকারী মুহাম্মদ আবদুল কাদের বলেন, এই ফি আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, 'এখন তারা ফি ৫০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮৫ ডলার করেছে। যেভাবে চলছে, তাতে ধীরে ধীরে এটি ১০০ ডলার এবং এরপর আরও বাড়ানো হবে।'
তিনি বলেন, এক সৌদি নিয়োগকর্তাও প্রশ্ন তুলেছেন: যে পরীক্ষা কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় বাড়াচ্ছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ কেন নীরব রয়েছে। কাদের বলেন, 'সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বল্পদক্ষ কর্মীদের দক্ষতা যাচাই করা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়।'
এদিকে টিটিসি সূত্র দাবি করেছে, আগের ৫০ ডলার ফি থেকে ১৩ ডলার বিএমইটিকে এবং ৩৭ ডলার সৌদি আরবকে দেওয়া হতো। বর্তমান ৮৫ ডলারের ফি কীভাবে ভাগ করা হচ্ছে, জানতে চাইলে কর্মকর্তারা তা স্পষ্ট করতে পারেননি।
স্বল্প বেতনের কর্মীদের খরচ বাড়ছে
নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর মতে, পরীক্ষার অতিরিক্ত খরচের বিনিময়ে মজুরি বাড়েনি। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নির্মাণশ্রমিকদের মতো স্বল্পদক্ষ কর্মীরা সাধারণত মাসে ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করেন। আর আধা-দক্ষ কর্মীরা আয় করেন প্রায় ৪০ হাজার টাকা।
সৌদি আরবে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরি খোঁজা জাহাঙ্গীর আলম সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাধ্যতামূলক পরীক্ষার জন্য ৮৫ ডলার দিয়েছিলেন। তবে তিনি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। একই এজেন্সির মাধ্যমে পরীক্ষা দেওয়া আরও ছয়জন কর্মীও অকৃতকার্য হন। পরে আবার একই পরিমাণ ফি দিয়ে দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'আমি ৮০০ সৌদি রিয়াল (২৬ হাজার টাকার বেশি) বেতনে বিদেশে যাচ্ছি। ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার অভিবাসন খরচ মেটাতে আমাকে টাকা ধার করতে হয়েছে এবং ঋণ নিতে হয়েছে।'
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলামও পরিচ্ছন্নতাকর্মী, সাধারণ শ্রমিক ও সহকারীদের জন্য কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, 'তাদের অনেকেরই নির্দিষ্ট কারিগরি দক্ষতা নেই। অথচ তাদের কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'দক্ষতা পরীক্ষার ফলে যদি মজুরি বাড়ত, তাহলে এর কিছুটা যৌক্তিকতা থাকত। কিন্তু তাদের বেতন বাড়েনি। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও সাধারণ শ্রমিকেরা ৮০০ থেকে ১ হাজার রিয়াল আয় করেন, আর আধা-দক্ষ কর্মীরা পান প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ রিয়াল। তাহলে তারা কী সুবিধা পাচ্ছেন?'
তৃণমূল পর্যায়ের অভিবাসী অধিকার সংগঠন অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম বলেন, 'দক্ষতা যাচাই একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। কাগজে-কলমে কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, দক্ষ কর্মীরা বিদেশে যাচ্ছেন। বাস্তবে আমি এমন অনেক মাল ওঠানো-নামানোর কর্মীর সঙ্গে কথা বলেছি, যারা কোনো ধরনের দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়াই বিদেশে গেছেন।'
তিনি আরও বলেন, 'অভিবাসনের খরচ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় এটি শুধু আমাদের কর্মীদের শোষণ আরও গভীর করছে।'
চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৮৮৫ জন কর্মী বিদেশে পাঠিয়েছে। তাদের মধ্যে ২ লাখ ৯৪ হাজার ৯৩ জন, অর্থাৎ ৫৫ শতাংশের বেশি গেছেন সৌদি আরবে।
বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সৌদি আরবে ৩২ লাখের বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছেন। দেশটি বাংলাদেশের রেমিট্যান্সেরও সবচেয়ে বড় উৎস। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৫ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার।
প্রশিক্ষণের খরচও বাড়াচ্ছে বোঝা
তাকামুল পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কর্মীদের সহায়তা করতে নির্বাচিত সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো ২ হাজার টাকায় তিন দিনের প্রস্তুতিমূলক কোর্স পরিচালনা করে।
এর বিপরীতে, সরকারি টিটিসিগুলোতে ইলেকট্রিক্যাল, অটোমোবাইল ও কম্পিউটার প্রযুক্তির তিন মাসের কারিগরি কোর্সের খরচ প্রায় ৭৪৮ টাকা বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সরকারি টিটিসিতে কারিগরি কোর্সের খরচ এর অর্ধেকেরও কম হওয়া সত্ত্বেও প্রস্তুতিমূলক কোর্সের জন্য কর্মীদের কাছ থেকে কেন ফি নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে বিএমইটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশিক্ষণ) মো. শরিফুজ্জামান টিবিএসকে বলেন, 'প্রতিটি কোর্সের ফি এর প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। আমি এখানে নতুন, তাই কোনো অসঙ্গতি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখব।'
সৌদি আরব প্রথমে বাংলাদেশে প্লাম্বিং, ইলেকট্রিক্যাল কাজ, ওয়েল্ডিং, রেফ্রিজারেশন এবং অটোমোবাইল ইলেকট্রিক্যাল কাজের মতো দক্ষ পেশার জন্য এসভিপি চালু করেছিল। পরে পরিচ্ছন্নতা এবং মাল ওঠানো-নামানোর কাজসহ ৭৩টি পেশায় এই কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি ঢাকায় সৌদি দূতাবাস এসভিপি সনদ ছাড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মাল ওঠানো-নামানোর কর্মীদের ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয়।
সৌদিগামী কর্মীদের জন্য তাকামুলই একমাত্র অতিরিক্ত খরচ নয়। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সৌদি আরব আলাদা একটি ভিসা প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা চালু করে। এর আওতায় বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়ার জন্য বাংলাদেশি কর্মীদের যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত তাশির কেন্দ্রে যেতে হয়।
তাশির, যা আগে তাসহিল বা ভিএফএস তাসহিল নামে পরিচিত ছিল, সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিযুক্ত সরকারি বৈশ্বিক ভিসা সেবা কেন্দ্র। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, আঙুলের ছাপ দেওয়ার জন্য প্রায় ৬৯৪ টাকা খরচ হয়, আর প্রিমিয়াম সেবার জন্য খরচ হয় প্রায় ২ হাজার ১০০ টাকা।
